আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসের আলোচনা সভায় উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান

‘বাঘ রক্ষায় সুন্দরবনে হরিণ নিধন, আগুন এবং চোরা শিকার-পাচার বন্ধে কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে’   

  • নাসিমুল শুভ
  • আপডেট সময় ০৬:৪৮:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫
  • 334

‘বাঘ রক্ষায় সুন্দরবনে হরিণ নিধন, আগুন এবং চোরা শিকার-পাচার বন্ধে কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে’   

সুন্দরবনে বাঘের নিরাপত্তা নিশ্চিতে হরিণ নিধন, চোরা শিকারী ও পাচারকারী নির্মূল এবং রহস্যজনক আগুন লাগা বন্ধে কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, ‘বাঘ পাচারকারী ও চোরা শিকারিদের বিরুদ্ধে আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড়াতে হবে। বাঘ সংরক্ষণের সুফল জনগণের সামনে দৃশ্যমান করতে হবে।’

আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস ২০২৫ উপলক্ষ্যে আজ (মঙ্গলবার) আগারগাঁওয়ে বন ভবনে আয়োজিত আলোচনা সভায় সচিবালয় থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

তিনি বলেন, “বারবার সুন্দরবনে কেন আগুন লাগছে, একই জায়গায় কেন বারবার আগুন লাগছে, এগুলোর কারণ উদঘাটনে অন্তর্বর্তী সরকার চিন্তা করছে এবং আমরা কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার দিকে যাচ্ছি। সুন্দরবনে হরিণের সাথে বাঘের উপস্থিতির একটা সম্পর্ক আছে। সুন্দরবনে আগুন লাগার সাথে বাঘের নিরাপত্তার সম্পর্ক আছে। এসব জায়গায় আমাদের কাজেকর্মে আরও অনেক উন্নতি দেখাতে হবে।”

রিজওয়ানা বলেন, “বাঘের যে মৃত্যু সংখ্যা, সেখানে দেখলাম পাচারকারীরা রয়েছে। আর গ্রামবাসীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে অনেক বাঘ নিহত হয়। সেই দ্বন্দের জায়গাটাকে আমাদেরকে স্বাভাবিক সুরক্ষা বলয় সৃষ্টি করে শনাক্ত করতে হবে। প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি সেটাও আমরা করবার চেষ্টা করছি। আমরা আশা করি খুব শীঘ্রই আপনাদের জানাতে পারব, সুন্দরবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আমাদের ব্যবস্থাটা কী এবং পাচারকারীর বিরুদ্ধে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বসে কী কর্মপরিকল্পনা করছি।”

তিনি বলেন, ‘বাঘ শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়, এটি বাংলাদেশের গর্ব ও জাতিসত্তার প্রতীক। যেমন আমরা সুন্দরবন নিয়ে গর্ব করি, তেমনি গর্ব করি রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিয়েও। সাহস, ভালোবাসা ও বীরত্বের প্রতীক হিসেবে আমরা বাঘকে দেখি। ক্রিকেটারদের ‘টাইগার’ নামে ডাকাও সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ।’

সাম্প্রতিক বাঘ শুমারির ফলাফল তুলে ধরে উপদেষ্টা জানান, কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কারণে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে, যা আশাব্যঞ্জক। তবে হরিণ শিকারে নিয়ন্ত্রণ, বারবার অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ এবং চোরা শিকার রোধে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

আলোচনা সভায় প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, “আমরা দেখেছি একসময় প্রায় ১৯টি জেলায় বাঘ ছিল। এখন কিন্তু সুন্দরবন অর্থাৎ খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট এই তিনটি জেলায় বাঘ আছে। আর কোনো জেলায় বাঘ নেই। পৃথিবীর যে ১৩টি দেশে বাঘ আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাঘের সংখ্যা বিগত ১০ বছরে কিছুটা হলেও বেড়েছে, হয়ত কমিটমেন্ট যেভাবে ছিল, সেভাবে বাড়েনি। ২০১৪ সালে ১০৬টি, ১৮ সালে এসে হল ১১৪টি এবং ২৪ সালে এসে হল ১২৫টি। প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে এই এক দশকে।”

