আজ বিশ্ব হাতি দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘মাতৃপতি এবং স্মৃতি’। হাতি সংরক্ষণের তাগিদে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। অথচ বাংলাদেশে বন্য হাতির টিকে থাকাই আজ চরম হুমকির মুখে। বনভূমি ধ্বংস, করিডোর বন্ধ, খাদ্য সংকট এবং মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বের কারণে এশীয় হাতিরা বর্তমানে সংকটময় অবস্থায়।
দিনে দিনে বনাঞ্চলে মানুষের দখলদারিত্ব ও তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ ফলে সংকুচিত হয়ে আসছে বিশালদেহী বন্যপ্রাণী হাতির চলাচলের পথ। নিজের বিচরণভূমির সংকোচন, বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে উদ্ভিজ্জসহ খাদ্য সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে হরহামেশাই লোকালয়ে চলে আসছে এ প্রাণীটি। এদিকে জনবসতি, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও গাছপালা ‘বিনষ্টের’ দায়ে মানুষই নির্বিচারে হাতি হত্যা করছে। এমনকি বৈদ্যুতিক শক দিয়েও মারা হয়েছে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা এই বন্যপ্রাণীগুলোকে।

এর মধ্যেই গত রোববার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে একটি হাতির পা উড়ে গেছে। এমনি এক সময়ে আজ মঙ্গলবার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ওয়ার্ল্ড এলিফ্যান্ট ডে বা বিশ্ব হাতি দিবস।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর,জামালপুর এবং পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তর চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে মূলত হাতির দেখা পাওয়া যায়। কক্সবাজার, শেরপুরের ঝিনাইগাতী এলাকায় হাতির ছোট ছোট পাল প্রায়ই দেখা যায়। ধারণা করা হয়, মানববসতী স্থাপনের বহু আগে থেকেই এই অঞ্চলগুলোতে হাতির বসবাস-পদচারণা। তবে আজ এই হাতিরা যেন নিজভূমে পরবাসী।
কক্সবাজার বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলায় প্রায় ২০০টি বন্য হাতি রয়েছে। অথচ ১০ বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল ৩০০-এর বেশি। গত এক দশকে কেবল কক্সবাজার জেলাতেই হাতির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন ৬২ জন মানুষ, আর বিদ্যুৎস্পৃষ্টসহ নানা কারণে মারা গেছে অন্তত ৩৩টি হাতি।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এসব হাতি ‘অস্থায়ী’ হিসেবে বিবেচিত হয়। হাতির সংখ্যা গণনায় এদের ধরা হয়নি। বছর কয়েক আগে এরা ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসে। তবে ২০১৯ সালের পর থেকে ভারত সীমান্তে ‘হাতি চলাচলের পথ’ বন্ধ থাকায় তারা আর ফিরতে পারেনি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপন এবং দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্পের কারণে উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলের বহু পাহাড় কেটে বসতি গড়ে উঠেছে। এতে বন্ধ হয়ে গেছে একাধিক প্রাকৃতিক করিডোর।
কক্সবাজারে হাতিরা নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য উৎস হারিয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী ভারত ও মিয়ানমারে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলে অস্থায়ী হাতির পাল খাদ্যের জন্য লোকালয়ে আসছে। আধপাকা ধান, কাঁঠাল পাকার মৌসুমে হাতির সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব দিন দিন চরম হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পর্যাপ্ত সংখ্যক হাতি ব্যবস্থাপনা কর্মী (ইআরটি) নিয়োজিত করাসহ একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ইআরটি সাধারণত স্থানীয়দের নিয়েই গঠিত হয় এবং তারা হাতি সম্পর্কিত সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন, হাতির দলের চলাচল সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, হাতি সংরক্ষণে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানবিক আচরণ সম্পর্কে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি।
পরিবেশের প্রকৌশলী হিসেবে পরিচিত হাতি রক্ষায় বিশ্বজুড়ে সচেতনতা গড়তে ২০১২ সাল থেকে পালিত হচ্ছে বিশ্ব হাতি দিবস। বিশেষ করে এশীয় ও আফ্রিকান হাতির সুরক্ষা, সংরক্ষণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই দিবস। ২০১২ সাল থেকে ১২ আগস্ট দিনটি পালিত হয়ে আসছে। কানাডার দুই চলচ্চিত্র নির্মাতা প্যাট্রিসিয়া সিমস, মাইকেল ক্লার্ক এবং থাইল্যান্ডের রিইন্ট্রোডাকশন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মূলত হাতি দিবস পালনের ধারণাটি বিশ্বব্যাপী বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















