৬ মাস পর্যন্ত শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়টায় শিশুর পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মায়ের দুধের মাধ্যমেই সবচেয়ে ভালোভাবে তৈরি হয়। পরিমিত প্রোটিন, ভিটামিন ও রোগপ্রতিরোধ উপাদানের সংমিশ্রণে বুকের দুধ শিশুর জন্য সবচেয়ে আদর্শ খাবার। শিশুকে করে তোলে সুস্থ, সজীব ও রোগপ্রতিরোধক্ষম এবং গড়ে তোলে একটি মজবুত ভবিষ্যতের ভিত্তি। শিশুদের জন্য মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই। এর গুরুত্ব তুলে ধরা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য ওয়ার্ল্ড ব্রেস্টফিডিং ট্রেন্ডস ইনিশিয়েটিভ (ডব্লিউবিটিআই) প্রতিবছর আগস্টের প্রথম সপ্তাহ বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ হিসেবে সারাবিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হয়। এ বছরে দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো : ‘টেকসই সহায়তাব্যবস্থা তৈরি করুন’, যা বোঝায়- শুধু সচেতনতাই নয়, শিশুকে দুগ্ধপানে চাই মায়েদের সহায়ক পরিবেশ।
শালদুধ কি?
শিশু জন্মের পর মায়ের বুকে প্রথম যে দুধ আসে, এটিকে শালদুধ বলা হয়। মায়ের দুধ শিশুর অধিকার। জন্মের পর শিশু সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে পুষ্টির দরকার, এর সবই মায়ের দুধে আছে। তাই মায়ের বুকের দুধই শিশুর শ্রেষ্ঠ খাবার। শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও দৈহিক গঠনে মায়ের দুধের অপরিহার্যতা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। মায়ের বুকের দুধে ল্যাকটোজ নামক বিশেষ এক ধরনের শর্করা আছে, যা শিশুর শরীরে উপকারী ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টি করে। এটি শিশুর হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। শিশুর প্রথম পুষ্টির জোগানও আসে মাতৃদুগ্ধ থেকেই।

মায়ের দুধ কেন প্রয়োজন, তার কিছু প্রধান কারণ নিচে দেওয়া হলো:
১. সঠিক পুষ্টির উৎস
মায়ের দুধে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান, যেমন – প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন এবং মিনারেল সঠিক পরিমাণে থাকে। শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে দুধের উপাদানেও পরিবর্তন আসে, যা শিশুর বর্ধনশীল চাহিদা পূরণে সাহায্য করে।
২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
বুকের দুধে অ্যান্টিবডি (immunoglobulin) থাকে যা শিশুকে সর্দি, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ইত্যাদি সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। মায়ের দুধ শিশুর প্রথম টিকা হিসেবে কাজ করে। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি, এনজাইম এবং শ্বেত রক্তকণিকা থাকে, যা শিশুকে বিভিন্ন রোগ যেমন – ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগ থেকে রক্ষা করে। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলে।
৩. মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশ
মায়ের দুধে ডিএইচএ (DHA) নামক একটি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা শিশুর মস্তিষ্কের এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। যারা মায়ের দুধ পান করে, তাদের বুদ্ধিদীপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ‘অন্য যে কোনো বিকল্প দুধের চেয়ে মায়ের দুধের পুষ্টিগুণ বহুলাংশে বেশি। একটি শিশু জন্মের সময় ১০ হাজার কোটি (১০০ বিলিয়ন) মস্তিষ্ক কোষ নিয়ে আসে, যার ৯৫ শতাংশ সংযোগ হয় জন্মের প্রথম তিন বছরে। এই সময়টিতে মায়ের দুধ শিশুর মস্তিষ্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৪. হজমে সহজ
মায়ের দুধ শিশুর অপরিণত পাকস্থলী এবং অন্ত্রের জন্য সহজে হজমযোগ্য। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেট খারাপের মতো সমস্যা থেকে শিশুকে রক্ষা করে।
৫. মা ও শিশুর বন্ধন
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মা ও শিশুর মধ্যে এক বিশেষ বন্ধন তৈরি হয়। এই শারীরিক ঘনিষ্ঠতা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশে এবং মা-বাবার প্রতি আস্থা তৈরিতে সাহায্য করে।
৬. পূর্ণ পুষ্টি সরবরাহ করে
মায়ের দুধে শিশুর প্রথম ৬ মাসের জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান (প্রোটিন, চর্বি, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন, মিনারেল) সঠিক অনুপাতে থাকে। শিশুর হজম ক্ষমতার সাথে পুরোপুরি মানানসই।
৭. মানসিক বন্ধন (Bonding)
দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের স্পর্শ ও চোখের যোগাযোগ শিশুর মানসিক নিরাপত্তা ও আবেগীয় বিকাশে সহায়তা করে।
৮. রোগের ঝুঁকি কমায়
শিশুর পরবর্তী জীবনে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, এলার্জি, অ্যাজমা, হৃদরোগ ইত্যাদির ঝুঁকি কমায়।
৯. নিরাপদ ও সবসময় প্রস্তুত
বুকের দুধ জীবাণুমুক্ত, সঠিক তাপমাত্রায় থাকে এবং অর্থ খরচ হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF) এর সুপারিশ অনুযায়ী, শিশুর জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরু করা এবং প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করা জরুরি। এমনকি ৬ মাস পর্যন্ত শিশুর জন্য আলাদা করে কোনো পানিও খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই, কারণ বুকের দুধে পর্যাপ্ত পানি থাকে। শিশুর দ্রুত বৃদ্ধি, শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও দৈহিক গঠনে মায়ের দুধের অপরিহার্যতা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। আমাদের সুস্থ শিশু ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সব শিশুকে মায়ের দুধ পান করানো এবং ঘরে তৈরি পরিপূরক খাবার খাওয়ানোর হার বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে গুঁড়া দুধ বা কৌটাজাত শিশুখাদ্যের ব্যবহার ও বিজ্ঞাপন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















