সংবাদ শিরোনাম ::
Logo চলতি সপ্তাহে দেশজুড়ে গরমের অনুভূতি কিছুটা বাড়তে পারে Logo মৎস্য-জীববৈচিত্র্য রক্ষায় হালদা অববাহিকার মানিকছড়ি অংশে তামাক চাষ বন্ধ Logo মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য ও বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ: আইন উপদেষ্টা Logo আবারও ইমরান খানের অসুস্থতার গুঞ্জন, বিরোধী দল ও তারকা ক্রিকেটারদের চাপে সরকার Logo টানা পাঁচ দিনের ছুটির পর আগামীকাল খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান Logo রামপুরায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ৪ মার্চ Logo হিন্দুস্তান টাইমস: তারেক সরকারের শপথে মোদির আসার সম্ভাবনা নেই Logo এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের : তারেক রহমান Logo শীত শেষে কিভাবে গরম কাপড় গুছিয়ে রাখবেন Logo সুন্দরবন দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির দাবি

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল

  • জয়ন্ত সরকার
  • আপডেট সময় ০১:৫৫:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল ২০২৫
  • 451

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রতিটি মৌসুমেই বিভিন্ন ফলের বাহার আমাদের রসনা বিলাসের পাশাপাশি নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। তেমনি ঘ্রাণ, স্বাদ এবং পুষ্টিতে গ্রীষ্মকালীন ফলসমূহ অনন্য। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ দুইমাস গ্রীষ্মকাল। এসময়ের ফলসমূহের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ, বাঙ্গি, জাম, বেল, তাল, আনারস, জামরুল, সফেদা, গাব, পেঁপে, কামরাঙ্গা, লটকন, ডেউয়া, ফলসা, ড্রাগন ইত্যাদি। গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষ ফলাহারে হয় পরিতৃপ্ত। এসব ফল খেয়ে জীবন বাঁচায় পশু-পাখিরাও, যা জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

আম: গ্রীষ্মকালীন ফলসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মোহনীয় নাম আম, যা সংস্কৃত ‘আম্র’ শব্দটি থেকে আগত। ইংরেজিতে Mango, বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica। নরম খোঁসা দ্বারা আবৃত রসালো, সুস্বাদু ও ঘ্রাণে অতুলনীয় আম গুণেও অনন্য। আমে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি, এনজাইম, শর্করা, ক্যারোটিন, ফাইবার পিকটিন, খনিজ, ক্যালরি, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যালিক এসিড, টারটারিক এসিড, সাইট্রিক এসিড এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা মানবদেহের জটিল রোগসমূহ প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ফলের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত করে আম থেকে চাটনি, আচার, আমসত্ত্ব, মোরব্বা, জ্যাম, জেলি ও জুস তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর আম চাষের জন্য বিখ্যাত। পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ প্রজাতির আম আছে। বাংলাদেশে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ক্ষীরসাপাতি, ফজলি, ল্যাংড়া, আশ্বিনা, হাঁড়িভাঙ্গাসহ আরো বাহারি নাম, বর্ণ, ঘ্রাণ ও স্বাদের আম পাওয়া যায়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

কাঁঠাল: বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল পর্তুগিজ ‘জ্যাকা’ শব্দটি থেকে আগত। গ্রীষ্মকালীন জনপ্রিয় ফলসমূহের মধ্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজি নাম Jackfruit, বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus। রুচি ও শক্তিবর্ধক এই ফলটিতে রয়েছে শর্করা, আমিষ, ক্যালরি, ক্যারোটিন, খনিজ লবণ, ভিটামিন এ, সি, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, থায়ামিন, রিবোফ্লোবিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, জিঙ্ক এবং নায়াসিনসহ বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদান যা মানবদেহের অনেক জটিল রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কাঁঠাল সাধারণত জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে পাকে যা অত্যন্ত রসালো, সুস্বাদু ও আঁশযুক্ত। বিশালাকার এই ফলটি ওজনে ৫৫ কেজি, দৈর্ঘ্যে ৩৫ ইঞ্চি এবং ব্যাসে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। বাইরের অংশ পুরু এবং কন্টকাকীর্ণ, ভেতরের দিকে একটি কাণ্ড ঘিরে অসংখ্য কোয়া/কোষ থাকে। প্রচুর ভেষজ গুণসম্পন্ন কাঁঠাল কাঁচা ও পাকা সব অবস্থাতেই খাওয়া যায়। কাঁচা কাঁঠালের এঁচোড় তরকারি হিসেবে বেশ সুস্বাদু এবং জনপ্রিয়। কাঁঠালের বীজ ভেজে ও তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। এর খোঁসা ও কাণ্ড বিভিন্ন প্রাণি ভক্ষণ করে থাকে। কম বেশি সারা দেশে পাওয়া গেলেও গাজীপুর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, ময়মনসিংহ ও নরসিংদী এলাকায় কাঁঠাল বেশি জন্মে।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

