ব্রাজিলের বেলেমে চলমান জলবায়ু সম্মেলনের দ্বিতীয় সপ্তাহে আদিবাসী জনগনের অধিকার, জীবাস্ম জ্বালানীর ভবিষ্যত এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। সম্মেলনকে ‘আদিবাসী কপ’ বলা হলেও কৌশলে তাদের কণ্ঠস্বর রূদ্ধ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ খোদ আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর। অপরদিকে তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে জলবায়ু আলোচনায় বাধাদানকারী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে।
কপের ত্রিশতম আসরে নানা অপ্রাপ্তি এবং আক্ষেপের মাঝেও কয়লা নির্ভর শক্তিশালী দেশ দক্ষিণ কোরিয়া, বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের সাথে মিলে, কয়লা থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী বছর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানী থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে কলম্বিয়া।
দেশগুলোর বর্তমান নীতি ও লক্ষ্যমাত্রা ২০২৩ সালের মধ্যে গ্রিনহাউজ নির্গমন ৮ শতাংশ কমানোর ইঙ্গিত দিলেও, ইউএনডিপি প্রতিবেদন বলছে, প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে গ্রিনহাউজ তথা মিথেন নির্গমন।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের সাইড ইভেন্টগুলোতে, বাংলাদেশের জলবায়ু সম্পর্কিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং উদ্ভাবনী সমাধান তুলে ধরা হয় আন্তর্জাতিক মঞ্চে। এসময় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার অভিযাত্রা ত্বরান্বিত করতে, স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি লস অ্যান্ড ড্যামেজ চিহ্নিত করে অভিযোজন খাতে যথাযথ জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলে থেকে সম্মেলনে অংশ নেয়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম সোহেল বলেন, ‘জলবায়ু অর্থায়নে বাকু সম্মেলন থেকে বেলেম সম্মেলন পর্যন্ত ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের যে রোডম্যাপ সে রোডম্যাপ কিভাবে বাস্তবায়ন হবে, আমরা যারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ আছি তারা কিভাবে এই অর্থায়ন পাবো তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলমান আছে। এই আলোচনা আমাদের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ড্যান্ডির সহযোগী অধ্যাপক নন্দন মুখার্জী বলেছেন, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডিংয়ের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা আদৌ কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, বাংলাদেশইবা কতটুকু পাবে, কাদের মাধ্যমে পাবে কোন খাতে পাবে, এই বিষয়গুলো কিন্তু এখনো পরিষ্কার হয় নাই।’

জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করা সত্ত্বেও, সম্মেলনে এই শিল্প প্রতিনিধিদের ব্যাপক উপস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।
ব্রাজিলের বেলেমে সম্মেলন থেকে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, ‘আমাদের উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে, দুর্যোগ হচ্ছে তাতে বাড়িঘর হারিয়ে মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে, কাজ হারাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যগত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তাহীন হয়ে যাচ্ছে । জলবায়ু তহবিল থেকে এই দুর্গত দেশ-জনপদের মানুষ যেন সাহায্য পায়। এই তহবিলে আবার মাত্র ৩ শতাংশ বৈশ্বিক বেসরকারিখাত থেকে এই তহবিলে দেয়া হচ্ছে, এটা যদি ১৫% পর্যন্ত হতো তাও মন্দের ভালো বলতাম, কিন্তু সেটাও হচ্ছে না। অথচ জলবায়ু অভিযোজনের বেলায় সবচেয়ে বেশি দরকার বেসরকারিভাবে ফান্ড।’

প্রকৃতিবন্ধু আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো এই যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুস্থ মানুষরা এবং উপকূলীয় মানুষ যারা নানা ধরনের সমস্যায় ভুগছে তাদের ব্যাপারে এগিয়ে আসার একটি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে এই সম্মেলনে।’
এদিকে দীর্ঘ অচলাবস্থার পর সম্মেলনের ফলাফলের প্রথম খসড়া পাঠ্যে ‘জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করায় আলোচনায় নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
তথ্য বলছে, বৈশ্বিক কার্বন ফুটপ্রিন্টের বড় একটা অংশ আসে পরিবহন খাত থেকে। এমন অবস্থায় নৌ এবং আকাশ পরিবহন খাতে নির্গমন কমাতে জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদন: আলীম আল রাজী
ভিডিওচিত্র: মেহেদী হাসান
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















