বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা চামড়া শিল্পকে টেকসই শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিবেশগত প্রভাব ও অধিকার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং করণীয় নির্ধারণে সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) গাজীপুর সদর উপজেলা অফিসার্স ক্লাবের সভাকক্ষে ‘অ্যাওয়ারনেস রেইজিং ক্যাম্পেইন অন এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্টস এন্ড রাইটস অ্যাট লেদার সেক্টর’ শিরোনামে এই সভার আয়োজন করা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় সলিডার সুইসের তত্ত্বাবধানে ওশি ফাউন্ডেশনের পরিচালনায়, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে “বিল্ডিং এ সাসটেইনেবল লেদার সেক্টর ইন বাংলাদেশ” প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত হয় এই সভা।

সভায় এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম চামড়া শিল্প একটি টেকসই শিল্প উল্লেখ করে বলেন, প্রকৃতি-পরিবেশ বা জীববৈচিত্রের কোন ক্ষতি না করেই এই শিল্পের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ৯৫ ভাগ চামড়া তৈরি হয় গরু, ছাগল, ভেড়াও শুকুর থেকে কিন্তু চামড়ার জন্য কোন পশুকে হত্যা করা হয় না। মাংস উৎপাদনের জন্য এসব পশুকে জবাই করা হয় এবং বোনাস হিসাবে পাওয়া যায় চামড়া।
চামড়া শিল্পের সমস্যা সমাধানে সবাইকে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে এবং এই সচেতনতায় মালিক পক্ষই বেশি লাভবান হবেন বলে মত প্রকাশ করেন রফিকুল ইসলাম বলেন, লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ থাকলে ইউরোপ আমেরিকাসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে চামড়া রপ্তানি করা যায়। এর ফলে পরিবেশ দূষণ রোধের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
শিল্প খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,বিশ্বের ১০ টি গ্রীন ফ্যাক্টরির মধ্যে ৭টি বাংলাদেশে। এর দ্বারা প্রমাণ হয়, মানুষ পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি শিল্পের প্রসার বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, আমরা অতি মুনাফার আশায় নিজেদের বড় ক্ষতি করে ফেলেছি। তরল বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) না থাকায় ট্যানারির বিষাক্ত কেমিক্যাল নদীতে মিশে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। পাশাপাশি উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষি জমি, কমে যাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা।
গাজীপুরে ২০ টি নদী রয়েছে উল্লেখ করে মনির হোসেন বলেন কারখানার বিষাক্ত পদার্থ নদীগুলোকে দূষণে জর্জরিত করে ফেলেছে। নদী বাঁচাতে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দূষণের হাত থেকে নদীগুলোকে রক্ষা করতে পারি আমরা। নদী দূষণ ও পরিবেশের ক্ষতি না করে চামড়া শিল্পের উন্নয়ন সাধন করে দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি সম্ভাব বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

চামড়ার শিল্পের নারী উদ্যোক্তা খাদিজা খানম সভায় অংশগ্রহণ করে, তার সফলতার গল্প তুলে ধরেন। এক সময় চরম আর্থিক কষ্টে থাকা এই নারী বর্তমানে অনেককে দিয়েছেন বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি। গাজীপুরের অবহেলিত ও বঞ্চিত নারীরা তার কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
অদম্য ইচ্ছা মানুষকে সফলতা এনে দেয় উল্লেখ করে খাদিজা খানম বলেন, ২০১৮ সালে খুব অল্প পরিসরে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে তিনি সুনামের সাথে বাংলাদেশের সেরা কোম্পানিগুলোর অর্ডার সরবরাহ করছেন। দেশের বাজারে পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানির স্বপ্ন দেখেন এই নারী উদ্যোক্তা।

সভায় চামড়া শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব ও অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা, এবং এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য করণীয় নিয়ে আলোচনা হয় ।
বক্তারা উল্লেখ করেন, টেকসই চামড়া শিল্প গড়ে তোলার জন্য পরিবেশগত ক্ষতির কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের সুরক্ষা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই শিল্পকে আরও টেকসই করা সম্ভব।
সভায় সরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধি, চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তা, মালিক পক্ষের প্রতিনিধি, শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি, বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
জোবায়ের আহমেদ 




