তরমুজ: গ্রীষ্মকালীন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সুস্বাদু একটি ফল তরমুজ। ইংরেজিতে Water Melon। বৈজ্ঞানিক নাম Citrullus lanatus। ফলের জগতে বৃহৎ আকৃতির ফল তরমুজে আছে প্রায় ৯০% পানি। তাই ক্লান্তি দূর করতে তরমুজের জুড়ি নেই। তরমুজে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি ও সি, আয়রন, লাইকোপিন, সিট্রুলিন, বিটা ক্যারোটিন, পটাশিয়াম, অ্যামাইনো এসিড, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট এবং সামান্য ক্যালরি। যা মানবদেহের অনেক জটিল রোগের মহৌষধ। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই তরমুজ চাষ হয়। তরমুজের ভেতরের তাপমাত্রা জীবাণু বৃদ্ধিতে সাহায্য করে বলে তরমুজ কেটে বেশিক্ষণ বাইরে ফেলে রাখা ঠিক নয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

লিচু: গ্রীষ্মকালীন অত্যন্ত জনপ্রিয় আরেকটি ফলের নাম লিচু। ইংরেজি নাম Lychee, বৈজ্ঞানিক নাম Litchi chinensis। মিষ্টি এবং রসালো এই ফলটি শুধু স্বাদে নয়, পুষ্টিতেও ভরপুর। লিচুতে আছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, ক্যালরি, শ্বেতসার, ভিটামিন, শর্করা, আমিষ, খনিজ লবণ এবং সামান্য স্নেহ থাকে যা মানবদেহের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে যথেষ্ট কার্যকরী। ফলটির বাইরের অংশ অমসৃণ ও লালচে গোলাপি বর্ণের খোঁসা দ্বারা আবৃত থাকে যা খাওয়া যায় না। ভেতরে থাকে সুমিষ্ট রসালো শাঁস। শাঁসটির ভিতরে থাকে একটি গাঢ় বাদামি রঙের বীজ যা খাওয়া যায় না। রাজশাহী, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম জেলা লিচু উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে লিচু থেকে তৈরি জ্যামও বেশ জনপ্রিয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

জাম: গ্রীষ্মকালীন আরেকটি সুপরিচিত ফল জাম। ইংরেজিতে Black plum, বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium cumini। ১ থেকে ২.৫ সেন্টিমিটার লম্বা ফলটি প্রায় আয়তাকার। দেখতে কালচে বর্ণের, অম্লধর্মী এবং কিছুটা কষভাব এই ফলটিতে রয়েছে প্রচুর আয়রন, ভিটামিন সি, বিশেষ এনজাইম, অক্সালিক অ্যাসিড এবং সামান্য পরিমাণে শর্করা। শুধু এর নরম মাংসল অংশটাই নয়, জামের ফুল, ফল, পাতা, ছাল, শেকড় সব কিছুই বনৌষধিতে ব্যবহৃত হয়। জামের বীজে রয়েছে জাম্বলিন নামে গ্লুকোসাইট যা রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, পাবনা, দিনাজপুর অঞ্চলে সাধারণত জাম বেশি পাওয়া যায়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

