বিজয় দিবসের সকাল মানেই রাজধানীর তেজগাঁওয়ের শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণির চ্যানেল আই প্রাঙ্গনে লাল-সবুজের মেলা। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় চ্যানেল আইয়ের বিজয় দিবস উদযাপন এখন রীতিতে পরিণত হয়েছে। সেই রীতি অনুযায়ী আজ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস গান-কবিতা, নৃত্য এবং মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা দিয়ে উদযাপন করেছে হৃদয়ে বাংলাদেশকে ধারণ করা চ্যানেল আই। ‘হৃদয়ে লাল-সবুজ’ শিরোনামে বিজয় দিবস ২০২৫ উদযাপন করেছে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলটি।
প্রতিবছর চ্যানেল আইয়ের ছাতিম তলাতেই বসে লাল-সবুজের বিজয় মেলা, এখানেই চ্যানেল আই চেতনা চত্বরের অস্থায়ী মঞ্চে সকাল থেকে শুরু হয়ে দুপুর পর্যন্ত নানা আয়োজনে পালিত হয় বিজয় দিবস। ঢাক-ঢোলের বাদ্যে লাল-সবুজ বেলুন এবং শান্তির পায়রা উড়িয়ে বিজয় দিবস অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মজুমদার বাবু, দশ জেলার দশজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আগত অতিথিরা।

বরাবরের মতোই এই আয়োজনে চ্যানেল আইয়ের অন্যতম কর্ণধার বীর মুক্তিযোদ্ধা মুকিত মজুমদার বাবু দশজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে আজীবন সম্মাননা জানিয়েছেন। শুরুতেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লাল-সবুজ উত্তরীয় পরিয়ে দেন তিনি, এরপর তাদের হাতে একে একে তুলে দেন ক্রেস্ট ও ৫০ হাজার টাকা সম্মানির প্রতীকী চেক।

একাত্তরে স্কুলছাত্র থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়া মুকিত মজুমদার বাবু আজ সফল শিল্পপতি। তবে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা সবসময় স্মরণে রাখেন দেশের নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। তাই প্রতিবছরই বিজয়ের দিনে সকালটা তিনি নানা রণাঙ্গনের সহযোদ্ধা, একাত্মা মানুষদের আমন্ত্রণ জানান চ্যানেল আইতে, জানান সম্মাননা।
এবার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল এই মাটির জন্য, এই দেশের জন্য, আমাদের অধিকারের জন্য। ১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণ, লাখো মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বহুকষ্টে আমরা বাংলার স্বাধীনতা পেয়েছি। এখন ৫৪ বছর আগে পাওয়া এই স্বাধীনতাকে ধরে রাখার সংগ্রাম, এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম।’

তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আজকে যে মাটির ওপর আমরা দাঁড়িয়েছি, সেই মাটি আমাদের প্রাণ, আমাদের জীবন। এই মাটি স্বাধীন করতে, পাকিস্তানের শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে আমরা সবাই একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, হাতে-হাত মিলিয়েছিলাম। বর্তমানে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এখন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার কথা ভুললে চলবে না। বাংলাদেশের জন্য যারা আত্মত্যাগ করেছেন, যে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য লড়েছেন, যে নারীরা নির্যাতিত হয়েছেন তাদের কথা যদি আমরা ভুলে যাই তাহলে তাদের রক্তের সাথে বেঈমানি করা হবে।’

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘একাত্তরকে ফেলে দিয়ে কোনো কিছুই এগুতে পারে না। একাত্তর আমাদের মূল চেতনা, একাত্তর আমাদের সবকিছুর উর্ধে। এই একাত্তরকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আসুন আমরা বাংলাদেশকে সবকিছুর উর্ধে রাখি।’

তাঁর বক্তব্যের পর সম্মাননা পাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কয়েকজন একাত্তরের স্মৃতিচারণ করেন এবং তাদের সম্মানিত করায় চ্যানেল আই ও মুকিত মজুমদার বাবুকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। চেতনা চত্বরের অস্থায়ী মঞ্চে লাল-সবুজ বসনে শিল্পীরা গানে গানে সুরের মুর্ছনায় মাতান বিজয়ের সকাল।

দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন চ্যানেল আইয়ের নিয়মিত শিল্পীরা। দলীয় নৃত্যে বাংলার ছন্দ-তরঙ্গের সাবলীল উপস্থাপনা মুগ্ধতা ছড়ায়।

সুরের আবেশে ছাতিম তলায় আরেক দিকে ক্যানভাসে তুলির আঁচড়ে বিজয়ের বিমূর্তচিত্র ফুঁটিতে তুলতে থাকেন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পীরা।

বিজয় দিবসের আয়োজনে এবার বাড়তিমাত্রা যোগ করেছিল প্রকৃতি ও জীবন মিউজিক ক্লাবের সংগীত শিল্পীদের দলীয় পরিবেশনা। দারুণ শক্তি জাগানো আধুনিক দেশাত্মোধক গান এবং গণসংগীত গেয়ে ক্লাবের শিল্পীরা দর্শক-শ্রোতাকে বিজয়ের উৎসবে আবিষ্ট করেন।

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে উপস্থিত ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক ও দেশের সংগীতাঙ্গনের নক্ষত্র রফিকুল আলম এবং গান পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী খুরশিদ আলম।

অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন বরেণ্য অভিনয়শিল্পী এবং আবৃত্তিকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। এরপর মঞ্চে আসেন আরেক গুণী আবৃত্তিশিল্পী শিমুল পারভীন।

এক পর্যায়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন। তিনি বলেন , ‘মহান বিজয় দিবসের এই আয়োজনের জন্য চ্যানেল আইকে ধন্যবাদ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম বহু আত্মত্যাগে পাওয়া এই দেশ, এই মাতৃভূমি। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য পালন আমাদের দায়িত্ব, এই দায়িত্ব পালনে আমরা বার বার পরীক্ষা দিয়েছি।

যতবার আমরা রক্ত দিয়েছি ততোবার আমরা গণতন্ত্র রক্ষার শপথ করেছি। আমরা জানি না গণতন্ত্র রক্ষা করতে জাতিকে আর কতবার রক্ত দিতে হবে। আমরা রক্ত দিতে চাই, তবে সেই রক্ত যেন বিফলে না যায়।’

চ্যানেল আই, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বিজয় দিবসের এই বিশেষ আয়োজনে সার্বিক সহায়তা দিয়েছে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী। তিনি আগামীতেও চ্যানেল আইয়ের এমন আয়োজনে পাশে থাকার কথা জানান।
বেলা ১টার পর সম্মিলিতভাবে দেশের গান গেয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানেন আগত শিল্পী-অতিথিরা।
নাসিমুল শুভ 




















