সংবাদ শিরোনাম ::
Logo পাবলো এসকোবারের ‘কোকেন’ জলহস্তীদের নিয়ে বিপাকে কলম্বিয়া Logo জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হতে পারে: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা Logo আজ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা Logo ১৬ এপ্রিলের আবহাওয়া স্বস্তিদায়ক হতে পারে, তবে এরপর আবার গরম Logo মিরসরাইয়ে হরিণ জবাই! জড়িতদের ধরতে বন বিভাগের অভিযান Logo জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নতুন নির্দেশনা Logo প্রাণী নির্যাতন বন্ধে সরকারের কাছে আইনি নোটিশ Logo কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপার ক্ষোভ: এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী মানুষ Logo পহেলা বৈশাখে আকাশ থাকতে পারে মেঘলা, তাপপ্রবাহ চলছে, সঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা Logo পহেলা বৈশাখে বন্ধ থাকবে মেট্রোরেলের দুটি স্টেশন

পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন – আবেগের আতিশয্যে হঠকারী সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার পথে এগোচ্ছে নাতো বাংলাদেশের ক্রিকেট?

  • জয়ন্ত সরকার
  • আপডেট সময় ০১:৪৪:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
  • 184

মুষ্টিমেয় উগ্রপন্থী ভারতীয়দের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বিসিসিআই-এর অবিবেচক সিদ্ধান্তে আইপিএল-এর অন্যতম জনপ্রিয় দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া ইস্যুতে বিস্তর জলঘোলা চলছে প্রতিবেশী দুই দেশেই। আর সেই ঘোলা পানিতেই মাছ শিকারে ব্যস্ত বাংলাদেশের স্বার্থান্বেষী এবং সুযোগসন্ধানী কিছু ব্যক্তিত্ব। বলা চলে, অনেকে নিজেদের সীমাহীন ব্যর্থতা ঢাকতে উগ্র জাতীয়তাবাদের মতো সস্তা জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে খাদের কিনারে ঠেলে দিতে চাইছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর তাদের অনেকে হয়তো ফিরে যাবেন স্ব-স্ব ভূমিকায়, কিন্তু সাময়িক আবেগের বশে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ঠেলে দিচ্ছেন কি দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে? বিষয়টি অবশ্যই গভীরভাবে চিন্তার দাবি রাখে।

পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন। বিসিসিআই-এর অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ জানিয়ে দেয়  আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় ভারতের মাটিতে খেলতে যাবে না বাংলাদেশ। তাই ভারতের পরিবর্তে বাংলাদেশের খেলাগুলো সহআয়োজক শ্রীলঙ্কা বা অন্য কোনও দেশে আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে আইপিএল-এর খেলাগুলো সম্প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার, যা অবশ্যই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। আর এরপর থেকেই চলছে বিসিবি-আইসিসি নিয়মিত ই-মেইল আদান-প্রদান। একই সময়ে ভারতের বিভিন্ন স্পন্সর ও ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে। যা বৃহৎ পরিসরে এদেশের ক্রিকেট উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বৈকি!

পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয়দলের সাবেক অধিনায়ক এবং ওপেনার তামিম ইকবাল বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলে বিসিবি’র একজন পরিচালক তাঁকে ‘ভারতের পরীক্ষিত দালাল’ বলে কদর্য ভাষায় ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন। প্রতিবাদে বিভিন্ন মহলের পাশাপাশি ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। এরইমধ্যে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিসিবি-আইসিসি’র অভ্যন্তরীণ যোগাযোগকে বিকৃত করে উপস্থাপন করেছেন বলে আইসিসি’র পক্ষ থেকে বিবৃতি প্রদানপূর্বক বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। একইভাবে বিসিবি’র পক্ষ থেকেও ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যকে বিসিবি’র আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয় বলে বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ সবদিক থেকেই এখন অনেকটা লেজে গোবরে অবস্থা!

এমন পরিস্থিতিতে গত ১৩ জানুয়ারি, ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয় আইসিসি-বিসিবি ভিডিও কনফারেন্স। যেখানে আইসিসি’র জোর অনুরোধ সত্ত্বেও বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে নিজেদের অনড় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলেও জানা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনও পর্যন্ত পেন্ডুলামের মতো দুলছে বা বলা চলে বিশাল অনিশ্চয়তার গহ্বরে আটকে পড়েছে!