বাঙ্গি: গ্রীষ্মকালীন আরেকটি উপকারী ফল হচ্ছে বাঙ্গি। ইংরেজি নাম Melon, বৈজ্ঞানিক নাম Cucumis melo। রসালো ফল হিসেবে এই ফলের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। দেশের প্রায় সব জেলায় বাঙ্গির চাষ হলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বেশি হয়ে থাকে। ভিটামিন এ, সি, ফোলেট, শর্করা, পটাশিয়াম ও সামান্য পরিমাণে প্রোটিন ও ক্যারোটিনসমৃদ্ধ এই ফলটি আকারে বেশ বড় হয়। কাঁচা ফল সবুজ, পাকলে হলুদ রঙের হয় এবং ফেটে যায়। ফলের বাইরের দিকটা মিষ্টি কুমড়ার মত হালকা ডোরা কাটা খাঁজযুক্ত। খেতে তেমন মিষ্টি নয়, বেলে বেলে ধরনের, ভেতরটা ফাঁপা থাকে। দেশে প্রধানত দুই জাতের বাঙ্গি দেখা যায়, বেলে ও এঁটেল বাঙ্গি। বেলে বাঙ্গির শাঁস নরম। খোসা খুব পাতলা, শাঁস খেতে কিছুটা বালু বালু লাগে। তেমন মিষ্টি নয়। অন্যদিকে, এঁটেল বাঙ্গির শাঁস কচকচে, একটু শক্ত এবং তুলনামূলকভাবে মিষ্টি। এর পুরোটাই জলীয় অংশে ভরপুর।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

বেল: গ্রীষ্মকালীন অন্যতম জনপ্রিয় ফলের নাম বেল। ইংরেজিতে Wood apple, বৈজ্ঞানিক নাম Aegle marmelos। সারা বছর পাওয়া গেলেও গরমকালে এই ফলের চাহিদা বেশি। বেলে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন এ, বি, সি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পটাশিয়ামসহ প্রচুর খনিজ লবণ আছে। ফলটি বড়, গোলাকার, শক্ত খোসা বিশিষ্ট। ফলের ভিতরে শাঁস ৮-১৫টি খণ্ডে বিভক্ত। প্রতিটি খণ্ডে চটচটে আঠার সাথে অনেক বীজ লেগে থাকে। কাঁচা ফল সবুজ রঙের, পাকলে হলুদ হয়ে যায়। ভিতরের শাঁসের রঙ হয়ে যায় কমলা বা হলুদ। পাকা বেল থেকে সুগন্ধ বের হয়। পাকা বেল গাছ থেকে ঝরে পড়ে।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

তাল: গ্রীষ্মকালীন আরেকটি ফল তাল। ইংরেজি নাম Palmyra palm, বৈজ্ঞানিক নাম Borassus flabellifer। রসালো, সুস্বাদু ও ঠান্ডা ফল তাল ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সের আধার। তাল দিয়ে বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার যেমন তালের ক্বাথ, জুস, বড়া, কেক, পিঠা ইত্যাদি তৈরি করে খাওয়া যায়। তালের ফল এবং বীজ দুটিই খাওয়া যায়। কচি তালের বীজের মধ্যে থাকে জলে ভরা শাঁস। আর পাকা তালের বীজ মাটিতে রেখে দিলে তার মধ্যে শাঁস তৈরি হয় যা খেতে সুস্বাদু। তাল গাছের কাণ্ড থেকে রস সংগ্রহ হয় এবং তা থেকে গুড়, পাটালি, মিছরি ইত্যাদি তৈরি হয়। তালে রয়েছে ভিটামিন এ, বি ও সি, জিংক, পটাশিয়াম, আয়রনক্যালসিয়াম সহ আরো অনেক খনিজ উপাদান। এর সাথে আরো আছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদান।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

আনারস: পর্তুগিজ শব্দ আনানাস থেকে আগত গ্রীষ্মকালীন অন্যতম জনপ্রিয় ফল আনারস। ইংরেজিতে Pineapple, বৈজ্ঞানিক নাম Ananas comosus। রসালো ও সুস্বাদু ফল আনারসে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম ব্রোমেলেইন, ভিটামিন এ, বি-১, সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ, ক্যালরি, পেকটিন, ফলেট, থায়ামিন, ডায়েটারি ফাইবার, পাইরিওফিন ও রিবোফ্লোবিন যা মানবদেহের জন্য অপরিহার্য। দেহের পুষ্টি সাধন এবং দেহকে সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত রাখার জন্য এটি একটি অতুলনীয় এবং কার্যকর ফল। সিলেট, মৌলভীবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও নরসিংদী জেলায় এই ফল বেশি হয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

