সংবাদ শিরোনাম ::
Logo পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাহসান খান Logo এবার মুস্তাফিজকে নিয়ে মুখ খুললেন সাকিব আল হাসান Logo বাঘ-হাতি হত্যা করলে ৭ বছর জেল, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অন্যান্য প্রাণী শিকারেও দ্বিগুণ শাস্তি Logo নির্বাচনে ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় জাতিসংঘের সহায়তা চাইলেন প্রধান উপদেষ্টা Logo হাইড্রোজেন ওয়াটার যে উপকারে আসে Logo ট্রাম্পের সামরিক বৈঠক, ইরানও প্রস্তুত! দুই দেশ কি তবে শিগগিরই যুদ্ধে জড়াচ্ছে? Logo তাহসান-রোজার বিচ্ছেদ নিয়ে পাওয়া গেল চাঞ্চল্যকর তথ্য Logo এবার স্পন্সরশিপ হারাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট Logo মাত্র ২ চিকিৎসক দিয়ে দেশের সব বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা! Logo মুহাম্মদ মনির হোসেন সম্পাদিত ‘নদীকাহন’ গ্রন্থের পাঠ উন্মোচন

নদীভাঙনে ভাঙে সংসারও

নদীভাঙনে ভাঙে সংসারও

২০২৪ সালের ডিসেম্বর, ভোর হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র পাড়ে নুনখাওয়া ঘাটের কুয়াশা কেটে যাচ্ছে সূর্যের উদয়ে। ঘাটের রাস্তার শেষ সীমায় দাঁড় করানো ট্রাক থেকে নৌকায় তোলা হচ্ছে ১০ বস্তা কম্বল আর কয়েক কার্টন ওষুধ। গন্তব্য কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল নারায়ণপুর। ঘাট থেকে নৌকা ছাড়লো সকাল সকাল, শীতের শান্ত নদী, টলটলে পানি।

নৌকায় স্তুপ করে রাখা কম্বলের বস্তার উপর বসে সেই নদী দেখতে দেখতে মাঝি কামাল ভাইয়ের কাছে শুনছিলাম তাদের নদীজীবনের কথা। তিনি জানালেন, প্রতি বর্ষায় আপাত নিরীহ চেহারার এই নদীই দেখায় ভয়াল রূপ! তীব্র স্রোতে ভাসায় নদী তীরের জনপদ, ভাঙনে বিলীন হয় বিশাল সব চর, গ্রামের পর গ্রাম। কামালের ভাষ্যমতে, “গত কয়েক বছর নদী যেন বর্ষায় আরও পাগলা হইয়া যাইতাছে, এক রাইতের মইধ্যে ভিটা-মাটি, গাছপালা, ইস্কুল, আত্মীয়-স্বজনের কবর – সব ভাইঙ্গা নিয়া যাইতাছে।”

কামাল ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম: আর নদীভাঙা মানুষদের কী হয়? জবাবে মাঝি জানালেন, ভিটা-মাটি সব হারিয়ে মাঝ বয়সীরা ঢাকায় গিয়ে রিক্সা চালায়। আর চর নারায়ণপুরের যুবক বয়সীরা বেশিরভাগই ঢাকায় রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করে। অনেকে একেবারে পরিবারসহ চলে যায় আবার কেউ আত্মীয়দের জিম্মায় স্ত্রী-সন্তানদের রেখে যায়।

যারা বাংলাদেশের বন্যা সম্পর্কে অবগত তারা জানেন যে প্রতি বর্ষার শুরুতে উত্তর জনপদের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলগুলোর মানুষ ডোবে পানিতে, এরপর বন্যার বিদায়ের সময় পানির টানে ভাঙতে ভাঙতে হারিয়ে যায় কত চর। গত কয়েক বছর ধরে গ্রীষ্মে তীব্র গরম এবং বর্ষায় ভারী বর্ষণে বন্যা যেন উত্তর জনপদের এক নিয়মিত বিপদ। নদী ভাঙনের মতো দুর্যোগে যে কেবল জনপদ ভাঙে তা-ই নয়, ভাঙে কত স্বপ্ন, সাধের সংসার। এসব ভাঙার গল্প অল্প অল্প করে জানা শুরু হলো উত্তরের এই দুর্গম চরাঞ্চল সফরে।

