২০২৪ সালের সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি পাওয়া গেছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৯.৬৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে। জরিপে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি আশা জাগালেও বাংলার বাঘ এখনো উচ্চ ঝুঁকিতে।
বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে সুন্দরবনে। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য সংকট ও চোরাশিকারিদের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে এই বনের রাজা, মহাবিপন্ন বেঙ্গল টাইগার।
গত ২৫ বছরে (২০০১–২০২৫) সুন্দরবনে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৯১টি বাঘ। এর মধ্যে ৫৮টি বাঘ পিটিয়ে বা শিকার করে হত্যা করা হয়েছে, ৩০টি বাঘ স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে এবং ৩টি প্রাণ হারিয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে। ভয়াবহ এই চিত্রই সামনে এসেছে ২৯ জুলাই আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসে।
বন উজাড়, অবৈধ চোরা শিকারসহ আরও নানা কারণে বাংলাদেশের জাতীয় পশু ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটিকে প্রতিনিধিত্ব করা বাঘ এখন মহা-বিপন্নের তালিকায় রয়েছে। এশিয়ার মধ্যে বেঙ্গল টাইগারের বৃহত্তম আবাসভূমি সুন্দরবন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এই বনকে তাদের বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ করা যায়নি।

সুন্দরবনে বাঘের যেসব ঝুঁকি
চোরা শিকারির ফাঁদ
চোরা শিকারিদের কারণে হরিণশুন্য হচ্ছে সুন্দরবন। বিভিন্ন স্থানে পেতে রাখা হচ্ছে লোহার তারের ফাঁদ। আটকা পড়ছে হরিণ, বাঘ-শাবকসহ বন্য প্রাণী। গত তিন মাসে এমন প্রায় চার হাজার ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। বরগুনার পাথরঘাটা এলাকায় সক্রিয় প্রায় দেড়শ শিকারি। বাঘ রক্ষায় এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান প্রাণী গবেষকদের।
বনের হরিণ, শুকর ও বানর বাঘের প্রধান খাবার। সেখানেও চোরা শিকারিদের থাবা। পর্ব সুন্দরবনে প্রায় প্রতিদিনই জব্দ করা হচ্ছে তাদের পেতে রাখা ফাঁদ। বন বিভাগ জানায়, তিন মাসে হরিণ শিকারে চার হাজার মালা ফাঁদ জব্দ হয়েছে। শুধু হরিণ-ই নয় ধরা পড়ছে বন্য অন্য প্রাণীও। আর সবচেয়ে বেশি চোরা শিকারি বরগুনার পাথরঘাটায়।

সুন্দরবন (পূর্ব) রেঞ্জের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘দাগী–চোরা শিকারীদের শনাক্ত করেছি। তাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে। চক্রই আছে, তারা সুন্দরবনে শিকার করছে। তারা তার ব্যবহার করছে।’

আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের কাছে বন্যপ্রাণীর অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনের বরাতে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের একটি বড় অংশের উৎস সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা। পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের তালিকায় রয়েছে বাঘ, কুমির, হরিণ, সাপ, তক্ষক, কচ্ছপ ও হাঙ্গর।
খাদ্য সংকট
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, বাঘের খাদ্য চাহিদার প্রায় ৭৮ শতাংশই পূরণ হয় হরিণ শিকার করে। অথচ সুন্দরবনে হরিণই নিরাপদ নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ জানান, সুন্দরবনে বাঘ যত খাবার খায় তার সিংহভাগ চিত্রা হরিণ থেকে আসে। এই প্রাণী কমে গেলে সংকট আরও বাড়বে। ফলে হরিণ সংরক্ষণে জোর দিতে হবে।

তিনি আরও জানান ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনে চিত্রা হরিণের আনুমানিক সংখ্যা এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি। বাঘের দ্বিতীয় প্রধান খাবার বন্য শূকরের আনুমানিক সংখ্যাও ৪৭ হাজার ৫১৫টি। তবে মানুষ নিয়মিত সেখান হরিণ শিকার করছে।
বিষ দিয়ে মাছ শিকার
সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার বেড়েছে। বনের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ছে এর প্রভাব। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র রক্ষায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন গবেষকরা।

বিষ দিয়ে অনবরত মাছ নিধন হচ্ছে। এই পানি পান করে বাঘ যেমন অসুস্থ হচ্ছে তেমনি বনের জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বন ও বন্যপ্রাণীতে পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন
গত বছরের ১৪ মে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষকদের এক সমীক্ষায় সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রের স্তর এবং জলবায়ু পরিবর্তন ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে বিশেষত বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগার আগামী ৫০ বছরের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বারবার জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ছে সুন্দরবনে। ফলে বনের পুকুর ও জলাশয়ে মিঠাপানির অভাব দেখা দিয়েছে। এতে খাদ্য শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটছে। প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হরিণ, বন্য শূকর, বানরসহ অন্যান্য প্রাণী কমে যাচ্ছে।

গঙ্গার পানি কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ দিন দিন কমছে। ফলে বনের বৈচিত্র্য কমছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নেতিবাচক পরিবর্তন আসছে। বাঘের আবাসের বৈচিত্র্য আসছে। জলোচ্ছ্বাস বা ঘূর্ণিঝড় হলে বাঘ ও হরিণ অনেক হুমকির মুখে পড়ে। এজন্য বন বিভাগ উঁচু টিলা করেছে, পুকুর করেছে। কিন্তু সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় কতটা কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং বিশ্ব থেকে উল্লেখজনক হারে সব প্রজাতির বাঘ কমতে থাকায় ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রথমবারের মতো বাঘ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।
সেখানে অংশ নেয় বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ। ওই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বে বাঘের সংখ্যা এক যুগের মধ্যে দ্বিগুণ করা।
বাংলাদেশের ভেতরে সুন্দরবনের আয়তন ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বনের চার হাজার কিলোমিটার ডাঙ্গায় বাঘের আবাস। গবেষকদের হিসাবে এ এলাকায় সর্বোচ্চ চার শ বাঘ বেঁচে থাকতে পারে। তবে ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী বনে বাঘ আছে ১২৫টি। অর্থাৎ এখনো লক্ষ্যপূরণে বেশ পিছিয়েই রয়েছে বাংলাদেশ।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক স্পেশাল 




















