একজন গর্ভবতী প্রথম মাস থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত বর্ণনাতীত কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করেন। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতা সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছি, (কেননা) তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। তুমি শোকর আদায় করো আমার এবং তোমার পিতা-মাতার। গর্ভবতীর জন্য ইসলামে নির্ধারিত বিশেষ কোনো আমল নেই। অন্য সময়ের আমলগুলোই এ সময় প্রযোজ্য। তবে ইস্তিগফার ও দোয়ার আমল বেশি বেশি করা উত্তম। মায়ের আমলের প্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে। সুসন্তান লাভের জন্য এই দোয়াটি পাঠ করা যায় :
‘রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা জুররিয়্যাতান তাইয়্যিবাতান ইন্নাকা সামিউদ্দুয়া।’
অর্থ : হে আমার পালনকর্তা! আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পূত-পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী। (সুরা: আল ইমরান, আয়াত: ৩৮)
গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের যে কষ্ট ও বিপন্ন অবস্থার মাতৃত্বের মর্যাদা হিরকখণ্ডের চেয়ে দামি বানানো হয়েছে। মা সন্তানের জন্য সীমাহীন কষ্ট করেন। মহান আল্লাহ তার সঙ্গে সদাচরণ করার কথা খুব জোর দিয়ে বলেছেন। গর্ভে সন্তান আসা নারীর জন্য বোঝা নয়, বরং সম্মান ও সৌভাগ্যের। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত— তিনি বলেন, নবীজি (সা.)-এর পুত্র ইবরাহিমের দুধমাতা সালমাকে (রা.) নবীজি (সা.) বলেছিলেন, তোমরা নারীরা কি এতে খুশি নও যে, যখন কোনো নারী তার স্বামীর পক্ষ থেকে গর্ভধারিণী হয় আর স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, তখন সে আল্লাহর জন্য সর্বদা রোজা পালনকারী ও সারা রাত নফল ইবাদতকারীর মতো সওয়াব পেতে থাকবে?
প্রসব ব্যথা শুরু হয় তখন তার জন্য নয়ন জুড়ানো কী কী নেয়ামত লুকিয়ে রাখা হয়, তা আসমান-জমিনের কোনো অধিবাসীই জানে না। সে যখন সন্তান প্রসব করে তখন তার দুধের প্রতিটি ফোঁটার বিনিময়ে একটি করে নেকি দেওয়া হয়। এ সন্তান যদি কোনো রাতে তাকে জাগিয়ে রাখে (কান্নাকাটি করে মাকে বিরক্ত করে ঘুমুতে না দেয়) তা হলে সে আল্লাহর জন্য নিখুঁত সত্তরটি গোলাম আজাদ করার সওয়াব পাবে।’ (তাবরানি, হাদিস: ৬৯০৮; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ৪/৩০৫) গর্ভাবস্থায় মায়ের কর্তব্য অনাগত সন্তানের জন্য কল্যাণের দোয়া করা। গর্ভাবস্থায় হজরত মারিয়াম (আ.)-এর মায়ের আমল থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। মারিয়াম (আ.)-এর জন্মের পূর্বে যখন তার গর্ভধারিণী মাকে সন্তানের ব্যাপারে সুসংবাদ দেওয়া হলো, তখন তিনি মহান প্রভুর দরবারে যে দোয়াটি করেছিলেন সেটি সুরা আলে ইমরানের ৩৫ নাম্বার আয়াতে বিদ্যমান।
ইরশাদ হয়েছে, ‘ইমরানের স্ত্রী যখন বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমার গর্ভে যা রয়েছে আমি তাকে তোমার নামে উৎসর্গ করলাম সবার কাছ থেকে মুক্ত রেখে। আমার পক্ষ থেকে তুমি তাকে কবুল করে নাও। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞাত।’ মারিয়াম (আ.)-এর মায়ের এ দোয়ার মাহাত্ম্য জানার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, এ দোয়ার ফলে আল্লাহ তায়ালা তাকে মারিয়াম (আ.)-এর মতো এমন রত্মগর্ভা কন্যা সন্তান দিয়েছেন যিনি পৃথিবীবাসীকে উপহার দিয়েছেন নবী ঈসাকে (আ.)। এজন্য গর্ভবতী মায়েদের উচিত এ দোয়াটি গুরুত্বসহকারে পড়া যেন আল্লাহ তায়ালা তাকেও নেককার পরহেজগার সুসন্তান দান করেন।