কামাল ভাইয়ের কাছে নদী ভাঙন, মানুষের সংগ্রামের কথা শুনতে শুনতে, চরের নানা অচেনা পাখি দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি। ৩ ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে নৌকা ভিড়লো মিরকামারি ঘাটে। নদী ভাঙনে ঘাটের চেহারাই বদলে গেছে, সেখানেই কোনমতে দাঁড়ানো দু’টি ঘোড়ার গাড়িতে ওঠানো হলো শীতবস্ত্রের বস্তা আর ওষুধের বাক্সগুলো।

স্বেচ্ছাসেবকরা চেপে বসলেন ঘাটে অপেক্ষারত মোটরসাইকেলগুলোতে। নদীর ভাঙা তীর ঘেঁষে, কখনো সরিষা খেত, কখনো আবার কারও বাড়ির উঠান চিড়ে যাওয়া মাটির এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললো ঘোড়ার গাড়ি-মোটরসাইকেলের বিচিত্র বহর।

সকাল তখন প্রায় এগারোটা, বহরটি পৌঁছে গেল মধ্য নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ততোক্ষণে কম্বল ও ওষুধের জন্য  চরবাসী জোড়ো হয়েছে স্কুলের বালুময় মাঠে।

শহরে বসে জলবায়ু পরিবর্তন, ভারী বৃষ্টি আর বন্যা এবং বন্যায় নদী ভাঙনের নিয়মিত খবর পড়া চোখে এবার উত্তরবঙ্গের মানুষের বাস্তবতা দেখতে শুরু করলাম। শীতের শুকনো মৌসুমে বালুভরা মাঠে অল্প একটু সহায়তার আশায় শত মানুষের ভিড়। স্বেচ্ছাসেবকরা ব্যস্ত হয়ে গেলেন চিকিৎসা সেবা ও শীতবস্ত্র নিতে আসা চরবাসীকে লাইনে দাঁড় করাতে, তাদের হাতে হাতে দেয়া হচ্ছিলো সাদা ও হলুদ কাগজের টোকেন।

তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে স্কুলমাঠে রাখা একটি বেঞ্চে বসেছিলেন ইসমেত আরা। কোনো টোকেন পাননি, হয়তো ভিড়ে সন্তানদের নিয়ে হুড়োহুড়ি করে টোকেন নিতেই পারেননি।

 

ছবি তুলতে তাদের কাছাকাছি যেতেই অনুরোধ করলেন একটা হলেও যেন কম্বল তাকে যোগাড় করে দেয়া হয়, শীতে বাচ্চাদের খুব উপকার হতো। জানা গেল, চরের দুঃস্থ মানুষদের নিয়ে করা তালিকায় কোনোভাবে হয়তো ইসমেত বাদ পড়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ইসমেতের পাশে এসে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধা, জবুন্নেসা। তিনি জানালেন ইসমেত অতো কিছু বোঝে না, তার স্বামী নিখোঁজ। তিন বাচ্চা নিয়ে বেচারি বিপদে আছে। গ্রামে হাত পেতে খেয়ে বেঁচে আছেন, থাকেন ভাইয়ের বাড়িতে। শহর থেকে আসা মানুষের সামনে ইসমেত ইতস্তত।

নদীভাঙনে বসতবাড়ি-চাষের জমির পর স্বামীকে হারিয়ে ৩ সন্তানসহ ইসমেতের টিকে থাকার সংগ্রাম চলছে

তার বড় মেয়েটির নাম আসিয়া, এবারই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ওর সাথে হালকা আলাপ করায় ইসমেতও যেন কিছুটা স্বাভাবিক হলেন। এরপর তার কাছেই শুনলাম নদী ভাঙনে কিভাবে মানুষের সংসার ভাঙে, সেই সত্য গল্প।

 

নদীতে জমি-জমা হারিয়ে ইসমেতের স্বামী আবুল হোসেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে উঠেছিলেন শ্বশুরবাড়িতে। চরে দিনমজুর আবুলের সপ্তাহে বড়জোর একদিন কাজ জুটতো, সেই আয়ে পাঁচজনের সংসারে ভাত-কাপড় যোগাড় সম্ভব হতো না।

 