সুন্দরবন বাঘের জন্য ‘আদর্শ আবাসস্থল নয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “ভারতে গত এক যুগে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বাঘের সংখ্যা। এর কতগুলো কারণও কিন্তু আছে। বাংলাদেশে বাঘ একমাত্র টিকে আছে সুন্দরবনে। এটাকে কিন্তু কোনোভাবেই বাঘের জন্য আদর্শ আবাসস্থল বলা যাবে না। কারণ মানুষই সেখানে হাঁটতে গেলে কাদায় পা ডুবে যায়, বাঘ সেখানে হরিণ শিকার করাটা বেশ কঠিন হয়ে যায়। এরকম বিরূপ পরিবেশে বাঘ যে টিকে আছে, সেটি সেখানকার সবার সমন্বয়ের ফল।”

বাঘ সংরক্ষণে সচেতনতা বেড়েছে মনে করেন প্রধান বন সংরক্ষক, তিনি বলেন, “২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছরই বাঘ গ্রামে এলে একটি দুটি করে মারা পড়ত। ২০১৩ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত শুধু ১৮ সালে মোংলা উপজেলার চাঁদপাই এলাকায় একটি বাঘ গ্রামে চলে আসার পর মারা পড়েছে। এর বাইরে এই সময়ে কোনো বাঘ মারা পড়েনি।’

তিনি আরও বলেন,“বাঘ সংরক্ষণ করার জন্য এবং সুন্দরবন কী পরিমাণ বাঘ ধারণ করতে পারে সে অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য অনেকগুলো কাজ এখন আমাদের সামনের দিনে করতে হবে।”

বাঘ দিবসের এই আলোচনা সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহিনা আহমেদ, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী, খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ, আইইউসিএনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি বিপাশা হোসেন, ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী আনোয়ারুল ইসলাম, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আলী রেজা খান।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

প্লাস্টিক দূষণ রোধে বৈশ্বিক চুক্তির আলোচনা করতে নতুন নেতা নির্বাচিত  

আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসের আলোচনা সভায় উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান

‘বাঘ রক্ষায় সুন্দরবনে হরিণ নিধন, আগুন এবং চোরা শিকার-পাচার বন্ধে কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে’   

আপডেট সময় ০৬:৪৮:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫

সুন্দরবনে বাঘের নিরাপত্তা নিশ্চিতে হরিণ নিধন, চোরা শিকারী ও পাচারকারী নির্মূল এবং রহস্যজনক আগুন লাগা বন্ধে কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, ‘বাঘ পাচারকারী ও চোরা শিকারিদের বিরুদ্ধে আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে দাঁড়াতে হবে। বাঘ সংরক্ষণের সুফল জনগণের সামনে দৃশ্যমান করতে হবে।’

আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস ২০২৫ উপলক্ষ্যে আজ (মঙ্গলবার) আগারগাঁওয়ে বন ভবনে আয়োজিত আলোচনা সভায় সচিবালয় থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

তিনি বলেন, “বারবার সুন্দরবনে কেন আগুন লাগছে, একই জায়গায় কেন বারবার আগুন লাগছে, এগুলোর কারণ উদঘাটনে অন্তর্বর্তী সরকার চিন্তা করছে এবং আমরা কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার দিকে যাচ্ছি। সুন্দরবনে হরিণের সাথে বাঘের উপস্থিতির একটা সম্পর্ক আছে। সুন্দরবনে আগুন লাগার সাথে বাঘের নিরাপত্তার সম্পর্ক আছে। এসব জায়গায় আমাদের কাজেকর্মে আরও অনেক উন্নতি দেখাতে হবে।”