জামরুল: গ্রীষ্মকালীন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল জামরুল। ইংরেজি নাম Champoo, বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium samarangense। রসালো, হালকা মিষ্টি ও পুষ্টিকর ফল জামরুলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পানি, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন এ,বি,সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার ইত্যাদি খনিজ উপাদান। এ ছাড়া রয়েছে ডায়াটারি ফাইবার ও প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই ফলের রং ও আকৃতি বেশ সুন্দর। বর্তমানে সাদা, খয়েরি-লাল ও হালকা গোলাপি রঙের জামরুল দেখা যায়। কম-বেশি সারাদেশেই জামরুল চাষ হয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

পেঁপে: পেঁপে মূলত গ্রীষ্মকালীন ফল হলেও বর্তমানে সারাবছরই পাওয়া যায়। ইংরেজিতে Papaya, বৈজ্ঞানিক নাম: Carica papaya। পেঁপে কাঁচা, পাকা দু’ভাবেই খাওয়া যায়; তবে কাঁচা অবস্থায় সবজি এবং পাকলে ফল। কাঁচা ফলের বাইরের অংশ গাঢ় কালচে সবুজ এবং পাকলে খোসা সহ কমলা রং ধারণ করে। এর অনেক ভেষজ গুণও রয়েছে। এতে ভিটামিন এ, সি, ই, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, খনিজ পদার্থ, ফোলেট, ফাইবার এবং সামান্য ক্যালরি রয়েছে। পুষ্টিবোমা পেঁপে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই চাষ হয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

সফেদা: পুষ্টিসমৃদ্ধ গ্রীষ্মকালীন অত্যন্ত মিষ্টি, মাংসল, নরম ও সুস্বাদু ফল সফেদা। ইংরেজি নাম Sapodilla; বৈজ্ঞানিক নাম Manilkara zapota। কাঁচা ফল শক্ত এবং ‘স্যাপোনিন’ সমৃদ্ধ। ফলের ভেতরে দুই থেকে পাঁচটি বীজ থাকে। ভেতরের শাঁস হালকা হলুদ থেকে মেটে বাদামি রঙের হয়, বীজের রঙ কালো। সম্পূর্ণ ফ্যাটমুক্ত সফেদায় রয়েছে প্রচুর ভিটামিন এ, সি, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, কপার, আয়রন, ফসফরাস, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, ফোলেট, পাইরিডক্সিন, থায়ামিন, রিবোফ্লোবিন, নিয়ামিন ও প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড। বাংলাদেশে চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ইত্যাদি অঞ্চলে “আলুর গোট” নামেও এটি পরিচিত।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

গাব: গ্রীষ্মকালীন গুরুত্বপূর্ণ একটি সুস্বাদু, মিষ্টি এবং কোষযুক্ত ফল গাব বা বিলাতি গাব। ইংরেজিতে Velvet apple, বৈজ্ঞানিক নাম Diospyros discolor। পাকা গাবের রঙ গাঢ় লাল। খোসার উপরটা মখমলের মত। ফলের ভেতরটা নরম, ক্রিমের মতো সাদা বা গোলাপী শাঁস যুক্ত। স্বাদ এবং সুগন্ধ অনেকটা পীচের মতো। আপেলের আকৃতির এই ফলগুলো গোলাকার হয়। প্রায় ৩-৪ ইঞ্চি লম্বা, ব্যাস ২-৪ ইঞ্চি এবং ওজনে ১০০ গ্রাম থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। গাবে আছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালরি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন-এ, সি, থায়ামিন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে গাব পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন ফলসমূহ একদিকে যেমন বর্ণনাতীত পুষ্টির আধার অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পালন করে চলেছে অনবদ্য ভূমিকা। কিন্তু কিছু অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী এই সকল ফলসমূহে ক্ষতিকর, বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে বাজারজাত করছে। যা খাওয়ার ফলে মানবদেহে জটিল ও দুরারোগ্য রোগসমূহ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি এই সকল ফলের অব্যবহৃত কিংবা পঁচে যাওয়া অংশ যত্রতত্র ফেলার কারণে উপকারী পোকমাকড়, পশু, পাখি সেগুলো ভক্ষণ করে মারা যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে আমাদের জীববৈচিত্র্য। তাই অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বাজার থেকে কেনা ফলসমূহ কেনার ক্ষেত্রে যথাযথ সচেতনতা অবলম্বন এবং খাওয়ার পূর্বে প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন ফলসমূহকে বলা চলে পুষ্টিবোমা। তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের নিয়মিত ফল খাওয়া উচিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