ইসমেত বলেন, ‘নদীতে বাড়ি-ঘর জমি হারায় আমরা ভাইয়ের বাড়িত থাকতাম। তার আয়ে সংসার চলতো না। ছোট ছোল (সন্তান) নিয়ে আমি তখন ছটি (আঁতুড়) ঘরে। সে ঢাকাত গেলো রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করতে, আইজ চাইর (চার) বচ্ছর তার আর কোনো খোঁজ নাই।’

 

কী হলো আবুল হোসেনের? ইসমেত জানেন না। গ্রামবাসী নানা কথা বলে। কেউ বলে আবুল হোসেন শহরে রিক্সা চালিয়ে সেখানেই হয়তো নতুন সংসার করছে। আবার কেউ বলে হয়তো আবুল হোসেন কাজ করতে গিয়ে মরে গেছে। কারণ তার খোঁজ পরিবারের কেউও জানে না!

এখন ইসমেত কী করেন? কিভাবে চলেন? প্রশ্নের জবাবে সামনে কেমন এক শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ত্রিশোর্ধ ইসমেত বলেন, ‘গ্রামঘুরি খাই’, অর্থাৎ গ্রামের মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে চাল-ডাল-টাকা যা পান তাই দিয়ে তিন সন্তান নিয়ে টিকে থাকছেন তিনি।

 

ইসমেতের স্বামী আবুল হোসেনের মতো জীবিকার সন্ধানে উত্তরের দুর্গম চরাঞ্চল থেকে ঢাকায় আসেন প্রতিদিন শত শত মানুষ, তাদের ঠাই হয় বস্তিগুলোতে।

 

বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০১৪ সালে বস্তি শুমারি করেছিলো পরিসংখ্যান ব্যুরো। এরপর তা নিয়ে আর কোন তথ্য পাওয়া যায়না।

 

প্রতিবছর নদী ভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা শুধু কাজের খোঁজেই হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় আসছেন।

 

২০১৪ সালে বস্তি শুমারি অনুযায়ী ঢাকা শহরের দুই সিটি কর্পোরেশনে মোট ৩ হাজার ৩৯৪টি বস্তি রয়েছে। সেখানে মোট ঘরের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজারের মতো।

 

এই জরীপ অনুযায়ী সেসময় সাড়ে ৬ লাখের মতো লোক এসব বস্তিতে বসবাস করেন। ২০১৪ সালের শুমারি অনুযায়ী সারা দেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২২ লক্ষ। তবে এসব সংখ্যা ও তথ্য উপাত্ত নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। ২০১৪ সালের পর এখন ২০২৫ সালে বস্তি বা বস্তিবাসীর সংখ্যা কত তার কোন হিসেব কারো জানা নেই।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাহসান খান

নদীভাঙনে ভাঙে সংসারও

আপডেট সময় ০৪:২৬:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫

২০২৪ সালের ডিসেম্বর, ভোর হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র পাড়ে নুনখাওয়া ঘাটের কুয়াশা কেটে যাচ্ছে সূর্যের উদয়ে। ঘাটের রাস্তার শেষ সীমায় দাঁড় করানো ট্রাক থেকে নৌকায় তোলা হচ্ছে ১০ বস্তা কম্বল আর কয়েক কার্টন ওষুধ। গন্তব্য কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল নারায়ণপুর। ঘাট থেকে নৌকা ছাড়লো সকাল সকাল, শীতের শান্ত নদী, টলটলে পানি।

নৌকায় স্তুপ করে রাখা কম্বলের বস্তার উপর বসে সেই নদী দেখতে দেখতে মাঝি কামাল ভাইয়ের কাছে শুনছিলাম তাদের নদীজীবনের কথা। তিনি জানালেন, প্রতি বর্ষায় আপাত নিরীহ চেহারার এই নদীই দেখায় ভয়াল রূপ! তীব্র স্রোতে ভাসায় নদী তীরের জনপদ, ভাঙনে বিলীন হয় বিশাল সব চর, গ্রামের পর গ্রাম। কামালের ভাষ্যমতে, “গত কয়েক বছর নদী যেন বর্ষায় আরও পাগলা হইয়া যাইতাছে, এক রাইতের মইধ্যে ভিটা-মাটি, গাছপালা, ইস্কুল, আত্মীয়-স্বজনের কবর – সব ভাইঙ্গা নিয়া যাইতাছে।”

