অনেকেই একটু পুরনো এবং ডালপালা ছড়ানো বড় গাছকে বট গাছ বলেন। এমনকি প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে রমনায় যেখানে সাংস্কৃতিক আয়োজন হয় সেই জায়গাকে বলা রমনা বটমূল, অথচ গাছটি কিন্তু বটগাছ নয়। রমনা বটমূলের গাছটি আসলে অশ্বত্থ গাছ। আরেকটি গাছের নাম গল্প-উপন্যাসে পাওয়া যায়, গ্রামাঞ্চলে এই গাছ নিয়ে নানা উপকথাও প্রচলিত আছে, সেটি হলো পাকুড় গাছ। অনেকেই আবার অশ্বত্থ এবং পাকুড় গাছের পার্থক্য ধরতে পারেন না, কারণ পাতাগুলো দেখতে প্রায় একই রকম।
কৃষ্ণচন্দ্র রায়চৌধুরী ‘বট উপখ্যান’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘সারা পৃথিবীতে প্রায় তিনশো জাতের বটের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার মধ্যে প্রায় আড়াইশো আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেখানে আবহাওয়া আর্দ্র আর গরম। বট বড়ই শীতকাতুরে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এরা নেই বললেই চলে।’
তিনি আরও লিখেছেন ‘কয়েকটি ব্যাপারে বটগাছ অন্যান্য উদ্ভিত থেকে স্বতন্ত্র। ইংরেজিতে তাবৎ বটগাছ হলো ফিগ ট্রি। আমরা বাংলায় ফিগ বলতে বুঝি ডুমুর। অর্থাৎ ফলটি। যে ডুমুরের তরকারি আমরা খাই তাও একজাতের বট বলতে হবে––কারণ ডুমুর, বট, অশ্বত্থ, পাকুড় সবাই একই গোষ্ঠীর গাছ। আর গোষ্ঠীর কেতাবি নাম ফাইকাস।’
তবে বট, অশ্বত্থ এবং পাকুড় গাছের মধ্যে কিছু বৈশিষ্টগত পার্থক্য আছে।
বট
আগেই বলা হয়েছে বটের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক নিবিড়। বটের বৈজ্ঞানিক নাম ফাইকাস বেঙ্গালেনসিস। বটের পাতা ডিম্বাকৃতি, মসৃণ ও উজ্জ্বল সবুজ। কচি পাতা তামাটে। স্থান-কাল-পাত্রভেদে পাতার আয়তনের বিভিন্নতা একাধারে বটের বৈশিষ্ট্য তথা প্রজাতি শনাক্তকরণের পক্ষে জটিলতার কারণও। পরিণত গাছের পাতা আকারে কিছুটা ছোট হয়ে আসে। বটের কুঁড়ি পাংশুটে হলুদ এবং এর দুটি স্বল্পায়ু উপপত্র পাতা গজানোর পরই ঝরে পড়ে। খুব অল্প বয়স থেকেই বট গাছের ঝুরি নামতে শুরু করে। মাটির সমান্তরালে বাড়তে থাকা ডালপালার ঝুরিগুলো একসময় মাটিতে গেঁথে গিয়ে নিজেরাই একেকটা কাণ্ডে পরিণত হয়।

এভাবেই বট গাছ ধীরে ধীরে চারপাশে বাড়তে থকে এবং একসময় মহীরুহে পরিণত হয়। বসন্ত ও শরৎ বট গাছে নতুন পাতা গজানোর দিন। এসময় কচি পাতার রং উজ্জ্বল সবুজ থাকে। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত হলো ফল পাকার সময়। এটি চিরহরিৎ সাইকাস বহুবর্ষজীবি গাছ।
বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই বটগাছ আছে এবং প্রায় সব এলাকায় বটতলা নামে জায়গা আছে। প্রাচীনকাল থেকে বটতলায় হাট-বাজার, মেলা এবং ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে।
অশ্বত্থ
প্রায় বটগাছের মতো দেখতে বিস্তৃত ডাল-পাতার ছায়া দেওয়া আরেকটি গাছ অশ্বত্থ। অনেকেই বট অশ্বত্থের পার্থক্য বোঝেন না, যদিও বট এবং অশ্বুত্থের পাতা দেখলে সহজেই বোঝা যায় পার্থক্যটা। বটের পাতা পুরু এবং পাতার শেষ দিক গোলাকার। অন্যদিকে অশ্বত্থের পাতা অপেক্ষাকৃত পাতলা এবং পাতার শেষভাগ সূচালো। আরও সহজ করে বললে, অশ্বত্থ পাতা দেখতে অনেকটা পানের মতো এবং এই পাতার শেষভাগে সূচালো লেজের মতো অংশ আছে।

