বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জাহাজ ভাঙা হয় বাংলাদেশে, বিশেষ করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড অঞ্চলে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে শ্রমিকের ঝুঁকি এবং পরিবেশের মহাক্ষতি বরাবরই আলোচিত বিষয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের জাহাজভাঙা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী কিছুটা ‘গ্রিন’ হওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে। জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশে সনাতন পদ্ধতিতে জাহাজ ভাঙার কাজ চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়েছে। পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ই এখন কেবল স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করতে ও ভাঙতে পারবে।
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনের চুম্বকাংশ তুলে ধরা হলো: দেশের একমাত্র জাহাজভাঙা কারখানার অঞ্চল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এখন পর্যন্ত ১৭টি ইয়ার্ড পরিবেশবান্ধব গ্রিন কারখানার স্বীকৃতি পেয়েছে। এতে করে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমেছে। কিছু দুর্ঘটনা ঘটলেও শ্রমিক সুরক্ষা বেড়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

তবে এখনো ট্রিটমেন্ট স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি (টিএসডিএফ) বা কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি।
এর অভাবে বিভিন্ন ইয়ার্ডে জমানো উচ্চমাত্রার ক্ষতিকর বর্জ্য পরিশোধন করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৭ সালের আগে এই টিএসডিএফ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
২০০৯ সালে গৃহীত জাহাজ পুনর্ব্যবহার (ship recycling) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি হংকং কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তি বাস্তবায়নের শেষ সময় ছিল এ বছরের ৩০ জুন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যারা গ্রিন ইয়ার্ড বা পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে সনদ পেয়েছে, এখন ওই প্রতিষ্ঠানগুলোই জাহাজ আমদানি করতে পারবে। ১৭টির পর আরো প্রায় পাঁচটি ইয়ার্ড গ্রিন সনদ প্রাপ্তির জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে চলেছে।
এর আগে গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানার ব্যাপক উত্থান শুরু হয়। উপজেলাটির ২০ কিলোমিটার সাগর উপকূলে একে একে গড়ে উঠতে থাকে জাহাজভাঙার ইয়ার্ড। তখন ন্যূনতম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ইয়ার্ড হয়। ফলে পরিবেশ বিধ্বংসী নানা কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। সাগরে এবং যত্রতত্র তরল বর্জ্য ফেলা, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী ধ্বংস করা, তেজস্ক্রিয় জাহাজ আমদানি, বিস্ফোরণ, বর্জ্য শোধন না করাসহ নানামুখী কর্মকাণ্ডে বারবার খবরের শিরোনাম হয় এই খাত।

এ কারণে পরিবেশবাদী সংগঠন, বিশেষ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) হংকং কনভেনশন বাস্তবায়নের জন্য নানামুখী তৎপরতা শুরু করে। নানা চাপে পড়ে সরকার উদ্যোগ নেয়। পাঁচ-ছয় বছর আগে ইয়ার্ড ছিল প্রায় ১৫০টি। এর মধ্যে ১০৫টি কারখানাকে পরিবেশবান্ধব (গ্রিন) করার লক্ষ্যে উন্নয়নকাজ করার অনুমোদন দিয়েছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। গ্রিন করার জন্য বড় অংকের বিনিয়োগের দরকার। এই খরচ এবং ব্যবসা মন্দার কারণে বেশির ভাগ ইয়ার্ড গ্রিন করার পথে আপাতত হাঁটছে না।
২০১৭ সালে দেশের প্রথম গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে যাত্রা শুরু করে পিএইচপি শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইয়ার্ডের কার্যক্রম পরিদর্শন এবং পর্যবেক্ষণ করে এই সনদ দিয়ে থাকে। গ্রিন ইয়ার্ডের বেশির ভাগ কাজ-কর্ম স্বয়ংক্রিয়। এজন্য বড় বড় লোহার পাত ওঠানো-নামানোর জন্য চুম্বক আকর্ষক ক্রেন, লোডারসহ নানা যন্ত্রপাতি থাকে।
গ্রিন ইয়ার্ড স্বীকৃতি পাওয়া একটি কারখানার সত্ত্বাধিকারী মো. তছলিম উদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, “গ্যাস ও তেলমুক্ত করার আগে কোনো জাহাজ কাটায় হাত দেওয়া হয় না। গ্রিন ইয়ার্ডে এখন আর আগের মতো কাঁধে করে লোহার পাত ওঠানো-নামানো হয় না। সবকিছু হয় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে। এছাড়া তেলজাতীয় বর্জ্যসহ যাবতীয় বর্জ্য রাখার পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে। যাবতীয় বর্জ্য পরিশোধন করা হয়। উচ্চ তাপমাত্রায় পরিশোধনযোগ্য বর্জ্য কিছু বাইরের প্রতিষ্ঠান নিয়ে যায়। প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শ্রমিক নেই। দুর্ঘটনাও কমেছে অনেক।”
সম্পূর্ণ গ্যাস ও তেলমুক্ত করে জাহাজ কাটার অনুমতি নিতে হয় বলেও তিনি জানান। তাছাড়া বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হয় বলেও জানান মো. তছলিম উদ্দিন।
বাস্তবতা কী বলছে
জাহাজভাঙা শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশগত দিক থেকে এ শিল্পের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে অ্যাজবেস্টসের মতো ক্ষতিকর বর্জ্য উচ্চ তাপমাত্রায় ধ্বংসের জন্য প্রস্তাবিত টিএসডিএফ বা কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটির তেমন অগ্রগতি নেই। জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডের উদ্যোগে বিদেশি অর্থায়নে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা।
প্রথমে এটি হওয়ার কথা ছিল সীতাকুণ্ড উপজেলায়। কিন্তু পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে স্থান পরিবর্তন করে তা মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে প্রকল্পটির জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বলেন,”জাহাজভাঙার বর্জ্য পরিশোধনের জন্য মিরসরাইয়ে একটা জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করবে আইএমও। এ জন্য দরপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। এটাতে জাপানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর জাইকা অর্থায়ন করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, ‘‘সমীক্ষা শেষে ডিপিপি করা হবে। অর্থায়ন পেলে কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ২০২৭ নাগাদ। অনেককিছুর ওপর এই প্রকল্প নির্ভর করছে।”
টিএসডিএফ না হওয়া পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদিত কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বর্জ্য শোধন করা হয় বলে ইয়ার্ড সূত্র জানায়। তবে অ্যাজবেস্টসের মতো বর্জ্য বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়।
তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-র চট্টগ্রামের ফিল্ড ফ্যাসিলেটর মনিরা পারভীন রুবা ডয়চে ভেলেকে বলেন, “গ্রিন ইয়ার্ড বলে একটা বাহ্যিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কেবল। অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ ও শ্রমিকদের সেই অর্থে কী পরিবর্তন হয়েছে। যদি কোনো প্রতিনিধি দল যায়, তখন তারা শ্রমিকদের সুরক্ষা পোশাকসহ যাবতীয়গুলো ব্যবহার করে। আর পরিবেশের দিক থেকে এখনো সে অর্থে উন্নতি হয়নি।”
সূত্র: ডয়শে ভেলে বাংলা
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