রিজওয়ানা বলেন, “বাঘের যে মৃত্যু সংখ্যা, সেখানে দেখলাম পাচারকারীরা রয়েছে। আর গ্রামবাসীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে অনেক বাঘ নিহত হয়। সেই দ্বন্দের জায়গাটাকে আমাদেরকে স্বাভাবিক সুরক্ষা বলয় সৃষ্টি করে শনাক্ত করতে হবে। প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি সেটাও আমরা করবার চেষ্টা করছি। আমরা আশা করি খুব শীঘ্রই আপনাদের জানাতে পারব, সুন্দরবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আমাদের ব্যবস্থাটা কী এবং পাচারকারীর বিরুদ্ধে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বসে কী কর্মপরিকল্পনা করছি।”

তিনি বলেন, ‘বাঘ শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়, এটি বাংলাদেশের গর্ব ও জাতিসত্তার প্রতীক। যেমন আমরা সুন্দরবন নিয়ে গর্ব করি, তেমনি গর্ব করি রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিয়েও। সাহস, ভালোবাসা ও বীরত্বের প্রতীক হিসেবে আমরা বাঘকে দেখি। ক্রিকেটারদের ‘টাইগার’ নামে ডাকাও সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ।’

সাম্প্রতিক বাঘ শুমারির ফলাফল তুলে ধরে উপদেষ্টা জানান, কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কারণে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে, যা আশাব্যঞ্জক। তবে হরিণ শিকারে নিয়ন্ত্রণ, বারবার অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ এবং চোরা শিকার রোধে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

আলোচনা সভায় প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, “আমরা দেখেছি একসময় প্রায় ১৯টি জেলায় বাঘ ছিল। এখন কিন্তু সুন্দরবন অর্থাৎ খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট এই তিনটি জেলায় বাঘ আছে। আর কোনো জেলায় বাঘ নেই। পৃথিবীর যে ১৩টি দেশে বাঘ আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাঘের সংখ্যা বিগত ১০ বছরে কিছুটা হলেও বেড়েছে, হয়ত কমিটমেন্ট যেভাবে ছিল, সেভাবে বাড়েনি। ২০১৪ সালে ১০৬টি, ১৮ সালে এসে হল ১১৪টি এবং ২৪ সালে এসে হল ১২৫টি। প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে এই এক দশকে।”

সুন্দরবন বাঘের জন্য ‘আদর্শ আবাসস্থল নয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “ভারতে গত এক যুগে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বাঘের সংখ্যা। এর কতগুলো কারণও কিন্তু আছে। বাংলাদেশে বাঘ একমাত্র টিকে আছে সুন্দরবনে। এটাকে কিন্তু কোনোভাবেই বাঘের জন্য আদর্শ আবাসস্থল বলা যাবে না। কারণ মানুষই সেখানে হাঁটতে গেলে কাদায় পা ডুবে যায়, বাঘ সেখানে হরিণ শিকার করাটা বেশ কঠিন হয়ে যায়। এরকম বিরূপ পরিবেশে বাঘ যে টিকে আছে, সেটি সেখানকার সবার সমন্বয়ের ফল।”

বাঘ সংরক্ষণে সচেতনতা বেড়েছে মনে করেন প্রধান বন সংরক্ষক, তিনি বলেন, “২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছরই বাঘ গ্রামে এলে একটি দুটি করে মারা পড়ত। ২০১৩ সাল থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত শুধু ১৮ সালে মোংলা উপজেলার চাঁদপাই এলাকায় একটি বাঘ গ্রামে চলে আসার পর মারা পড়েছে। এর বাইরে এই সময়ে কোনো বাঘ মারা পড়েনি।’

তিনি আরও বলেন,“বাঘ সংরক্ষণ করার জন্য এবং সুন্দরবন কী পরিমাণ বাঘ ধারণ করতে পারে সে অনুযায়ী বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য অনেকগুলো কাজ এখন আমাদের সামনের দিনে করতে হবে।”

বাঘ দিবসের এই আলোচনা সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহিনা আহমেদ, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী, খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ, আইইউসিএনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি বিপাশা হোসেন, ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী আনোয়ারুল ইসলাম, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আলী রেজা খান।