“ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা”, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জড়াজীর্ণতা মুক্ত হতে নতুন প্রজন্মকে এই আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সবুজহীন পরিবেশে বেড়ে উঠতে থাকা শিশুদের মন কতটা সবুজ-সতেজ আর প্রাণবন্ত, এই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে দেশের মহানগরীগুলোতে বেড়ে উঠতে থাকা শিশুদের বেলায় এই প্রশ্ন আরও প্রকট।
কংক্রিটের নগরী ঢাকার পাশেই আরেক মহানগরী এখন গাজীপুর। অথচ গাজীপুর মানেই শাল-গজারির বন হলেও বহু আগেই শিল্পাঞ্চলে পরিণত হওয়া জেলাটির কোনাবাড়ি এলাকা রীতিমতো কংক্রিটের ঘিঞ্জি। এরই মাঝে গড়ে উঠছে স্কুল, নেই খেলার মাঠ, এই পরিবেশে বেড়ে উঠছে গাজীপুরের নতুন প্রজন্ম। তাই এখানে এবার নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়া হলো সবুজ, শুরু হলো এই বর্ষায় সবুজে সাজাই বাংলাদেশ অভিযানের গাজীপুর পর্ব। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে গাছের চারা তুলে দেয়া, বৃক্ষরোপণের পালা চললো দিনভর।

দিনটি বুধবার (১৩আগস্ট), সাতসকালে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, তবু গাজীপুরের কোনাবাড়িতে গাজীপুর শাহীন স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে উৎসবের আমেজ। কারণ স্কুলে সবুজে সাজাই বাংলাদেশ শিরোনামে বৃক্ষবিতরণ ও রোপণের আয়োজন করেছে গাজীপুর জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব। সকাল ১০ টার দিকে গলির মাথায় গাড়ি রেখে স্কুলে ঢুকলো প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং চ্যানেল আইয়ের প্রকৃতি সংবাদ টিম, নেতৃত্বে মুকিত মজুমদার বাবু। আর মুহূর্তেই শিক্ষার্থীদের হইহই, তাদের অনেকেই চ্যানেল আইতে প্রকৃতি ও জীবন অনুষ্ঠানটি দেখে, চ্যানেল আইয়ের লোগোসহ ক্যামেরা দেখে তারা তাই ভীষণ উৎসাহী।

এদিকে বৃষ্টি হলেও ভ্যাপসা গরম, এই আবহাওয়াতেই স্কুলের হলরুমে হলো সংক্ষিপ্ত সভা। সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয় গাজীপুর শাহীন শিক্ষা পরিবারের ১৭টি স্কুল। এই সভাতেই একযোগে সবগুলো স্কুলে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর মাধ্যমে সবুজের হাসি ছড়িয়ে দিতে গাছের চারা বিতরণ ও রোপণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।

এই সভার সভাপতি, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং দেশের সব জেলার প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, ‘আজকে আমাদের এখানে সমবেত হওয়া প্রমাণ করেছে যে আমরা পরিবেশ-প্রকৃতিকে ভালোবাসি। প্রকৃতিকে ভালো রাখার সবচেয়ে সহজ কাজটি হলো বৃক্ষরোপণ, তবে এটি যেমন সহজ তেমন কঠিনও। গাছ কেবল লাগালেই হবে না, এর যত্ন নিতে হবে, রক্ষা করতে হবে। আমাদের শিশুদের ধর্মীয় ব্যাপারগুলো খুব গুরুত্ব দিয়ে যেভাবে শেখাই সেভাবে প্রকৃতি-পরিবেশের নানান উপাদান আমাদের জীবনে কী প্রভাব রাখছে, কেন এসব রক্ষা করা জরুরী তাও গুরুত্ব দিয়ে শেখাতে হবে। আমরা যেন শিশুদের ফুল ছেড়া-গাছের ডাল ভাঙা যে উচিৎ নয়, পাখির বাসা-ডিম ভাঙা অথবা ব্যাঙ দেখলে ঢিল ছোড়া যে উচিৎ নয় সেসবও যেন শেখাই। এই যে স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা, তাদের জন্য যদি আমরা একটা ভালো পরিবেশ রেখে যেতে না পারি তাহলে ওরা কোনোদিন আমাদের ক্ষমা করতে পারবে না। ’

গাছ ও বনায়নের উপকারীতা তুলে ধরে প্রকৃতিবন্ধু বলেন, ‘পরিবেশ-প্রকৃতিকে ভালো রাখতে সারা বাংলাদেশকে সবুজে সাজাতে হবে। বাংলাদেশ যদি ভাল থাকে আমরা ভাল থাকবো, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভাল থাকবে। এক একরের একটি বন প্রায় ২৫ টন কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিতে পারে। গাছ ফল-ফুল-ওষুধ দিচ্ছে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করছে, মাটির ক্ষয়রোধ করছে, সুন্দরবন উপকূলে রক্ষাকবচ হয়ে দেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে চলেছে। এজন্য সারাদেশে বৃক্ষরোপণ এখন সময়ের দাবি, আমাদের অস্তিত্বের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসুন অঙ্গীকার করি দেশকে ভাল রাখবো, সারা বাংলাদেশকে সবুজে সাজাবো।’