এবার চলমান প্রেক্ষাপট একটু বাস্তবতার নিরীখে বিবেচনা করা যাক। অসংখ্য আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল আইসিসি’তে ভারতের প্রভাব-প্রতিপত্তি-আধিপত্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন বলেই আমার ব্যক্তিগত ধারণা। অন্তত তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই বিষয়টিকেই প্রতিভাত করে তোলে। আইসিসি’র বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ একদিকে যেমন মাত্র কিছুদিন আগেও ছিলেন বিসিসিআই সচিব, তেমনি তিনি ভারতের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র পুত্র। এদিকে ৫ আগস্ট উত্তর পরিস্থিতিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক ইতিহাসের ভয়াবহ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলাই শ্রেয়।

এমন প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা’র প্রশ্ন তুলে ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে না চাওয়ার দাবি আইসিসি’র টেবিলে কতটা শক্ত ভিত্তি পাবে সে প্রশ্ন তাই অমূলক নয়! এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, জয় শাহ’র নেতৃত্বাধীন আইসিসি যদি বাংলাদেশের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের খেলাগুলো অন্য কোনও দেশে সরিয়ে নেয়; তাহলে সেটা প্রত্যক্ষভাবে তাঁর পিতা অর্থাৎ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংক্রান্ত সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে। সন্তান হয়ে তিনি নিশ্চয় পিতাকে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে চাইবেন না! অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধীদের হাতে এমন একটা মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিতে তিনি একাধিকবার ভাববেন বলেই আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাস।

তাহলে কী হবে বাংলাদেশের টি২০ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের পরিণতি? একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই বিষয়টি সম্পর্কে একটু ধারণা পাওয়া যেতে পারে। টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হবে ৭ ফেব্রুয়ারি এবং সেদিনই বাংলাদেশের প্রথম খেলা। সময়ের হিসেবে হাতে আছে মাত্র ২৪-২৫ দিন। বাংলাদেশ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে আইসিসিতে অভিযোগ জানায় আজ থেকে প্রায় সপ্তাহখানেক আগে অর্থাৎ হাতে প্রায় একমাস সময় রেখে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে আইসিসি থেকে সুনির্দিষ্ট কোনও দিক-নির্দেশনা বা অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। এরই মধ্যে বাংলাদেশি এবং আইসিসি’র এলিট প্যানেলভুক্ত আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা শহীদ ইবনে সৈকত ভারতের মাটিতে চলমান ভারত-নিউজিল্যান্ড ওয়ান ডে সিরিজে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করছেন, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এমতাবস্থায় আইসিসি’র ধীরে চলো নীতি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বিরাট অশনি সংকেত বলেই আমার ব্যক্তিগত ধারণা। ভারতের মাটিতে একজন বাংলাদেশি আম্পায়ারের আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা একদিকে যেমন নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্নকে উড়িয়ে দিতে আইসিসি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে; অন্যদিকে লজিস্টিক সাপোর্ট এবং অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দলগুলোর মতামতের প্রসঙ্গ তুলে স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে বিশ্বকাপের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টের খেলা অন্য কোনও দেশে স্থানান্তর সম্ভব নয় বলে প্রতিষ্ঠিত করতে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালাতে পারে। অর্থাৎ ভারতের মাটিতেই বাংলাদেশের খেলাগুলো রেখে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে বল বাংলাদেশের কোর্টেই ঠেলে দিতে পারে আইসিসি। এমনটা হলে কী করবে বাংলাদেশ?

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। এখান থেকে এখন ইউটার্ন কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা একদিকে যেমন বিসিবি, ক্রীড়া উপদেষ্টাসহ বাংলাদেশ সরকারের নীতিতে অটল থাকার পরীক্ষা, বিপরীতে বাংলাদেশেরও একদল উগ্র ভারতবিরোধী জনগোষ্ঠীর আস্থা অটুট রাখার অগ্নি পরীক্ষা। এরইমধ্যে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টায় লিপ্ত পাকিস্তান। দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে জানা যায়, আইসিসি বাংলাদেশের দাবি মেনে না নিলে বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করতে পারে তারা। এ নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেলেও এখন শোনা যাচ্ছে এ ধরনের কোনও পরিকল্পনা নেই পিসিবি’র। এমন তথৈবচ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্তে অটল থাকে তাহলে কী ঘটতে পারে অনাগত ভবিষ্যতে? চলুন এ সংক্রান্ত আইসিসি’র নিয়মাবলী সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়া যাক-