অশ্বত্থ, অশথ বা পিপুল এক প্রকার বট বা ডুমুর জাতীয় বৃক্ষ যার আদি নিবাস স্থানীয় ভারতীয় উপমহাদেশ এবং ইন্দোচীন। এছাড়া বাংলাদেশ, নেপাল, মায়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ পশ্চিম চীন প্রভৃতি দেশেও এটি দেখতে পাওয়া যায়। অশ্বত্থ গাছ সনাতন হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মে পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। বলা হয়, গৌতম বুদ্ধ যে গাছে নিচে বোধি বা জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়েছিলেন সেটি ছিল অশ্বত্থ গাছ। ধর্মীয় গুরুত্ব আছে বলেই অশ্বত্থের বৈজ্ঞানিক নাম ফাইকাস রিলিজিয়োসা।
পাকুড়
অনেকে অশ্বত্থ এবং পাকুড় গাছকে মিলিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ অশ্বত্থ এবং পাকুড় যে আলাদা দুরকমের বৃক্ষ তা বুঝতে পারেন না। বট এবং অশ্বত্থের পার্থক্য পাতা দেখে সহজে বোঝা যায়। কিন্তু অশ্বত্থ এবং পাকুড়ের পাতা দেখতে প্রায় একই রকম। পার্থক্য বুঝতে হলে পাতাতে আরেকটু মনোযোগ দিতে তাকাতে হবে।
পাকুড় ও অশ্বত্থ উভয়ই বিশালাকৃতির বৃক্ষ, গাছের পাতার বৈশিষ্ট্যও প্রায় একই রকম এবং গাছ দুটির বেশ কিছু প্রজাতি রয়েছে যাদের বাহ্যিক চেহারা ও বৈশিষ্ট্য প্রায় একই ধরনের। তবে কিছু বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গাছ দুটিকে আলাদাভাবে চেনা সম্ভব। যেমন- অশ্বত্থ গাছের পাতা তাম্বুলাকৃতির (পান পাতার মতো) হয়ে থাকে। এমন তাম্বুলাকৃতি ঘন-সবুজ পাতার লম্বা লেজ অন্য গাছে নেই। এ গাছের ঝুরির সংখ্যা খুবই কম অন্যদিকে পাকুড় গাছ একটি ঝুরিবহুল বৃক্ষ। পাকুড়ের পাতায় অশ্বত্থের মতো আলাদা লেজের মতো দেখতে কিছু নেই। অশ্বত্থের ফল পাকা অবস্থায় গাঢ় বেগুনি রঙের হয়, অন্যদিকে পাকুড় গাছের ফল পাকলে কমলা রঙ ধারণ করে।

পাকুড় গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ফাইকাস রামফি। পাকুড় একটি বৃহদাকার বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। এটি ক্ষীরী বৃক্ষ নামেও পরিচিত, কারণ এর কচি ডাল ও পাতা ছিঁড়লে সাদা আঠা বের হয়।
বট, অশ্বত্থ এবং পাকুড়, বাংলার প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ। বহুবর্ষী এসব বৃক্ষের ছায়াতলে এখনও হয় জনসমাগম, বসে হাট-বাজার। পালা পার্বণে মেলা জমে বট-অশ্বত্থ-পাকুড়তলায়।
নাসিমুল শুভ 



