চলতি সপ্তাহে দেশজুড়ে গরমের অনুভূতি কিছুটা বাড়তে পারে

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল

আপডেট সময় ০১:৫৫:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল ২০২৫

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রতিটি মৌসুমেই বিভিন্ন ফলের বাহার আমাদের রসনা বিলাসের পাশাপাশি নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। তেমনি ঘ্রাণ, স্বাদ এবং পুষ্টিতে গ্রীষ্মকালীন ফলসমূহ অনন্য। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ দুইমাস গ্রীষ্মকাল। এসময়ের ফলসমূহের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ, বাঙ্গি, জাম, বেল, তাল, আনারস, জামরুল, সফেদা, গাব, পেঁপে, কামরাঙ্গা, লটকন, ডেউয়া, ফলসা, ড্রাগন ইত্যাদি। গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষ ফলাহারে হয় পরিতৃপ্ত। এসব ফল খেয়ে জীবন বাঁচায় পশু-পাখিরাও, যা জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

আম: গ্রীষ্মকালীন ফলসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মোহনীয় নাম আম, যা সংস্কৃত ‘আম্র’ শব্দটি থেকে আগত। ইংরেজিতে Mango, বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica। নরম খোঁসা দ্বারা আবৃত রসালো, সুস্বাদু ও ঘ্রাণে অতুলনীয় আম গুণেও অনন্য। আমে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি, এনজাইম, শর্করা, ক্যারোটিন, ফাইবার পিকটিন, খনিজ, ক্যালরি, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যালিক এসিড, টারটারিক এসিড, সাইট্রিক এসিড এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা মানবদেহের জটিল রোগসমূহ প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ফলের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত করে আম থেকে চাটনি, আচার, আমসত্ত্ব, মোরব্বা, জ্যাম, জেলি ও জুস তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর আম চাষের জন্য বিখ্যাত। পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ প্রজাতির আম আছে। বাংলাদেশে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ক্ষীরসাপাতি, ফজলি, ল্যাংড়া, আশ্বিনা, হাঁড়িভাঙ্গাসহ আরো বাহারি নাম, বর্ণ, ঘ্রাণ ও স্বাদের আম পাওয়া যায়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

কাঁঠাল: বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল পর্তুগিজ ‘জ্যাকা’ শব্দটি থেকে আগত। গ্রীষ্মকালীন জনপ্রিয় ফলসমূহের মধ্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজি নাম Jackfruit, বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus। রুচি ও শক্তিবর্ধক এই ফলটিতে রয়েছে শর্করা, আমিষ, ক্যালরি, ক্যারোটিন, খনিজ লবণ, ভিটামিন এ, সি, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, থায়ামিন, রিবোফ্লোবিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, জিঙ্ক এবং নায়াসিনসহ বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদান যা মানবদেহের অনেক জটিল রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কাঁঠাল সাধারণত জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে পাকে যা অত্যন্ত রসালো, সুস্বাদু ও আঁশযুক্ত। বিশালাকার এই ফলটি ওজনে ৫৫ কেজি, দৈর্ঘ্যে ৩৫ ইঞ্চি এবং ব্যাসে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। বাইরের অংশ পুরু এবং কন্টকাকীর্ণ, ভেতরের দিকে একটি কাণ্ড ঘিরে অসংখ্য কোয়া/কোষ থাকে। প্রচুর ভেষজ গুণসম্পন্ন কাঁঠাল কাঁচা ও পাকা সব অবস্থাতেই খাওয়া যায়। কাঁচা কাঁঠালের এঁচোড় তরকারি হিসেবে বেশ সুস্বাদু এবং জনপ্রিয়। কাঁঠালের বীজ ভেজে ও তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। এর খোঁসা ও কাণ্ড বিভিন্ন প্রাণি ভক্ষণ করে থাকে। কম বেশি সারা দেশে পাওয়া গেলেও গাজীপুর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, ময়মনসিংহ ও নরসিংদী এলাকায় কাঁঠাল বেশি জন্মে।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

