বাংলাদেশের নদীরক্ষা আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠস্বর, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও নদীপ্রেমী লেখক মুহাম্মদ মনির হোসেন-এর নদীবিষয়ক নতুন গ্রন্থ ‘পার্বত্য অঞ্চলের নদী’-এর মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব আজ বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। চ্যানেল আই-এর মুস্তফা মনোয়ার স্টুডিও–৪ এ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে নদী, পরিবেশ, গবেষণা ও গণমাধ্যম অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়। আয়োজনের সভাপতিত্ব করেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু।
স্বভাবসুলভ নদীপ্রাণ শুভেচ্ছা দিয়ে ‘পার্বত্য অঞ্চলের নদী’ বইটির লেখক মুহাম্মদ মনির হোসেন বক্তব্যের শুরুতেই নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, বাংলাদেশের নদীগুলোর আলোচনায় মূলত গঙ্গা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র বেসিনের সমতলের নদীগুলো নিয়ে কথা হয়। অথচ পাহাড়ি নদী শঙ্খ, কাসালং, মাইনি, মাতামুহুরি, নাফ এসব নদীগুলোর জন্ম ও প্রবাহ সম্পূর্ণ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

তাই নদীগুলো নিয়ে বিস্তর গবেষণার শুরুটা এই বইয়ের মাধ্যমে হলো জানিয়ে নদী নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে চলা মনির বলেন, ‘বেসিন ভিত্তিক নদী নিয়ে গবেষণা, রক্ষার চিন্তা হলেও এই বেসিনের বাইরে আমাদের পাহাড়ি নদীগুলো বাঁচাতে হলে দরকার বিস্তারিত গবেষণা, এসবকে সংযোজন করে আলোচনা করা। পাহাড়ি নদীগুলো নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা করতে হবে, এসব নদীর বৈশিষ্ট্য, সৌন্দর্য্য এবং এদের ঘিরে বেঁচে থাকা সম্প্রদায়গুলোর জীবনধারা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ভরা। পাহাড়ি নদী নিয়ে আগামীতে বিস্তারিত গবেষণার পথ সুগম করতেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।’

সদ্য মোড়ক উন্মোচন করা বইটির বিষয়ে প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু বলেন,‘এ ধরনের একটি বই, রেফারেন্স বুক হিসেবে কাজ করবে এটা। আর এরপরে আমি আশা করব যে মনির আরও বিস্তারিত আরও তথ্য দিয়ে এবং পরিসংখ্যান দিয়ে আরও বড় একটি বই বের করবে, যেটা আমাদের সবার জন্য কাজে লাগবে। এটা তো কাজে লাগবেই, পাশাপাশি সামনে আরও ভালো যদি একটি বই হয়, যেখানে তথ্য-উপাত্ত অনেক বেশি থাকবে, তাতে আমার মনে হয় আমাদের নদী নিয়ে কাজ করতে সুবিধা হবে। আর নদী নিয়ে যেহেতু মনির অনেক বছর ধরে কাজ করছে এবং সারা দেশব্যাপী ঘুরেছে, অনেক তথ্য কিন্তু ওর কাছে আছে এবং অনেক রেকর্ডও আছে। আমি যেটুকু কাজ করার সুযোগ পেয়েছি মনিরের সাথে, একটা জিনিস দেখেছি—ও কিন্তু খুব ডিটেইলে খুব কষ্ট করে কিন্তু কাজগুলো গুছিয়ে করে। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য অঞ্চলের নদী নিয়ে মনির এর বই।’
পাহাড়ি নদী রক্ষায় পাহাড়ের প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষা করার জোর তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের এই সবুজ পাহাড়গুলো না থাকতো তাহলে কিন্তু আমাদের এই নদীগুলো বেঁচে থাকতো না। পাহাড় এবং নদী একটির সঙ্গে আরেকটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পাহাড়, ছড়া এবং গাছ অবশ্যই রক্ষা করতে হবে, আর তাহলেই পার্বত্য নদীগুলোর প্রবাহ থাকবে, নদীগুলো বেঁচে থাকবে।’ পাহাড়-সমতলের নদীগুলোকে রক্ষায় সচেতনতার পাশাপাশি দখন-দূষণ প্রতিরোধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডঃ মোঃ আলাউদ্দিন হোসেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ডঃ মোঃ সোলাইমান হায়দার, নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞ মোঃ মনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির এবং বাংলা একাডেমির সহকারী পরিচালক মোঃ আজিজুল হক। অনুষ্ঠানের প্রারম্ভিক আলোচক ছিলেন প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব গাজীপুর শাখার সভাপতি অধ্যাপক অসীম বিভাকর।

অনুষ্ঠানে আলোচকগণ আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের নদী’ গ্রন্থটি পাহাড়ি নদ-নদী নিয়ে গবেষণা, নীতি-পরিকল্পনা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে ভূমিকা রাখবে এবং নদীরক্ষা আন্দোলনে নতুন অনুপ্রেরণা যোগাবে। বাংলার নদী কেবল ভৌগোলিক সত্তা নয়—এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবন ও জীবিকার চিরন্তন ধারক। পাহাড় থেকে সমতল—সব ভূপ্রকৃতিতে নদীই পরিবেশগত ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান ভিত্তি। শতবর্ষের ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় পাহাড়ি নদ-নদীর অন্তর্ভুক্তিকে তাঁরা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন আলোচকগণ।

‘পার্বত্য অঞ্চলের নদী’ গ্রন্থে লেখক বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের নদ-নদীগুলোর উৎস, প্রবাহ, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, পরিবেশগত গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ সংকট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বইটিতে চেঙ্গি, কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, নাফসহ পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর দীর্ঘকালীন প্রবাহ-ধারা, পাহাড়ি বন ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ক এবং মানবজীবন ও সংস্কৃতিতে নদীর প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।
মুহাম্মদ মনির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে নদী গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও লেখালেখির মাধ্যমে নদী সংরক্ষণ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। এর আগে তিনি দেশ-বিদেশে শতাধিক নদী পরিদর্শন করেছেন এবং নদীনাম, নদীর সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে ‘নদী ও জলে ভ্রমণ’ (২০২১) এবং ‘গাজীপুরের নদী’ (২০২৩)।
জোবায়ের আহমেদ 




