এক- গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ইবাদতের চেয়ে গুনাহ ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। আর এটা করতে হবে, আপনার ভেতরে বেড়ে ওঠা সন্তানের জন্যই। যেমন, নাটক-সিরিয়াল প্রীতি বর্জন করবেন, কণ্ঠস্বরকে সংযত করবেন, বিশেষ প্রয়োজন দেখা না দিলে ঘর হতে বের হবেন না। আপনার যেসব গায়রে মাহরাম আত্মীয় রয়েছে, তাদেরকে আপনার সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের কিংবা পর্দা লংঘনের জন্য অনুমতি দেবেন না।
দুই- ধৈর্য্য ধারণ করুন: অসুস্থতা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা প্রভৃতি কারণে ধৈর্য্যহারা হবেন না। এভাবে ভাবুন, ‘এই সময়টার প্রতিটি মুহূর্ত আপনার জন্য জিহাদতূল্য ইবাদত’। এতে ধৈর্য্য ধারণ করা আপনার জন্য সহজ হবে। আপনার কষ্ট শক্তিতে পরিণত হবে। নবীজী সা. চমৎকার বলেছেন, সবর হল জ্যোতি। (মুসলিম: ২২৩)
তিন- সময় মত নামাজ আদায় করুন: এসময়ে অস্থিরতা বেশি কাজ করে। আর যথাসময়ে নামাজ অন্তরকে প্রশান্ত রাখে। এজন্যই নামাজের সময় হলে নবীজী সা. হজরত বেলালকে (রা.) বলতেন, নামাজের ব্যবস্থা কর এবং তার মাধ্যমে আমাকে তৃপ্ত কর। (আবু দাউদ: ৪৩৩৩)
চার- জিকির করুন: অস্থিরতা দূরীকরণের কুরআনি-ব্যবস্থাপনা এটি। এটা আপনাকে ও আপনার গর্ভের সন্তানকে শান্ত রাখতে সহায়ক হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের মন প্রশান্ত হয় ; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই মন প্রশান্ত হয়। (সূরা রাদ: ২৮)
পাঁচ- শোকর আদায় করুন: দেখুন, মা হওয়ার মাঝেই নারীজন্মের স্বার্থকতা। কত নারী এমন আছে,গর্ভবতী হওয়ার জন্যে বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করছে কিন্তু তাদের ভাগ্যে এই নেয়ামত জুটছে না। এজন্য যখনি মা হওয়ার আনন্দে পুলকিত হবেন তখনি আল্লাহর শোকর আদায় করুন।
ছয়- বেশি রাত পর্যন্ত জাগ্রত থাকা থেকে বিরত থাকুন: গর্ভাবস্থায় রাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম না হলে স্বাস্থ্যহানী ঘটে। তাই ইশার নামাজ সময়ের শুরুতে পড়ে নিন। তারপর প্রয়োজনীয় কাজ সেরে যত দ্রুত সম্ভব ঘুমিয়ে পড়ুন। দেরি করে ঘুমোতে যাবেন না। অন্তত এতটা আগে রাতের বিছানায় যেতে হবে যাতে করে কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিন্তে যাওয়া যায় এবং ফজর যথাসময় পড়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী। (সূরা নাবা: ৯)
সাত- ওজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করুন: কেননা দৈহিক সুস্থতা ও আত্মিক প্রশান্তির ক্ষেত্রে ওজুর ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষত, ঘুমানোর আগে ওযু করে নিবেন। এতে অনিদ্রার বিড়ম্বনা থেকে বাঁচা সহজ হবে। নবীজী সা. বলেছেন, যখন তুমি বিছানায় যাবে তখন নামাযের ওজুর মত ওযু করবে। (মুসলিম: ৪৮৮৪)
আট- আপনার সন্তানের জন্য কুরআন তেলাওয়াত করুন: প্রায় ২০তম সপ্তাহে গর্ভের বাচ্চা শোনার সক্ষমতা অর্জন করে। মা প্রতিদিন কিছু কুরআন তেলাওয়াত করে বাচ্চার মাঝেও কোরআনের মাঝে সম্পর্ক জুড়ে দেয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, কুরআনের বিষয়ে তোমাদের উপর অবশ্য পালনীয় এই যে, কুরআন শিক্ষা করা এবং তোমাদের সন্তানদের কুরআন শিক্ষা দেয়া। কেননা এ বিষয়ে তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে এবং তার প্রতিদানও দেয়া হবে। (শরহে সহীহ বুখারী, ইবন বাত্তাল: ৪৬) নেক নিয়তে পুত্র সন্তানের জন্য পড়া যেতে পারে, ‘রাব্বি হাবলি মিনাস সালিহিন’, অর্থাৎ, ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে সৎকর্মশীল পুত্র সন্তান দান করুন।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০০)
সবশেষে; গর্ভকালীন নারীর যত্নের প্রতি পরিবারের সবাইকে সচেতন হতে হবে। অনাগত শিশুর মাকে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুরুষকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানের গঠন-আকৃতি নিয়ে সমাজে অনেক প্রচলিত কুসংস্কার আছে। এগুলো পালন থেকে নারীদের বিরত থাকা উচিত।
ডেস্ক রিপোর্ট 





