তরমুজ: গ্রীষ্মকালীন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সুস্বাদু একটি ফল তরমুজ। ইংরেজিতে Water Melon। বৈজ্ঞানিক নাম Citrullus lanatus। ফলের জগতে বৃহৎ আকৃতির ফল তরমুজে আছে প্রায় ৯০% পানি। তাই ক্লান্তি দূর করতে তরমুজের জুড়ি নেই। তরমুজে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি ও সি, আয়রন, লাইকোপিন, সিট্রুলিন, বিটা ক্যারোটিন, পটাশিয়াম, অ্যামাইনো এসিড, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট এবং সামান্য ক্যালরি। যা মানবদেহের অনেক জটিল রোগের মহৌষধ। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই তরমুজ চাষ হয়। তরমুজের ভেতরের তাপমাত্রা জীবাণু বৃদ্ধিতে সাহায্য করে বলে তরমুজ কেটে বেশিক্ষণ বাইরে ফেলে রাখা ঠিক নয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

লিচু: গ্রীষ্মকালীন অত্যন্ত জনপ্রিয় আরেকটি ফলের নাম লিচু। ইংরেজি নাম Lychee, বৈজ্ঞানিক নাম Litchi chinensis। মিষ্টি এবং রসালো এই ফলটি শুধু স্বাদে নয়, পুষ্টিতেও ভরপুর। লিচুতে আছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, ক্যালরি, শ্বেতসার, ভিটামিন, শর্করা, আমিষ, খনিজ লবণ এবং সামান্য স্নেহ থাকে যা মানবদেহের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে যথেষ্ট কার্যকরী। ফলটির বাইরের অংশ অমসৃণ ও লালচে গোলাপি বর্ণের খোঁসা দ্বারা আবৃত থাকে যা খাওয়া যায় না। ভেতরে থাকে সুমিষ্ট রসালো শাঁস। শাঁসটির ভিতরে থাকে একটি গাঢ় বাদামি রঙের বীজ যা খাওয়া যায় না। রাজশাহী, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম জেলা লিচু উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে লিচু থেকে তৈরি জ্যামও বেশ জনপ্রিয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

জাম: গ্রীষ্মকালীন আরেকটি সুপরিচিত ফল জাম। ইংরেজিতে Black plum, বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium cumini। ১ থেকে ২.৫ সেন্টিমিটার লম্বা ফলটি প্রায় আয়তাকার। দেখতে কালচে বর্ণের, অম্লধর্মী এবং কিছুটা কষভাব এই ফলটিতে রয়েছে প্রচুর আয়রন, ভিটামিন সি, বিশেষ এনজাইম, অক্সালিক অ্যাসিড এবং সামান্য পরিমাণে শর্করা। শুধু এর নরম মাংসল অংশটাই নয়, জামের ফুল, ফল, পাতা, ছাল, শেকড় সব কিছুই বনৌষধিতে ব্যবহৃত হয়। জামের বীজে রয়েছে জাম্বলিন নামে গ্লুকোসাইট যা রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, পাবনা, দিনাজপুর অঞ্চলে সাধারণত জাম বেশি পাওয়া যায়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

বাঙ্গি: গ্রীষ্মকালীন আরেকটি উপকারী ফল হচ্ছে বাঙ্গি। ইংরেজি নাম Melon, বৈজ্ঞানিক নাম Cucumis melo। রসালো ফল হিসেবে এই ফলের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। দেশের প্রায় সব জেলায় বাঙ্গির চাষ হলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বেশি হয়ে থাকে। ভিটামিন এ, সি, ফোলেট, শর্করা, পটাশিয়াম ও সামান্য পরিমাণে প্রোটিন ও ক্যারোটিনসমৃদ্ধ এই ফলটি আকারে বেশ বড় হয়। কাঁচা ফল সবুজ, পাকলে হলুদ রঙের হয় এবং ফেটে যায়। ফলের বাইরের দিকটা মিষ্টি কুমড়ার মত হালকা ডোরা কাটা খাঁজযুক্ত। খেতে তেমন মিষ্টি নয়, বেলে বেলে ধরনের, ভেতরটা ফাঁপা থাকে। দেশে প্রধানত দুই জাতের বাঙ্গি দেখা যায়, বেলে ও এঁটেল বাঙ্গি। বেলে বাঙ্গির শাঁস নরম। খোসা খুব পাতলা, শাঁস খেতে কিছুটা বালু বালু লাগে। তেমন মিষ্টি নয়। অন্যদিকে, এঁটেল বাঙ্গির শাঁস কচকচে, একটু শক্ত এবং তুলনামূলকভাবে মিষ্টি। এর পুরোটাই জলীয় অংশে ভরপুর।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

