প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে চলেছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি চায় পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিপর্যায়ে চিন্তা-অভ্যাসের পরিবর্তন, পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করতে। এজন্য ফাউন্ডেশন নিজস্ব কর্মকাণ্ডে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করছে। এরই অংশ হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) তেজগাঁওয়ের চ্যানেল আই কার্যালয়ে ‘বিতার্কিকদের পরিবেশ ভাবনা’ নামের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংলাপে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু এবং ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ পরিবেশ-জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিতার্কিদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন।

সংলাপ শুরুর আগে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বক্তারা প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা, অর্জিত সচেতনতা অভ্যাস ও মূল্যবোধের মাধ্যমে বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সরকারগুলোর স্বদিচ্ছা, আসন্ন নির্বাচনে দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ-জলবায়ুগত সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির দাবিও তোলা হয়।
প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, ‘পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় যতো সংলাপ হবে, চর্চা হবে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে, তা সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখবে, প্রচারণা পাবে, ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বাড়বে। পরিবেশ সংরক্ষণে তরুণ্যের সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। দেশে তরুণদের মাধ্যমেই ৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় এসেছে, তরুণরাই ৯০, ২৪ এর আন্দোলন করেছে। তাদের মাধ্যমেই পরিবর্তন এসেছে।’

তিনি পরিবেশ রক্ষার চর্চা প্রসঙ্গে বলেন, ‘পরিবেশ-প্রকৃতির প্রতি মায়া, এসব রক্ষার বোধটা পরিবার থেকে শুরু হওয়া উচিৎ, যেভাবে ধর্মীয় আদবকায়দা আমরা পরিবার থেকে শিখি সেভাবে যেন গাছ,পাখি, ব্যাঙ সহ সকল প্রাণের প্রতি আমাদের করণীয় জ্ঞানটাও আসে। দেশটা আমাদের, দেশটাকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার, পরিবেশ ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকবো।’
সভা-সমাবেশ, নানা কথায় পরিবেশ সংরক্ষণে যে সচেতনতার বার্তা সেটা বাস্তবায়নে মূল্যবোধ জাগ্রত করার আহ্বান জানিয়ে প্রকৃতিবন্ধু বলেন, ‘ পলিথিন, প্লাস্টিক, পরিবেশ দূষণ, দূষিত খাবার উৎপাদন এসব বন্ধ করা যাবে যদি আমাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হয়, নিজেদের ক্ষতি করার অভ্যাসটা বাদ দেয়া যায়। বাজারে গেলে যেন পলিথিন ব্যাগ আমরা নিজেরা গ্রহণ না করি, বিকল্প ব্যাগ, সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের বিকল্প যেন নিজেরা বেছে নেই। একই সঙ্গে সরকারের উচিৎ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ রক্ষায় যথাযথ ভর্তুকি নিশ্চিত করে দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।’
সংলাপপূর্ব আলোচনায় অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে ছিলেন দেশের জাতীয় পর্যায়ে বিতার্কিকদের পরিচিত মুখ এবং ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।

তিনি বলেন, ‘পরিবেশ সুরক্ষার ইনডেক্সে ১৮০ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯ তম। পরিবেশ রক্ষায় জাতি হিসাবে আমরা ব্যর্থ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের ফলে বছরে ২ লাখ ৭২ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। শুধু বায়ু দূষণে মারা যাচ্ছে ৫৫ শতাংশের মানুষ। ২০১৯ সালের বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে পরিবেশ দূষণে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে মোট জিডিপির ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এতে বায়ু দূষণের ক্ষতির পরিমান ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। বায়ুদূষণে বিশ্বের সাড়ে ১২শ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান তৃতীয়। বিগত সরকারের আমলে উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে। রামপাল কয়লাচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে সুন্দবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। মাতারবাড়ি, বড়পুকুরিয়া, পায়রাসহ বেশ কয়েকটি কয়লা ভিত্তিক বিদুৎ কেন্দ্র পরিবেশ সুরক্ষা বিবেচনা করে তৈরি করা হয়নি। পরিবেশের ক্ষতি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে তা টেকসই হয় না। বিগত সরকার উন্নয়নের নামে প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এমনকি জলবায়ু তহবিলের টাকায় সড়কে বাতি বসানো, বাস টার্মিনাল তৈরি, রাস্তা-ঘাট মেরামত, কলেজ ভবন নির্মান, পুকুরের ঘাট বাধানো, পার্ক তৈরি, জলবদ্ধতা নিরসন, অবকাঠামো নির্মানসহ অনেক কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে, যার সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার তেমন কোন সম্পর্ক নেই।’
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেবে বলে আশা করেন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়তে কাজ করা এই গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবেন তারা যেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতিকে ক্ষতি করবেন না এমন প্রতিশ্রুতি দেন। আমার মনে হয় এমন প্রতিশ্রুতি জনবান্ধব হবে এবং এতে তাদেরই ভোট বাড়বে। কারণ বায়ুদূষণ, পানিদূষণসহ নানা দূষণে দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