টি-২০ বিশ্বকাপ-২০২৬ বা আইসিসি আয়োজিত কোনও বৈশ্বিক আসরে কোনো দল বা দেশ অংশ নিতে না চাইলে বা ভেন্যু নিয়ে আপত্তি জানালে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর নিয়ম অনুযায়ী তাদের ম্যাচগুলো ‘ফোরফিট’ (forfeit) বা ছেড়ে দিতে হতে পারে। তবে দলটির আপত্তির কারণ (যেমন নিরাপত্তা) গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় এবং আইসিসি বিকল্প ভেন্যু (যেমন শ্রীলঙ্কা) নির্ধারণ করতে পারে, যা অতীতে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। যদি আইসিসি ভেন্যু পরিবর্তন না করে এবং সংশ্লিষ্ট দেশ বা দলটি আপত্তি জানাতে থাকে; তবে তাদের পয়েন্টও বাতিল হতে পারে। ফলে সেই দল টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়তে পারে। যা টুর্নামেন্টের সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলে।

 

এতদসংক্রান্ত কতিপয় নিয়ম ও পদ্ধতি:

  1. আইসিসি-র কাছে আবেদন: কোনো দল যদি ভেন্যু নিয়ে সমস্যায় পড়ে, তবে তারা আইসিসি-এর কাছে লিখিতভাবে আবেদন জানাতে পারে এবং বিকল্প ভেন্যুর জন্য অনুরোধ করতে পারে, যা নিরাপত্তা বা অন্যান্য কারণেও হতে পারে।
  2. আইসিসির সিদ্ধান্ত: আইসিসি -এর কাছে এই ধরনের আবেদন এলে তারা পরিস্থিতি বিবেচনা করে। যদি ভেন্যু পরিবর্তন করা হয়, তবে খেলা সেই নতুন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয় (যেমনটি পাকিস্তান ক্রিকেট দল বা পিসিবি-এর ক্ষেত্রে অতীতে ঘটেছিল)।
  3. ফোরফিট বা Points deduction: যদি আইসিসি আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং দল অংশগ্রহণ না করে, তবে সেই দল টুর্নামেন্ট থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং তাদের ম্যাচগুলো ‘ফোরফিট’ হিসেবে গণ্য হয়, যা তাদের পয়েন্ট টেবিলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পূর্ববর্তী উদাহরণ:

  • ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে’তে খেলতে না যাওয়ায় এবং নিউজিল্যান্ড নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে কেনিয়া সফর বাতিল করার পর তারা পয়েন্ট হারায়।
  • জিম্বাবুয়েও ভিসা সংক্রান্ত সমস্যার কারণে ২০০৯ টি২০ বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল।
  • নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে অস্ট্রেলিয়া অনূর্দ্ধ ১৯ দল ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনূর্দ্ধ ১৯ বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে।

সুতরাং, নিয়ম অনুযায়ী, দলগুলি ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য আবেদন করতে পারে। কিন্তু আইসিসি যদি তাদের দাবি না মানে, তবে তাদের টুর্নামেন্ট ছেড়ে দিতে হতে পারে এবং নিয়ম অনুযায়ী পয়েন্টও হারাতে হয়। আর জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ অনুসারে, আইসিসি নাকি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিষয়ক সিদ্ধান্ত জানাতে ২১ জানুয়ারি ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছে। আর বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে র‌্যাঙ্কিং-এ তুলনামূলক ভাল অবস্থানে থাকা স্কটল্যান্ডের নাম উঠে এসেছে এএফপি’র সংবাদে। যদিও আইসিসি কর্তৃক আলটিমেটামের বিষয়টি ইতোমধ্যে অস্বীকার করেছে বিসিবি ।

আইসিসি আয়োজিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কোনো দেশ বা দল অংশগ্রহণ করতে না চাইলে আইসিসি-র  নিয়ম ও নীতি অনুযায়ী নিম্নোক্ত বিষয়গুলো কার্যকর হতে পারে:

  • পয়েন্ট বাজেয়াপ্ত ও ওয়াকওভার: কোনো দল নির্ধারিত ম্যাচে উপস্থিত হতে না চাইলে বা টুর্নামেন্ট থেকে নাম প্রত্যাহার করলে, প্রতিপক্ষ দলকে সাধারণত ৩-০ ব্যবধানে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় বা পূর্ণ পয়েন্ট দেওয়া হয়। যাকে ‘ওয়াকওভার’ বলা হয়।
  • দল প্রতিস্থাপন: কোনো দেশ টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগে নাম প্রত্যাহার করে নিলে, আইসিসি র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী পরবর্তী যোগ্য কোনো দেশকে সেই জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষমতা রাখে।
  • আর্থিক জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা: অংশগ্রহণকারী দেশগুলো আইসিসি-র সাথে ‘পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট’ বা অংশগ্রহণ চুক্তিতে বাধ্য থাকে। এই চুক্তি ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট বোর্ড বড় ধরনের আর্থিক জরিমানা, সম্প্রচারকদের পক্ষ থেকে আইনি চ্যালেঞ্জ এবং আইসিসি-র অনুদান হ্রাসের সম্মুখীন হতে পারে।
  • ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন: যদি কোনো দেশ নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক কারণে একটি নির্দিষ্ট দেশে গিয়ে খেলতে অস্বীকার করে, তবে তারা ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য আইসিসি-র কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে পারে। আইসিসি পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
  • সাসপেনশন বা বহিষ্কার: গুরুতর ক্ষেত্রে বা বারবার নিয়ম ভঙ্গ করলে আইসিসি সংশ্লিষ্ট দেশের সদস্যপদ স্থগিত করতে পারে বা ভবিষ্যতে আইসিসি ইভেন্টগুলোতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে পারে।

যেকোনো বড় টুর্নামেন্টের ক্ষেত্রে আইসিসি-র মূল লক্ষ্য থাকে টুর্নামেন্টের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। তাই একটি দলের অনুপস্থিতিতে সাধারণত পুরো টুর্নামেন্ট বন্ধ হয় না। এখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কোনদিকে গড়ায় সেটা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুটা সময়। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে পড়েছে। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিশেষ করে ক্রীড়া উপদেষ্টা মহোদয় প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে মন্তব্য করে বিষয়টিকে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে ফেলেছেন। পক্ষান্তরে, মূল ঘটনার সূত্রপাত বিসিসিআই করলেও বর্তমানে তারা সামগ্রিক বিষয় আইসিসি’র ওপর ন্যস্ত করে নিশ্চুপ রয়েছে। যদিও ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুসারে বিষয়টি ইতোমধ্যে স্পষ্ট যে, মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পেছনে ভারত সরকারের উচ্চ মহলের ইন্ধন রয়েছে; যেটা তারা প্রকাশ্যে না এসে বিসিসিআই-এর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছে। একইভাবে বাংলাদেশ সরকারও যদি ক্রিকেট কূটনীতির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বিসিবি’র হাতে ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দূরদর্শীতার পরিচয় দিতো, তাহলে আইসিসি’র হাতে অন্তত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিষয়ক প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকতো না। এমতাবস্থায় প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ধোঁয়া তুলে বাংলাদেশকে বড় ধরনের কোনও জরিমানা বা নির্দিষ্ট মেয়াদে নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট তৈরি করছে নাতো আইসিসি? এমনটা ঘটলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় অন্ধকার গহ্বরে আটকে যেতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অগ্রগতি! অতীতে কিন্তু এরকম বেশ কিছু নজির রয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট-এ সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল শ্রীলঙ্কা এবং জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল। সুতরাং এমন গুরুতর পরিস্থিতিতে মুস্তাফিজ ইস্যুতে (যদিও এ মুহূর্তে এটা জাতীয় মর্যাদার বিষয়ে পরিণত হয়েছে) একেবারে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ পর্যায়ে না পৌঁছে আলোচনার মাধ্যমে আরো সুবিবেচনাপ্রসূত সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ ছিল বলেই আমার একান্ত বিশ্বাস। উল্লেখ্য, আইপিএল বিসিসিআই আয়োজিত ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক একটি টুর্নামেন্ট এবং টি২০ বিশ্বকাপ আইসিসি আয়োজিত একটি টুর্নামেন্ট, ভারত-শ্রীলঙ্কা এখানে যৌথ আযোজনকারী দেশ হিসেবে বিবেচিত। ফলে কোনও বোর্ড যদি তাদের নিজস্ব ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টে নির্দিষ্ট কোন খেলোযাড়কে অংশগ্রহণ করতে বাধা দেয় সেটা একন্তই তাদের বিষয়, এখানে কোনোভাবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুন্ন হচ্ছে কিনা সেটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে। এখন তাই এমন প্রশ্ন তোলা অবান্তর নয় যে, ক্রীড়া উপদেষ্টা মহোদয়সহ বিসিবি’র কর্তাব্যক্তিরা সমস্যার গভীরতা পর্যালোচনা করে পা ফেলছেন তো? আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, আবেগের আতিশয্যে হঠকারী সিদ্ধান্তে গভীর অনিশ্চয়তার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট! ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে তাই ভয় তো লাগবেই!