কামাল ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম: আর নদীভাঙা মানুষদের কী হয়? জবাবে মাঝি জানালেন, ভিটা-মাটি সব হারিয়ে মাঝ বয়সীরা ঢাকায় গিয়ে রিক্সা চালায়। আর চর নারায়ণপুরের যুবক বয়সীরা বেশিরভাগই ঢাকায় রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করে। অনেকে একেবারে পরিবারসহ চলে যায় আবার কেউ আত্মীয়দের জিম্মায় স্ত্রী-সন্তানদের রেখে যায়।

যারা বাংলাদেশের বন্যা সম্পর্কে অবগত তারা জানেন যে প্রতি বর্ষার শুরুতে উত্তর জনপদের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলগুলোর মানুষ ডোবে পানিতে, এরপর বন্যার বিদায়ের সময় পানির টানে ভাঙতে ভাঙতে হারিয়ে যায় কত চর। গত কয়েক বছর ধরে গ্রীষ্মে তীব্র গরম এবং বর্ষায় ভারী বর্ষণে বন্যা যেন উত্তর জনপদের এক নিয়মিত বিপদ। নদী ভাঙনের মতো দুর্যোগে যে কেবল জনপদ ভাঙে তা-ই নয়, ভাঙে কত স্বপ্ন, সাধের সংসার। এসব ভাঙার গল্প অল্প অল্প করে জানা শুরু হলো উত্তরের এই দুর্গম চরাঞ্চল সফরে।

কামাল ভাইয়ের কাছে নদী ভাঙন, মানুষের সংগ্রামের কথা শুনতে শুনতে, চরের নানা অচেনা পাখি দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি। ৩ ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে নৌকা ভিড়লো মিরকামারি ঘাটে। নদী ভাঙনে ঘাটের চেহারাই বদলে গেছে, সেখানেই কোনমতে দাঁড়ানো দু’টি ঘোড়ার গাড়িতে ওঠানো হলো শীতবস্ত্রের বস্তা আর ওষুধের বাক্সগুলো।

স্বেচ্ছাসেবকরা চেপে বসলেন ঘাটে অপেক্ষারত মোটরসাইকেলগুলোতে। নদীর ভাঙা তীর ঘেঁষে, কখনো সরিষা খেত, কখনো আবার কারও বাড়ির উঠান চিড়ে যাওয়া মাটির এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললো ঘোড়ার গাড়ি-মোটরসাইকেলের বিচিত্র বহর।

সকাল তখন প্রায় এগারোটা, বহরটি পৌঁছে গেল মধ্য নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ততোক্ষণে কম্বল ও ওষুধের জন্য  চরবাসী জোড়ো হয়েছে স্কুলের বালুময় মাঠে।

শহরে বসে জলবায়ু পরিবর্তন, ভারী বৃষ্টি আর বন্যা এবং বন্যায় নদী ভাঙনের নিয়মিত খবর পড়া চোখে এবার উত্তরবঙ্গের মানুষের বাস্তবতা দেখতে শুরু করলাম। শীতের শুকনো মৌসুমে বালুভরা মাঠে অল্প একটু সহায়তার আশায় শত মানুষের ভিড়। স্বেচ্ছাসেবকরা ব্যস্ত হয়ে গেলেন চিকিৎসা সেবা ও শীতবস্ত্র নিতে আসা চরবাসীকে লাইনে দাঁড় করাতে, তাদের হাতে হাতে দেয়া হচ্ছিলো সাদা ও হলুদ কাগজের টোকেন।

তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে স্কুলমাঠে রাখা একটি বেঞ্চে বসেছিলেন ইসমেত আরা। কোনো টোকেন পাননি, হয়তো ভিড়ে সন্তানদের নিয়ে হুড়োহুড়ি করে টোকেন নিতেই পারেননি।

 