সভায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) কমিশনার ড. মো. নাজমুল করিম খান বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব বোঝাতে বলেন, ‘গাছ লাগানো একধরনের সদকায়ে জারিয়া। ইসলামে সদকায়ে জারিয়া হলো এমন এক প্রকারের অবিরত বা চলমান সওয়াব যা এর প্রবর্তকের মৃত্যুর পরও মানবজাতিকে উপকৃত করে যেতে থাকে। গাছই হলো এমন এক জীব যা নিজের খাদ্য নিজে প্রস্তুত করতে পারে। অন্যদিকে গাছ বাদে অন্য সব জীব কোনো না কোনোভাবে গাছের উপর নির্ভরশীল। গাছ এমন একটি জীব যেটি কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ছাড়ে, অন্যসব জীব অক্সিজেন গ্রহণ করে কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়ে। যদি গাছ না লাগান তাহলে বৃষ্টি হবে না, আমাজন বনে সারাবছর বৃষ্টি হয়, সেটা গাছের কারণে। বৃষ্টি না হলে পানযোগ্য পানি পাবেন না। পৃথিবীর সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো গাছ।’
তিনি বলেন,‘বৃক্ষরোপণের মতো এই সদকায়ে জারিয়ার সঙ্গে প্রকৃতি ও জীবন যে যুক্ত হয়েছে, এজন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই, স্বাগত জানাই। আশা করি এমন উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা নতুনভাবে প্রকৃতিতে জীবন ফিরে পাবো। গাছপালা-বনাঞ্চল হারিয়ে আমরা যে ভয়াবহ অবস্থায় আছি তা থেকে পরিত্রাণ পেতে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নাই।’

গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘ এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার। কবি সুকান্তের অনবদ্য এই পঙ্কতির সঙ্গে মিল রেখে বলতে চাই, যদি আমার আগামী প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবীকে সুন্দর করে রাখতে চাই, তাহলে পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের জীবন জড়িত। তাই বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমাদের নিজের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ রেখে যেতে হবে।’
প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সবুজে সাজাই বাংলাদেশ কর্মসূচীতে পাশে আছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান টেলিকম অপারেটর বাংলালিংক। সভায় বাংলালিংকের ক্লাস্টার ডিরেক্টর মো. তৌহিদুর রহমান তালুকদার বলেন,‘গাজীপুর শিল্পবহুল একটি এলাকা। এখানে গাছের ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। করপোরেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলালিংক পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধ। আমরা দেশের পরিবেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে, সুযোগে পেলে পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগে যুক্ত হই।’

তিনি বৃক্ষরোপণের এই উদ্যোগ নেয়ার জন্য গাজীপুরের প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব এবং এরকম মহতী উদ্যোগে বাংলালিংককে পাশে রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি ধন্যবাদ জানান।

এই সভায় অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন, স্টাইলিশ গার্মেন্টসের চেয়ারম্যান ও ডিবিসি নিউজের পরিচালক সালাউদ্দিন চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘আমরা শিল্পায়ন করেছি, এখন পরিকল্পিত সবুজ নগরায়ন করবো। এখন সবুজ একটি গাজীপুর মহানগরী গড়ার সময়।’
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন গাজীপুর শাহীন ক্যাডেট একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সোহেল রানা চৌধুরী , এডিসন পাওয়ার-এর প্রধান নির্বাহী মো. আমরান হোসেন প্রমুখ।
সভা শেষে স্কুল প্রাঙ্গনে সমবেত শিক্ষার্থীদের হাতে ফলদ, বনজ ও ওষুধি গাছের চারা তুলে দেন প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবুসহ অতিথিরা। এসময় স্কুল প্রাঙ্গনে গাছের চারা রোপণ করেন তারা।
ছোট্ট ছোট্ট ফুলের মতো শিশুদের হাতে গাছের চারা, চারদিকে দারুণ উৎসাহ, হইচই, হাতে হাতে সবুজ চারা দুলছে বাতাসে।

একই দৃশ্য দেখা গেল কিছুটা দূরে গাজীপুর শাহীন একাডেমীর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। এখানে স্কুলের উঠানে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা। এখানে আর কোনো সভা নয়, বড়দের কথা নয়। এবার শোনা হলো শিশুদের কথা, ওদের কৌতুহলভরা প্রশ্ন।
তাদের কারও প্রশ্ন কখন গাছ লাগাতে হবে, কী গাছ লাগালে ভাল হয়। এমনকি বর্ষার সময়তো মা বাসা থেকেই বের হতে দেয় না, গাছ লাগাবো কিভাবে? এমন মজার আর সরল প্রশ্নও ছিল।

বেশ ধৈর্য্য নিয়ে সময়ে নিয়ে শিশুদের উপযোগী করে একে একে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেন সবুজকে ভালোবাসা মুকিত মজুমদার বাবু।
নাসিমুল শুভ 




