আপলোডকারীর তথ্য

পাবলো এসকোবারের ‘কোকেন’ জলহস্তীদের নিয়ে বিপাকে কলম্বিয়া

পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন – আবেগের আতিশয্যে হঠকারী সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার পথে এগোচ্ছে নাতো বাংলাদেশের ক্রিকেট?

আপডেট সময় ০১:৪৪:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

মুষ্টিমেয় উগ্রপন্থী ভারতীয়দের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বিসিসিআই-এর অবিবেচক সিদ্ধান্তে আইপিএল-এর অন্যতম জনপ্রিয় দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া ইস্যুতে বিস্তর জলঘোলা চলছে প্রতিবেশী দুই দেশেই। আর সেই ঘোলা পানিতেই মাছ শিকারে ব্যস্ত বাংলাদেশের স্বার্থান্বেষী এবং সুযোগসন্ধানী কিছু ব্যক্তিত্ব। বলা চলে, অনেকে নিজেদের সীমাহীন ব্যর্থতা ঢাকতে উগ্র জাতীয়তাবাদের মতো সস্তা জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে খাদের কিনারে ঠেলে দিতে চাইছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর তাদের অনেকে হয়তো ফিরে যাবেন স্ব-স্ব ভূমিকায়, কিন্তু সাময়িক আবেগের বশে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ঠেলে দিচ্ছেন কি দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে? বিষয়টি অবশ্যই গভীরভাবে চিন্তার দাবি রাখে।

পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন। বিসিসিআই-এর অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ জানিয়ে দেয়  আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় ভারতের মাটিতে খেলতে যাবে না বাংলাদেশ। তাই ভারতের পরিবর্তে বাংলাদেশের খেলাগুলো সহআয়োজক শ্রীলঙ্কা বা অন্য কোনও দেশে আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে আইপিএল-এর খেলাগুলো সম্প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার, যা অবশ্যই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। আর এরপর থেকেই চলছে বিসিবি-আইসিসি নিয়মিত ই-মেইল আদান-প্রদান। একই সময়ে ভারতের বিভিন্ন স্পন্সর ও ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে। যা বৃহৎ পরিসরে এদেশের ক্রিকেট উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বৈকি!

পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয়দলের সাবেক অধিনায়ক এবং ওপেনার তামিম ইকবাল বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলে বিসিবি’র একজন পরিচালক তাঁকে ‘ভারতের পরীক্ষিত দালাল’ বলে কদর্য ভাষায় ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন। প্রতিবাদে বিভিন্ন মহলের পাশাপাশি ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। এরইমধ্যে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিসিবি-আইসিসি’র অভ্যন্তরীণ যোগাযোগকে বিকৃত করে উপস্থাপন করেছেন বলে আইসিসি’র পক্ষ থেকে বিবৃতি প্রদানপূর্বক বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। একইভাবে বিসিবি’র পক্ষ থেকেও ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যকে বিসিবি’র আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয় বলে বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ সবদিক থেকেই এখন অনেকটা লেজে গোবরে অবস্থা!

এমন পরিস্থিতিতে গত ১৩ জানুয়ারি, ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয় আইসিসি-বিসিবি ভিডিও কনফারেন্স। যেখানে আইসিসি’র জোর অনুরোধ সত্ত্বেও বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে নিজেদের অনড় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলেও জানা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনও পর্যন্ত পেন্ডুলামের মতো দুলছে বা বলা চলে বিশাল অনিশ্চয়তার গহ্বরে আটকে পড়েছে!

