বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. মোঃ মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেছেন, অন্যান্য রিভার সিস্টেম নিয়ে অনেক কাজ হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের রিভার সিস্টেম নিয়ে তেমন কাজ হয়নি। পার্বত্য অঞ্চলের নদীগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটা জিনিসের একটা জন্মস্থান থাকে। যেটাকে আমরা বলি আঁতুড়ঘর বা জরায়ু। নদীর জন্মস্থান হচ্ছে পাহাড়। আমাদের এই নদীগুলোর মূল উৎপত্তিস্থল বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এই তিনটি পার্বত্য এলাকা। এই তিনটি পার্বত্য এলাকার নদীগুলো বাঁচিয়ে আমাদের বাংলাদেশের নদী সম্পর্কে চিন্তা করতে হয়ে। সেদিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমাদের এই পার্বত্য অঞ্চলের নদীসমূহ। পার্বত্য নদী রক্ষা সম্মিলন ২০২৫-এর দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) খাগড়াছড়ি টাউন হল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় এই আলোচনা সভা।
ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, আমাদের বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সভ্যতা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষ্টি সবকিছুই নদীকেন্দ্রিক। একটা নদী সংরক্ষণ করা মানে শুধু নিছক একটা নদী রক্ষা নয়, আমাদের সার্বিক জীবনের যা কিছু হয়েছে সবকিছুই সংরক্ষণ করা। সেদিক দিয়ে আজকের এই প্রোগ্রাম অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী বাঁচাতে না পারলে বাংলাদেশও বাঁচানো সম্ভব নয়। অর্থাৎ নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় অর্ধশত বছর আগে। ঠিক ঐ অর্থে নদীমাতৃক বাংলাদেশ হিসেবে আমাদের নদীকে রক্ষায় যতটুকু সতর্ক থাকা উচিত ছিল সরকারিভাবে, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট মহলে ততটুকু ছিল না।
আরও পড়ুন: খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে “পার্বত্য নদী রক্ষা সম্মিলন ২০২৫”
নদী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি উল্লেখ করে ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, আমরা প্রায় ২৫ বছর ধরে নদী নিয়ে কাজ করছি। প্রথম প্রথম নদী নিয়ে কাজ করায় অনেকে বিভিন্নভাবে আমাদের উপহাস করতো বিভিন্নভাবে। কারণ এখানে অর্থ নাই, ভোগবিলাসের উপাদান নাই। নদী নিয়ে শুধু দেশপ্রেমিক ও সচেতন ব্যক্তিরাই কাজ করে। নদী নিয়ে কাজ করলে বিভিন্ন উপহাসের পাশাপাশি হুমকি আসে। নদী নিয়ে কাজ করে হুমকি বা মামলার শিকার হয়নি এমন একজনও নেই। এমনকি মৃত্যুর হুমকি পর্যন্তও আসে। যার বড় শিকার আমাদের উপদেষ্টা মহোদয়। এজন্য উনি অনেক চরাই-উৎরায়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। নদী এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে যেয়ে এবং একই পরিস্থিতির শিকার আমরাও।

তিনি আরও বলেন, আমরা সম্প্রতি বাংলাদেশের নদীর সংখ্যা নির্ধারণ করেছি। গত পহেলা বৈশাখ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সারা বাংলাদেশে একটা জরিপ চালানো হয় যেখানে বলা হয়েছে নদীর সংখ্যা ১৪১৫টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলা অর্থাৎ এই পাঁচটা জেলা তথা বৃহত্তর চট্টগ্রামের নদী সংখ্যা আমরা নির্ণয় করেছি। এর মধ্যে চট্টগ্রামে নদীর সংখ্যা ১৪টি, কক্সবাজারে নদীর সংখ্যা ৭টি, বান্দরবানে নদীর সংখ্যা ৯টি, রাঙামাটিতে নদীর সংখ্যা ১০টি এবং খাগড়াছড়িতে নদীর সংখ্যা ৮টি। সবমিলিয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে নদীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮টি। এর মধ্যে কিছু কিছু নদী যেমন হালদা, খাগড়াছড়িতে উৎপত্তি হয়ে চট্টগ্রামে গিয়েছে। সুতরাং এটা দুই জায়গাতেই গণনা হয়েছে। একইভাবে মাইনি খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি দুই জায়গাতেই গণনা হয়েছে। এভাবে টোটাল নদীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫টি। এছাড়াও আমাদের নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বলেছেন, তিনটি প্রজেক্ট তারা নিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পাহাড়ি এলাকার নদী সংখ্যা নির্ধারণ এবং ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন। আশাকরি এই কাজটার ফলাফল আসলে আমরা বাংলাদেশের নদী রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।
আরও পড়ুন: পার্বত্য অঞ্চলের নদীগুলো রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি: উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
সাঙ্গু নদী নিয়ে মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, এটা পর্যটনের জন্য, আমাদের এনভায়রনমেন্টের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। যারা এখনও সাঙ্গু নদী দেখেননি, আমি মনেকরি তাদের এখনও বাংলাদেশ দেখা বাকি রয়েছে। একইসাথে মাছের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মাছের এমন কিছু প্রজাতি রয়েছে যা বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। বিশাল বিশাল পাথরের পাহাড়ের পাশ দিয়েই এই নদীটা প্রবাহিত হয়েছে, যা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। একইভাবে মাইনি, কাসালং, নাইক্ষ্যং-এই তিনটি নদীর মিলিত স্রোতধারা কাপ্তাই লেক সিস্টেম ডেভলপ করেছে। এই তিনটি নদী এবং কর্ণফুলি নদীর ক্যারেক্টার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সুপরিকল্পিত উপায়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করে নদী মাতৃক বাংলাদেশ রক্ষা করতে হবে। তাহলেই সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।

সম্মিলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

সম্মিলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন , বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনির হোসেন।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মোঃ আনোয়ার সাদাত এর সভাপতিত্বে সম্মিলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) মহাপরিচালক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এস এম আবু হোরায়রা, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান।

পার্বত্য নদী রক্ষা সম্মিলনের আয়োজন করেছে, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন, পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো), নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল।
আরও পড়ুন: সফলভাবে সম্পন্ন হলো “পার্বত্য নদী রক্ষা সম্মিলন ২০২৫” এর প্রথম দিনের কার্যক্রম
নদী রক্ষা সম্মিলনের সহযোগিতায় ছিল, হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি, গার্ডেনিং বাংলাদেশ, হালদা নদী রক্ষা কমিটি, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, গ্রীন ভয়েস, ব্রাইর্টাস, ওয়েবি ফাউন্ডেশন। সম্মিলনের মিডিয়া পার্টনার হিসেব ছিল চ্যানেল আই ও প্রকৃতিবার্তা (prokritibarta.com)।
জোবায়ের আহমেদ 




















