কাক, অনেকের কাছেই কর্কশ আর ময়লাখেকো পাখি। গান জানে না, দেখতেও রঙচঙে নয়, তাই কাককে অনেকে অবহেলা করতে পারে। কেউ কেউ কাক পেখম গুজলেই ময়ূর হয় না এমন তাচ্ছিল্যভরা কথা বলে। কিন্তু জেনে অবাক হবেন যে কাক কতটা বুদ্ধিমান পাখি। সেই যে কলসির তলায় থাকা পানি নুড়ি ফেলে ফেলে উপরে নিয়ে এসে পান করার গল্পটার কথা মনে আছে? পরিস্থিতি অনুযায়ী কাকের এরকম বুদ্ধিমত্তা আসলেই প্রমাণিত।
পাখিদের মধ্যে কাক বুদ্ধিমান পাখি হিসেবে পরিচিত। তাদের সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং মানুষের মুখ মনে রাখার ক্ষমতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সমস্যা সমাধান: কাকেরা জটিল সমস্যা সমাধানে পারদর্শী। যেমন, একটি বিখ্যাত গল্পে দেখা যায়, একটি কাক কলসির মধ্যে পানি কম থাকায় বুদ্ধি খাটিয়ে নুড়ি পাথর ফেলে পানির স্তর উপরে তুলে এনেছিল।
যোগাযোগ: কাকেরা বিভিন্ন ধরণের শব্দ এবং অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে। তাদের এই যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ জটিল এবং সুসংগঠিত।

কাক সামাজিক জীবনকে বেশ গুরুত্ব দেয়। তাদের রয়েছে বৃহত্তর সংঘবদ্ধ জীবনযাপন। তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সাময়িক ঠুকরাঠুকরি হলেও কখনো মরণপণ লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হয় না। তারা একমাত্র তাদের পরিবারের জন্য বিপজ্জনক শত্রুর বিরুদ্ধেই মরণপণ লড়াই করে। এমনকি কোনো কাক, কাকের বাচ্চা মরে মাটিতে পড়ে গেলে তারা সংঘবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।
মানুষের মুখ মনে রাখা: কাকেরা মানুষের মুখ মনে রাখতে পারে এবং যারা তাদের প্রতি বিরূপ আচরণ করে, তাদের চিহ্নিত করতে পারে। এমনকি তারা অন্যদেরও এই বিষয়ে সতর্ক করে দেয়।
নতুন কৌশল শেখা: কাকেরা নতুন নতুন কৌশল শিখতে ও উদ্ভাবন করতে পারে। জাপানে কাকেরা শক্ত খাবার (যেমন বাদাম) খাওয়ার জন্য একটি বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে। তারা শক্ত খাবারটি রাস্তার উপর ফেলে দেয় এবং এর ওপর দিয়ে গাড়ির চাকা গেলে সেটি ভেঙে যায়, এরপর সেটি কাক খেয়ে নেয়। এই কৌশলটি কাকদের জন্য একটি অভিযোজন যা তাদের শক্ত খোসাযুক্ত খাবার সহজে খেতে সাহায্য করে।

অন্যান্য পাখি থেকে আলাদা: কিছু গবেষণা অনুযায়ী কাকেরা অন্যান্য পাখি থেকে বেশি বুদ্ধিমান এবং তাদের মধ্যে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও বেশি বলে মনে করা হয়।
পিএলওএস ওয়ান-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় গবেষকরা দেখেছেন যে বুদ্ধিমান বলে বিবেচিত অন্যান্য পাখিদের তুলনায় কাকের ধৈর্য ও নিয়ন্ত্রণ বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেমব্রিজের অ্যাঞ্জেলা রাস্কিন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজের গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত এই গবেষণায় দুটি প্রজাতির কাকের আচরণের তুলনা করা হয়েছে, ইউরেশিয়ান জে এবং নিউ ক্যালেডোনিয়ান কাক।

এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে কাকগুলি কতটা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ইউরেশিয়ান জে এবং নিউ ক্যালেডোনিয়ান ক্রো উভয়ই করভিড পরিবারের অন্তর্গত কাক এবং এদের খুবই বুদ্ধিমান বলে মনে করা হয়।
এই গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়েছে কীভাবে এই পাখিরা খাদ্য জোগাড় করার সময় প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রথমে খানিকটা উদাসীনতা দেখায়। বিশেষত অন্যান্য পাখিরা সেখানে উপস্থিত থাকলে কাক কিন্তু অবিলম্বে খাদ্যের চাহিদা পূরণ করার পরিবর্তে আত্ম-নিয়ন্ত্রণ দেখায়।

আধ্যাত্মিক তাৎপর্য: অনেক সংস্কৃতিতে কাককে আধ্যাত্মিক দূত হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। তারা হয়তো কোনো বার্তা বহন করে নিয়ে আসে, যা ভবিষ্যতের সুযোগ বা বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে। পশ্চিমা সিনেমা ও টিভি সিরিজে রেভেন বা দাঁড়কাককে বার্তাবাহী কাক হিসেবেও দেখানো হয়েছে।
কুরআনেও কাকের বুদ্ধিমত্তার উল্লেখ আছে। কুরআনে কাকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সূরা আল-মায়িদার ৩০ আয়াতে। এখানে, কাবিলের হাতে হাবিলের হত্যার পর, আল্লাহ তা’আলা একটি কাককে পাঠান, যা মাটি খুঁড়ে হাবিলের মৃতদেহ কিভাবে ঢাকতে হয় তা কাবিলকে দেখিয়েছিল।
এই ঘটনাটি কুরআনে কাকের বুদ্ধিমত্তা এবং আল্লাহ্র সৃষ্টির নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