ছবি তুলতে তাদের কাছাকাছি যেতেই অনুরোধ করলেন একটা হলেও যেন কম্বল তাকে যোগাড় করে দেয়া হয়, শীতে বাচ্চাদের খুব উপকার হতো। জানা গেল, চরের দুঃস্থ মানুষদের নিয়ে করা তালিকায় কোনোভাবে হয়তো ইসমেত বাদ পড়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ইসমেতের পাশে এসে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধা, জবুন্নেসা। তিনি জানালেন ইসমেত অতো কিছু বোঝে না, তার স্বামী নিখোঁজ। তিন বাচ্চা নিয়ে বেচারি বিপদে আছে। গ্রামে হাত পেতে খেয়ে বেঁচে আছেন, থাকেন ভাইয়ের বাড়িতে। শহর থেকে আসা মানুষের সামনে ইসমেত ইতস্তত।

নদীভাঙনে বসতবাড়ি-চাষের জমির পর স্বামীকে হারিয়ে ৩ সন্তানসহ ইসমেতের টিকে থাকার সংগ্রাম চলছে

তার বড় মেয়েটির নাম আসিয়া, এবারই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ওর সাথে হালকা আলাপ করায় ইসমেতও যেন কিছুটা স্বাভাবিক হলেন। এরপর তার কাছেই শুনলাম নদী ভাঙনে কিভাবে মানুষের সংসার ভাঙে, সেই সত্য গল্প।

 

নদীতে জমি-জমা হারিয়ে ইসমেতের স্বামী আবুল হোসেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে উঠেছিলেন শ্বশুরবাড়িতে। চরে দিনমজুর আবুলের সপ্তাহে বড়জোর একদিন কাজ জুটতো, সেই আয়ে পাঁচজনের সংসারে ভাত-কাপড় যোগাড় সম্ভব হতো না।

 

ইসমেত বলেন, ‘নদীতে বাড়ি-ঘর জমি হারায় আমরা ভাইয়ের বাড়িত থাকতাম। তার আয়ে সংসার চলতো না। ছোট ছোল (সন্তান) নিয়ে আমি তখন ছটি (আঁতুড়) ঘরে। সে ঢাকাত গেলো রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করতে, আইজ চাইর (চার) বচ্ছর তার আর কোনো খোঁজ নাই।’

 

কী হলো আবুল হোসেনের? ইসমেত জানেন না। গ্রামবাসী নানা কথা বলে। কেউ বলে আবুল হোসেন শহরে রিক্সা চালিয়ে সেখানেই হয়তো নতুন সংসার করছে। আবার কেউ বলে হয়তো আবুল হোসেন কাজ করতে গিয়ে মরে গেছে। কারণ তার খোঁজ পরিবারের কেউও জানে না!

এখন ইসমেত কী করেন? কিভাবে চলেন? প্রশ্নের জবাবে সামনে কেমন এক শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ত্রিশোর্ধ ইসমেত বলেন, ‘গ্রামঘুরি খাই’, অর্থাৎ গ্রামের মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে চাল-ডাল-টাকা যা পান তাই দিয়ে তিন সন্তান নিয়ে টিকে থাকছেন তিনি।

 

ইসমেতের স্বামী আবুল হোসেনের মতো জীবিকার সন্ধানে উত্তরের দুর্গম চরাঞ্চল থেকে ঢাকায় আসেন প্রতিদিন শত শত মানুষ, তাদের ঠাই হয় বস্তিগুলোতে।

 

বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০১৪ সালে বস্তি শুমারি করেছিলো পরিসংখ্যান ব্যুরো। এরপর তা নিয়ে আর কোন তথ্য পাওয়া যায়না।

 

প্রতিবছর নদী ভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা শুধু কাজের খোঁজেই হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় আসছেন।

 

২০১৪ সালে বস্তি শুমারি অনুযায়ী ঢাকা শহরের দুই সিটি কর্পোরেশনে মোট ৩ হাজার ৩৯৪টি বস্তি রয়েছে। সেখানে মোট ঘরের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজারের মতো।

 

এই জরীপ অনুযায়ী সেসময় সাড়ে ৬ লাখের মতো লোক এসব বস্তিতে বসবাস করেন। ২০১৪ সালের শুমারি অনুযায়ী সারা দেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২২ লক্ষ। তবে এসব সংখ্যা ও তথ্য উপাত্ত নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। ২০১৪ সালের পর এখন ২০২৫ সালে বস্তি বা বস্তিবাসীর সংখ্যা কত তার কোন হিসেব কারো জানা নেই।