আলোচনা পর্বের পর আসে মূল সংলাপ পর্ব। আসলে এই পর্বে মূলত ঢাকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংলাপে অংশ নেয়া বিতার্কিকরা প্রকৃতি-পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে মুকিত মজুমদার বাবু ও হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের কাছে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
মুকিত মজুমদার বাবুর কাছে বিতার্কিকরা পরিবেশবান্ধব কারখানা, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিবেশের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে ৪০ শতাংশ বেশি ব্যয় করে অনেকে গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়লেও তারা সেভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না। তাদের যথাযথভাবে গুরুত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে না। বিদেশী ক্রেতারা এসব কারখানায় যখন ক্রয় আদেশ দিচ্ছে তখন তারা এসব কারখানাকে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে বর্ধিত মূল্য দিতে চাইছে না। এতে করে যারা পরিবেশের ক্ষতি করে সস্তায় পণ্য ডেলিভারি দিচ্ছে বিদেশী ক্রেতারা সেদিকে ঝুঁকছে। পাশাপাশি সরকারকেও গ্রিন ফ্যাক্টরির জন্য ভর্তুকি, সহজ ঋণ নিশ্চিত করতে হবে। পোশাক শিল্পতো বটেই, আমরা চামড়া শিল্পে পরিবেশবান্ধব অর্থাৎ গ্রিন ফ্যাক্টরি গড়া নিয়ে কাজ করছি। এই শিল্পে পরিবেশ ও শ্রমিকের মারাত্মক ঝুঁকি থাকলেও এখনও ট্যানারি চলছে সনাতনী ভাবধারায়, যার পরিবর্তনে আধুনিক বর্জ্য পরিশোধনাগার, শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কারখানা এলাকায় সবুজায়নে কাজ করছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন।’

জলবায়ু অর্থায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশের প্রেসিডেন্ট জলবায়ু পরিবর্তনকে স্বীকারই করছেন না। এতে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করা দেশগুলো বাংলাদেশের মতো কম কার্বন নিঃসরণ করা অথচ বেশি ক্ষতির শিকার হওয়া দেশগুলোর জন্য লস অ্যান্ড ড্যামেজ ভিত্তিক জলবায়ু ক্ষতিপূরণে বার বার গড়িমসি করছে। গত বছর জলবায়ু সম্মেলন কপ ২৯ এবং এবার ব্রাজিলে হতে যাওয়া কপ ৩০-তেও প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন থাকবে। এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে অন্যান্য সংস্থার হয়ে তরুণরাও সোচ্চার হবে বলে আশা করি। আসলে জলবায়ু সম্মেলন ৩০ তম আসরে পা রাখলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের ৩০ শতাংশও হয়তো পূরণ হয়নি।’

এখন কোনো রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনায় নেই, তবু কেন আদালতের আদেশের পরও পান্থকুঞ্জ – হাতিরঝিলে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে পরিবেশ ধ্বংস ও বৃক্ষ নিধন চলছে? এক বিতার্কিক হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের কাছে এই প্রশ্ন করেন।

জবাবে কিরণ বলেন, ‘আসলে এমন প্রশ্ন চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। রাজনৈতিক সরকার নেই, আবার রাজনৈতিক সরকার এলেই বা কী হবে! রাজনৈতিক সরকার না থাকলেও রাজনৈতিক ছত্রছায়া রয়েছে। আমরা দেখছি পরিবেশবাদীরা এটা নিয়ে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন করছেন। পরিবেশের ক্ষতি করে আমরা যেন কোনো প্রকল্প না করি এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের কাছে, সরকারের কাছে, যারা প্রাইভেট সেক্টরে আছেন তাদের কাছে অনুরোধ করি। সবার আগে দরকার পরিবেশ রক্ষা করার ইচ্ছা।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র পরিচালক ড. এস এম মোর্শেদ। সংলাপ সঞ্চালনা করেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন। সংলাপে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি, ইডেন মহিলা কলেজ ও তেজগাঁও কলেজের ২৫ জন বিতার্কিক অংশ নেন।
নাসিমুল শুভ 