এবার চলমান প্রেক্ষাপট একটু বাস্তবতার নিরীখে বিবেচনা করা যাক। অসংখ্য আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল আইসিসি’তে ভারতের প্রভাব-প্রতিপত্তি-আধিপত্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন বলেই আমার ব্যক্তিগত ধারণা। অন্তত তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই বিষয়টিকেই প্রতিভাত করে তোলে। আইসিসি’র বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ একদিকে যেমন মাত্র কিছুদিন আগেও ছিলেন বিসিসিআই সচিব, তেমনি তিনি ভারতের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র পুত্র। এদিকে ৫ আগস্ট উত্তর পরিস্থিতিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক ইতিহাসের ভয়াবহ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলাই শ্রেয়।

এমন প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা’র প্রশ্ন তুলে ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে না চাওয়ার দাবি আইসিসি’র টেবিলে কতটা শক্ত ভিত্তি পাবে সে প্রশ্ন তাই অমূলক নয়! এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, জয় শাহ’র নেতৃত্বাধীন আইসিসি যদি বাংলাদেশের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের খেলাগুলো অন্য কোনও দেশে সরিয়ে নেয়; তাহলে সেটা প্রত্যক্ষভাবে তাঁর পিতা অর্থাৎ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংক্রান্ত সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে। সন্তান হয়ে তিনি নিশ্চয় পিতাকে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে চাইবেন না! অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধীদের হাতে এমন একটা মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিতে তিনি একাধিকবার ভাববেন বলেই আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাস।

তাহলে কী হবে বাংলাদেশের টি২০ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের পরিণতি? একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই বিষয়টি সম্পর্কে একটু ধারণা পাওয়া যেতে পারে। টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হবে ৭ ফেব্রুয়ারি এবং সেদিনই বাংলাদেশের প্রথম খেলা। সময়ের হিসেবে হাতে আছে মাত্র ২৪-২৫ দিন। বাংলাদেশ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে আইসিসিতে অভিযোগ জানায় আজ থেকে প্রায় সপ্তাহখানেক আগে অর্থাৎ হাতে প্রায় একমাস সময় রেখে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে আইসিসি থেকে সুনির্দিষ্ট কোনও দিক-নির্দেশনা বা অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। এরই মধ্যে বাংলাদেশি এবং আইসিসি’র এলিট প্যানেলভুক্ত আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা শহীদ ইবনে সৈকত ভারতের মাটিতে চলমান ভারত-নিউজিল্যান্ড ওয়ান ডে সিরিজে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করছেন, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এমতাবস্থায় আইসিসি’র ধীরে চলো নীতি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বিরাট অশনি সংকেত বলেই আমার ব্যক্তিগত ধারণা। ভারতের মাটিতে একজন বাংলাদেশি আম্পায়ারের আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা একদিকে যেমন নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্নকে উড়িয়ে দিতে আইসিসি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে; অন্যদিকে লজিস্টিক সাপোর্ট এবং অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দলগুলোর মতামতের প্রসঙ্গ তুলে স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে বিশ্বকাপের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টের খেলা অন্য কোনও দেশে স্থানান্তর সম্ভব নয় বলে প্রতিষ্ঠিত করতে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালাতে পারে। অর্থাৎ ভারতের মাটিতেই বাংলাদেশের খেলাগুলো রেখে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে বল বাংলাদেশের কোর্টেই ঠেলে দিতে পারে আইসিসি। এমনটা হলে কী করবে বাংলাদেশ?

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। এখান থেকে এখন ইউটার্ন কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা একদিকে যেমন বিসিবি, ক্রীড়া উপদেষ্টাসহ বাংলাদেশ সরকারের নীতিতে অটল থাকার পরীক্ষা, বিপরীতে বাংলাদেশেরও একদল উগ্র ভারতবিরোধী জনগোষ্ঠীর আস্থা অটুট রাখার অগ্নি পরীক্ষা। এরইমধ্যে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টায় লিপ্ত পাকিস্তান। দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে জানা যায়, আইসিসি বাংলাদেশের দাবি মেনে না নিলে বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করতে পারে তারা। এ নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেলেও এখন শোনা যাচ্ছে এ ধরনের কোনও পরিকল্পনা নেই পিসিবি’র। এমন তথৈবচ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্তে অটল থাকে তাহলে কী ঘটতে পারে অনাগত ভবিষ্যতে? চলুন এ সংক্রান্ত আইসিসি’র নিয়মাবলী সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়া যাক-