বেল: গ্রীষ্মকালীন অন্যতম জনপ্রিয় ফলের নাম বেল। ইংরেজিতে Wood apple, বৈজ্ঞানিক নাম Aegle marmelos। সারা বছর পাওয়া গেলেও গরমকালে এই ফলের চাহিদা বেশি। বেলে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন এ, বি, সি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পটাশিয়ামসহ প্রচুর খনিজ লবণ আছে। ফলটি বড়, গোলাকার, শক্ত খোসা বিশিষ্ট। ফলের ভিতরে শাঁস ৮-১৫টি খণ্ডে বিভক্ত। প্রতিটি খণ্ডে চটচটে আঠার সাথে অনেক বীজ লেগে থাকে। কাঁচা ফল সবুজ রঙের, পাকলে হলুদ হয়ে যায়। ভিতরের শাঁসের রঙ হয়ে যায় কমলা বা হলুদ। পাকা বেল থেকে সুগন্ধ বের হয়। পাকা বেল গাছ থেকে ঝরে পড়ে।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

তাল: গ্রীষ্মকালীন আরেকটি ফল তাল। ইংরেজি নাম Palmyra palm, বৈজ্ঞানিক নাম Borassus flabellifer। রসালো, সুস্বাদু ও ঠান্ডা ফল তাল ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সের আধার। তাল দিয়ে বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার যেমন তালের ক্বাথ, জুস, বড়া, কেক, পিঠা ইত্যাদি তৈরি করে খাওয়া যায়। তালের ফল এবং বীজ দুটিই খাওয়া যায়। কচি তালের বীজের মধ্যে থাকে জলে ভরা শাঁস। আর পাকা তালের বীজ মাটিতে রেখে দিলে তার মধ্যে শাঁস তৈরি হয় যা খেতে সুস্বাদু। তাল গাছের কাণ্ড থেকে রস সংগ্রহ হয় এবং তা থেকে গুড়, পাটালি, মিছরি ইত্যাদি তৈরি হয়। তালে রয়েছে ভিটামিন এ, বি ও সি, জিংক, পটাশিয়াম, আয়রনক্যালসিয়াম সহ আরো অনেক খনিজ উপাদান। এর সাথে আরো আছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদান।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

আনারস: পর্তুগিজ শব্দ আনানাস থেকে আগত গ্রীষ্মকালীন অন্যতম জনপ্রিয় ফল আনারস। ইংরেজিতে Pineapple, বৈজ্ঞানিক নাম Ananas comosus। রসালো ও সুস্বাদু ফল আনারসে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম ব্রোমেলেইন, ভিটামিন এ, বি-১, সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ, ক্যালরি, পেকটিন, ফলেট, থায়ামিন, ডায়েটারি ফাইবার, পাইরিওফিন ও রিবোফ্লোবিন যা মানবদেহের জন্য অপরিহার্য। দেহের পুষ্টি সাধন এবং দেহকে সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত রাখার জন্য এটি একটি অতুলনীয় এবং কার্যকর ফল। সিলেট, মৌলভীবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও নরসিংদী জেলায় এই ফল বেশি হয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

জামরুল: গ্রীষ্মকালীন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল জামরুল। ইংরেজি নাম Champoo, বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium samarangense। রসালো, হালকা মিষ্টি ও পুষ্টিকর ফল জামরুলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পানি, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ভিটামিন এ,বি,সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার ইত্যাদি খনিজ উপাদান। এ ছাড়া রয়েছে ডায়াটারি ফাইবার ও প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই ফলের রং ও আকৃতি বেশ সুন্দর। বর্তমানে সাদা, খয়েরি-লাল ও হালকা গোলাপি রঙের জামরুল দেখা যায়। কম-বেশি সারাদেশেই জামরুল চাষ হয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

