সকাল সকাল টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ছলিমাবাদ ঘাটে প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু ও তার সবুজের দল, সঙ্গে সাদা অ্যাপ্রনে প্রকৃতি ও জীবন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মেডিকেল টিম। সবুজ-নীলাভ যমুনার জলে দু’টি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ওষুধের বাক্স, কম্বলের বড় বড় বস্তা নিয়ে শুরু হলো যাত্রা, গন্তব্য নাগরপুরের এক বিচ্ছিন্ন জনপদ, চর পাইকশা।

অল্পসময়ের জলযাত্রার পর পাইকশার ঘাটে নেমে ওষুধ-কম্বলের বোঝা তোলা হলো ঘোড়ায় টানা গাড়িতে, সেসব গাড়িতেই চেপে বসলো প্রকৃতি ও জীবন টিম।

হেমন্তে কাটা কাশবনের মাঝ দিয়ে চললো ঘোড়া-মানুষ-বস্তার এক বিচিত্রবহর, ঘোড়ার লাগামের সঙ্গে বাঁধা ঘণ্টির টুংটুং শব্দ আর ধূলার মেঘ দেখে ওদিকে চরে পড়ে গেল সাজ সাজ রব।

গন্তব্যে পৌঁছেই ঝটপট কাজ শুরু করে দেয় প্রকৃতি ও জীবনের কর্মীরা।পাইকশার স্কুলঘরের পাশের মাঠে জড়ো হলো গ্রামের মানুষ।

চরে বড় কোনো গাছ তেমন নেই। চরের বয়সও বেশি না মাত্র ৬-৭ বছর। তাই শীতকাল হলেও সকাল দশটাকে মনে হচ্ছিল দুপুর, তাই শামিয়ানা টাঙিয়ে টেবিল-চেয়ার পেতে রোগী দেখা শুরু করে দিলো প্রকৃতি ও জীবন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মেডিকেল টিম।

হাতে টোকেন নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে একে একে নানান ব্যথা, কাশি, জ্বর, বুক ধড়ফড়সহ প্রচলিত রোগের জন্য মেডিকেল টিমের পরামর্শ, ব্যবস্থাপত্র এবং বিনামূল্যের ওষুধ পেলেন সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা।

জমির আলী কাশির সিরাপ নিয়েছেন, ছাহেরা বেগম পেয়েছেন কোমর ব্যথার ওষুধ ও ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট, নুরুন্নাহারের ২ বছরের ছেলে সোহেলের সর্দি-ঠাণ্ডা জ্বর তাকেও দেয়া হয়েছে ওষুধ। বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ ও ওষুধ পেয়ে সবার মুখেই তাই হাসি। তাদের অনুভূতি প্রকাশের ভাষাগত গড় করলে এক কথায় হবে: “ডাক্তার দেখায়া ফিরি (ফ্রি) ওষুধ পায়া আমরা খুব খুশি, আপনাগো জন্য দোয়া করি।”

মেডিকেল ক্যাম্পের পাশেই আরেকটি শামিয়ানার নিচে লাইনে দাঁড়িয়েছেন গ্রামের শিশু-নারী-বৃদ্ধরা। সবার হাতে সবজে রঙের টোকেন, এটা দেখালেই মিলছে কম্বল। শীতে বিরান চরে রাতের হুহু বাতাসে উষ্ণতা দিতে পারে এই শীতবস্ত্র, তাইতো আশায় দাঁড়িয়ে তারা।
ধৈর্য্য নিয়ে হাসিমুখে শীতার্ত মানুষের মাঝে উষ্ণতা বিলি করলেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু।

প্রতিবছর শীতে এভাবেই দেশের চরাঞ্চলের মানুষদের মাঝে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে ও শীতবস্ত্র বিতরণ করে যাচ্ছে তাঁর প্রতিষ্ঠান।
চর পাইকশায় কম্বল বিতরণকালে প্রকৃতিবন্ধু বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকে দেশের অধিকাংশ বিচ্ছিন্ন জনপদ, চরের মানুষরা বঞ্চিত। অন্যদিকে শীতে দরিদ্র-দুস্থ মানুষ সামান্য একটা শীতবস্ত্রের অভাবে পড়েন সংকটে। তাই প্রতি বছর নভেম্বর থেকে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের অঙ্গসংগঠন প্রকৃতি ও জীবন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে আমরা চরের দুস্থ মানুষকে সাধ্যমতো সেবা করার চেষ্টা করি।’

জীবনের প্রতি মমতাময় মানুষ হিসেবে নিজস্ব বলয়ে পরিচিত মুকিত মজুমদার বাবু। তিনি চর পাইকশায় কর্মসূচি প্রসঙ্গে বলেন, ‘টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার চর পাইকশা খুব একটা পুরনো চর নয়। চরে বড় গাছপালাও কম, বালু মাটিতে চাষাবাদও কষ্টের। মানুষ এখানে কষ্টে জীবনযাপন করেন। তাই শীতে আমাদের দেশব্যাপী কর্মসূচীর অংশ হিসেবে এই চরে আমরা কম্বল বিতরণ করছি, পাশেই চলছে মেডিকেল ক্যাম্প যেখানে প্রকৃতি ও জীবন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের চিকিৎসক ও কর্মীরা নানা বয়সী মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নদীবিধৌত দেশে অসংখ্য চর রয়েছে। এখনো এসব চরের মানুষ স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছেন। এতগুলো চরের এতো বিপুলসংখ্যক মানুষের পাশে দাঁড়ানো আসলে একটি প্রতিষ্ঠানের একারপক্ষে সম্ভব নয়। আমরা সম্মিলিতভাবে যখন এগিয়ে আসবো তখনই এই চরবাসীরা ভালো থাকবেন।’

বেলা গড়িয়ে দুপুর ২টা, সংক্ষিপ্ত হয়ে আসে চিকিৎসা ও শীতবস্ত্র নিতে আসা মানুষের সারি। কোনো রকম হই-হট্টগোল ছাড়াই উপস্থিত চরবাসীর প্রত্যেকে বাড়ির পথ ধরেন হাসিমুখে।

অন্যদিকে সন্ধ্যে নামার আগে আলো থাকতে থাকতেই মানুষের সেবা করার তৃপ্তির হাসি নিয়ে প্রকৃতি ও জীবন টিম আবার সেই ঘোড়ার গাড়িতে চেপে হেলেদুলে রওনা দেয় ঘাটের দিকে।

ঘাটে নৌকায় ওঠার পর ধীরে ধীরে পেছনে পড়তে থাকে চর পাইকশা, শুকনো কাশবনের পাশে কচিসবুজ পাতার শাড়ি পরে যেন বিদায় জানায় বাতাসে দোলা সরষে ফুল।
নাসিমুল শুভ 




