টি-২০ বিশ্বকাপ-২০২৬ বা আইসিসি আয়োজিত কোনও বৈশ্বিক আসরে কোনো দল বা দেশ অংশ নিতে না চাইলে বা ভেন্যু নিয়ে আপত্তি জানালে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর নিয়ম অনুযায়ী তাদের ম্যাচগুলো ‘ফোরফিট’ (forfeit) বা ছেড়ে দিতে হতে পারে। তবে দলটির আপত্তির কারণ (যেমন নিরাপত্তা) গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয় এবং আইসিসি বিকল্প ভেন্যু (যেমন শ্রীলঙ্কা) নির্ধারণ করতে পারে, যা অতীতে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। যদি আইসিসি ভেন্যু পরিবর্তন না করে এবং সংশ্লিষ্ট দেশ বা দলটি আপত্তি জানাতে থাকে; তবে তাদের পয়েন্টও বাতিল হতে পারে। ফলে সেই দল টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়তে পারে। যা টুর্নামেন্টের সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলে।

 

এতদসংক্রান্ত কতিপয় নিয়ম ও পদ্ধতি:

  1. আইসিসি-র কাছে আবেদন: কোনো দল যদি ভেন্যু নিয়ে সমস্যায় পড়ে, তবে তারা আইসিসি-এর কাছে লিখিতভাবে আবেদন জানাতে পারে এবং বিকল্প ভেন্যুর জন্য অনুরোধ করতে পারে, যা নিরাপত্তা বা অন্যান্য কারণেও হতে পারে।
  2. আইসিসির সিদ্ধান্ত: আইসিসি -এর কাছে এই ধরনের আবেদন এলে তারা পরিস্থিতি বিবেচনা করে। যদি ভেন্যু পরিবর্তন করা হয়, তবে খেলা সেই নতুন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয় (যেমনটি পাকিস্তান ক্রিকেট দল বা পিসিবি-এর ক্ষেত্রে অতীতে ঘটেছিল)।
  3. ফোরফিট বা Points deduction: যদি আইসিসি আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং দল অংশগ্রহণ না করে, তবে সেই দল টুর্নামেন্ট থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং তাদের ম্যাচগুলো ‘ফোরফিট’ হিসেবে গণ্য হয়, যা তাদের পয়েন্ট টেবিলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পূর্ববর্তী উদাহরণ:

  • ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে’তে খেলতে না যাওয়ায় এবং নিউজিল্যান্ড নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে কেনিয়া সফর বাতিল করার পর তারা পয়েন্ট হারায়।
  • জিম্বাবুয়েও ভিসা সংক্রান্ত সমস্যার কারণে ২০০৯ টি২০ বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল।
  • নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে অস্ট্রেলিয়া অনূর্দ্ধ ১৯ দল ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনূর্দ্ধ ১৯ বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে।

সুতরাং, নিয়ম অনুযায়ী, দলগুলি ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য আবেদন করতে পারে। কিন্তু আইসিসি যদি তাদের দাবি না মানে, তবে তাদের টুর্নামেন্ট ছেড়ে দিতে হতে পারে এবং নিয়ম অনুযায়ী পয়েন্টও হারাতে হয়। আর জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ অনুসারে, আইসিসি নাকি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিষয়ক সিদ্ধান্ত জানাতে ২১ জানুয়ারি ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছে। আর বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে র‌্যাঙ্কিং-এ তুলনামূলক ভাল অবস্থানে থাকা স্কটল্যান্ডের নাম উঠে এসেছে এএফপি’র সংবাদে। যদিও আইসিসি কর্তৃক আলটিমেটামের বিষয়টি ইতোমধ্যে অস্বীকার করেছে বিসিবি ।

আইসিসি আয়োজিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কোনো দেশ বা দল অংশগ্রহণ করতে না চাইলে আইসিসি-র  নিয়ম ও নীতি অনুযায়ী নিম্নোক্ত বিষয়গুলো কার্যকর হতে পারে:

  • পয়েন্ট বাজেয়াপ্ত ও ওয়াকওভার: কোনো দল নির্ধারিত ম্যাচে উপস্থিত হতে না চাইলে বা টুর্নামেন্ট থেকে নাম প্রত্যাহার করলে, প্রতিপক্ষ দলকে সাধারণত ৩-০ ব্যবধানে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় বা পূর্ণ পয়েন্ট দেওয়া হয়। যাকে ‘ওয়াকওভার’ বলা হয়।
  • দল প্রতিস্থাপন: কোনো দেশ টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগে নাম প্রত্যাহার করে নিলে, আইসিসি র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী পরবর্তী যোগ্য কোনো দেশকে সেই জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষমতা রাখে।
  • আর্থিক জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা: অংশগ্রহণকারী দেশগুলো আইসিসি-র সাথে ‘পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট’ বা অংশগ্রহণ চুক্তিতে বাধ্য থাকে। এই চুক্তি ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট বোর্ড বড় ধরনের আর্থিক জরিমানা, সম্প্রচারকদের পক্ষ থেকে আইনি চ্যালেঞ্জ এবং আইসিসি-র অনুদান হ্রাসের সম্মুখীন হতে পারে।
  • ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন: যদি কোনো দেশ নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক কারণে একটি নির্দিষ্ট দেশে গিয়ে খেলতে অস্বীকার করে, তবে তারা ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য আইসিসি-র কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে পারে। আইসিসি পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
  • সাসপেনশন বা বহিষ্কার: গুরুতর ক্ষেত্রে বা বারবার নিয়ম ভঙ্গ করলে আইসিসি সংশ্লিষ্ট দেশের সদস্যপদ স্থগিত করতে পারে বা ভবিষ্যতে আইসিসি ইভেন্টগুলোতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে পারে।

যেকোনো বড় টুর্নামেন্টের ক্ষেত্রে আইসিসি-র মূল লক্ষ্য থাকে টুর্নামেন্টের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। তাই একটি দলের অনুপস্থিতিতে সাধারণত পুরো টুর্নামেন্ট বন্ধ হয় না। এখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কোনদিকে গড়ায় সেটা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুটা সময়। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে পড়েছে। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিশেষ করে ক্রীড়া উপদেষ্টা মহোদয় প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে মন্তব্য করে বিষয়টিকে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে ফেলেছেন। পক্ষান্তরে, মূল ঘটনার সূত্রপাত বিসিসিআই করলেও বর্তমানে তারা সামগ্রিক বিষয় আইসিসি’র ওপর ন্যস্ত করে নিশ্চুপ রয়েছে। যদিও ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুসারে বিষয়টি ইতোমধ্যে স্পষ্ট যে, মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পেছনে ভারত সরকারের উচ্চ মহলের ইন্ধন রয়েছে; যেটা তারা প্রকাশ্যে না এসে বিসিসিআই-এর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছে। একইভাবে বাংলাদেশ সরকারও যদি ক্রিকেট কূটনীতির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে বিসিবি’র হাতে ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দূরদর্শীতার পরিচয় দিতো, তাহলে আইসিসি’র হাতে অন্তত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিষয়ক প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকতো না। এমতাবস্থায় প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ধোঁয়া তুলে বাংলাদেশকে বড় ধরনের কোনও জরিমানা বা নির্দিষ্ট মেয়াদে নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট তৈরি করছে নাতো আইসিসি? এমনটা ঘটলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় অন্ধকার গহ্বরে আটকে যেতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অগ্রগতি! অতীতে কিন্তু এরকম বেশ কিছু নজির রয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট-এ সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল শ্রীলঙ্কা এবং জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল। সুতরাং এমন গুরুতর পরিস্থিতিতে মুস্তাফিজ ইস্যুতে (যদিও এ মুহূর্তে এটা জাতীয় মর্যাদার বিষয়ে পরিণত হয়েছে) একেবারে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ পর্যায়ে না পৌঁছে আলোচনার মাধ্যমে আরো সুবিবেচনাপ্রসূত সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ ছিল বলেই আমার একান্ত বিশ্বাস। উল্লেখ্য, আইপিএল বিসিসিআই আয়োজিত ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক একটি টুর্নামেন্ট এবং টি২০ বিশ্বকাপ আইসিসি আয়োজিত একটি টুর্নামেন্ট, ভারত-শ্রীলঙ্কা এখানে যৌথ আযোজনকারী দেশ হিসেবে বিবেচিত। ফলে কোনও বোর্ড যদি তাদের নিজস্ব ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্টে নির্দিষ্ট কোন খেলোযাড়কে অংশগ্রহণ করতে বাধা দেয় সেটা একন্তই তাদের বিষয়, এখানে কোনোভাবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুন্ন হচ্ছে কিনা সেটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে। এখন তাই এমন প্রশ্ন তোলা অবান্তর নয় যে, ক্রীড়া উপদেষ্টা মহোদয়সহ বিসিবি’র কর্তাব্যক্তিরা সমস্যার গভীরতা পর্যালোচনা করে পা ফেলছেন তো? আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, আবেগের আতিশয্যে হঠকারী সিদ্ধান্তে গভীর অনিশ্চয়তার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট! ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে তাই ভয় তো লাগবেই!