পেঁপে: পেঁপে মূলত গ্রীষ্মকালীন ফল হলেও বর্তমানে সারাবছরই পাওয়া যায়। ইংরেজিতে Papaya, বৈজ্ঞানিক নাম: Carica papaya। পেঁপে কাঁচা, পাকা দু’ভাবেই খাওয়া যায়; তবে কাঁচা অবস্থায় সবজি এবং পাকলে ফল। কাঁচা ফলের বাইরের অংশ গাঢ় কালচে সবুজ এবং পাকলে খোসা সহ কমলা রং ধারণ করে। এর অনেক ভেষজ গুণও রয়েছে। এতে ভিটামিন এ, সি, ই, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, খনিজ পদার্থ, ফোলেট, ফাইবার এবং সামান্য ক্যালরি রয়েছে। পুষ্টিবোমা পেঁপে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই চাষ হয়।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

সফেদা: পুষ্টিসমৃদ্ধ গ্রীষ্মকালীন অত্যন্ত মিষ্টি, মাংসল, নরম ও সুস্বাদু ফল সফেদা। ইংরেজি নাম Sapodilla; বৈজ্ঞানিক নাম Manilkara zapota। কাঁচা ফল শক্ত এবং ‘স্যাপোনিন’ সমৃদ্ধ। ফলের ভেতরে দুই থেকে পাঁচটি বীজ থাকে। ভেতরের শাঁস হালকা হলুদ থেকে মেটে বাদামি রঙের হয়, বীজের রঙ কালো। সম্পূর্ণ ফ্যাটমুক্ত সফেদায় রয়েছে প্রচুর ভিটামিন এ, সি, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, কপার, আয়রন, ফসফরাস, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, ফোলেট, পাইরিডক্সিন, থায়ামিন, রিবোফ্লোবিন, নিয়ামিন ও প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড। বাংলাদেশে চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ইত্যাদি অঞ্চলে “আলুর গোট” নামেও এটি পরিচিত।

পুষ্টি বোমা গ্রীষ্মকালীন ফল prokritibarta

গাব: গ্রীষ্মকালীন গুরুত্বপূর্ণ একটি সুস্বাদু, মিষ্টি এবং কোষযুক্ত ফল গাব বা বিলাতি গাব। ইংরেজিতে Velvet apple, বৈজ্ঞানিক নাম Diospyros discolor। পাকা গাবের রঙ গাঢ় লাল। খোসার উপরটা মখমলের মত। ফলের ভেতরটা নরম, ক্রিমের মতো সাদা বা গোলাপী শাঁস যুক্ত। স্বাদ এবং সুগন্ধ অনেকটা পীচের মতো। আপেলের আকৃতির এই ফলগুলো গোলাকার হয়। প্রায় ৩-৪ ইঞ্চি লম্বা, ব্যাস ২-৪ ইঞ্চি এবং ওজনে ১০০ গ্রাম থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। গাবে আছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালরি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন-এ, সি, থায়ামিন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে গাব পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন ফলসমূহ একদিকে যেমন বর্ণনাতীত পুষ্টির আধার অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পালন করে চলেছে অনবদ্য ভূমিকা। কিন্তু কিছু অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী এই সকল ফলসমূহে ক্ষতিকর, বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে বাজারজাত করছে। যা খাওয়ার ফলে মানবদেহে জটিল ও দুরারোগ্য রোগসমূহ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি এই সকল ফলের অব্যবহৃত কিংবা পঁচে যাওয়া অংশ যত্রতত্র ফেলার কারণে উপকারী পোকমাকড়, পশু, পাখি সেগুলো ভক্ষণ করে মারা যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে আমাদের জীববৈচিত্র্য। তাই অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বাজার থেকে কেনা ফলসমূহ কেনার ক্ষেত্রে যথাযথ সচেতনতা অবলম্বন এবং খাওয়ার পূর্বে প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন ফলসমূহকে বলা চলে পুষ্টিবোমা। তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের নিয়মিত ফল খাওয়া উচিত।