বাঙালি সমাজে সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্ব আমরা সাধারণত মায়ের কাঁধেই চাপিয়ে দেই। যদিও সন্তান গর্ভে ধারণ এরপর লালন-পালনে যত্ন-আত্তিতে মায়ের তুলনা হয় না। কিন্তু সন্তানের মানসিক বিকাশে মায়ের মতোই বাবারও যে বিশাল প্রভাব রয়েছে। পাশ্চাত্য সমাজে সন্তানের মানসিক বিকাশে বাবার ভূমিকাই মুখ্য। মায়ের মতো বাবাও সন্তানের জীবনে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে থাকে। বাবার ভালোবাসা, সমর্থন এবং দিকনির্দেশনা একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। বাবা শুধু পরিবারের মাথা নন, তিনি সন্তানের নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস এবং মূল্যবোধ গঠনের অন্যতম হাতিয়ার। একজন বাবা শিশুকে সমৃদ্ধ করে, ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে।

তাহলে সন্তানের মানসিক বিকাশে বাবার সঙ্গ কেন জরুরি?
আত্মবিশ্বাস স্থাপন: বাবারা যখন পাশে থাকে তখন সন্তান নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে। এই নিরাপত্তার অনুভূতি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। বাবার উৎসাহ সন্তানের নিজের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে সাহায্য করে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণ: বাবারা খেলাধুলার মাধ্যমে সন্তানদের সাথে মিশে থাকে। এর মধ্য দিয়ে শিশুরা সামাজিক রীতিনীতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সমস্যা সমাধানের কৌশল শিখে ফেলে।
সমস্যা সমাধানের কৌশল: যখন কোনো সমস্যা হয়, বাবা কীভাবে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তা দেখে সন্তান শেখে। বাবারা তাদের যৌক্তিক চিন্তাভাবনার মাধ্যমে সন্তানদের সমস্যা সমাধানের নতুন উপায় শেখায়। যা তাদের মানসিক বিকাশে সহায়ক।
মানসিক বিকাশ: শিশুর মানসিক বিকাশে বাবার উপস্থিতি একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। যখন বাবা সন্তানের সঙ্গে খেলাধূলা করেন, বই পড়েন, গল্প শুনান তখন শিশুর মধ্যে গভীর আবেগ তৈরি হয়। এটি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে দৃঢ করে।
বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ: বাবা পড়াশোনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকলে শিশু ভালো ফলাফল করে। একজন বাবা যখন সন্তানের হোমওয়ার্কে সাহায্য করেন, সমস্যার সমাধান শেখান, তখন শিশুর কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায়। বাবার জীবনের অভিজ্ঞতা পাঠ্যপুস্তকের বাইরের জ্ঞান হিসেবে সন্তানের চিন্তাধারাকে সমৃদ্ধ করে। এভাবে বাবা হয়ে ওঠেন সন্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এক অমূল্য পথপ্রদর্শক।
মূল্যবোধ শেখানো: শিশুর চরিত্র গঠনে বাবার প্রভাব গভীর। শিশুরা মা-বাবাকে অনুকরণ করে শেখে। বাবার সততা, দায়িত্বশীলতা, ধৈর্য আর পরিশ্রমী মনোভাব অজান্তেই সন্তানের জীবনে প্রবেশ করে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, অন্যকে সম্মান করা কিংবা বিপদের সময় স্থির থাকা এসব মূল্যবোধ শিশুরা আত্মস্থ করে। বাবার প্রতিটি আচরণ সন্তানের জন্য নীরব শিক্ষা হয়ে থাকে।
পুত্র ও কন্যার জীবনে বাবার আলাদা প্রভাব: বাবার ভূমিকা কন্যা ও পুত্র সন্তানের জীবনে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। কন্যাশিশুর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস গঠনে বাবার স্নেহ ও শ্রদ্ধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ছেলের জন্য বাবা হয়ে ওঠেন দায়িত্বশীলতা, আত্মনির্ভরতা ও নেতৃত্ব গুণের জীবন্ত উদাহরণ। কীভাবে পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব নিতে হয় বাবাকে দেখে ছেলে শেখে। ফলে বাবার উপস্থিতি ছেলে ও মেয়ের জীবনেই ভিন্নভাবে শক্তি জোগায়।
সবশেষে, সন্তানের মানসিক বিকাশে বাবার ভূমিকা কেবল আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই সন্তানের মানসিক বিকাশে বাবার ভূমিকা কেবল ভরণ-পোষণ নয়। নিয়মিত সময় দেওয়া, খোঁজখবর নেওয়া, খেলাধূলায় অংশ নেওয়া, কথা শোনা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা এসবই সমানভাবে জরুরি। একজন বাবা যখন সন্তানের সাথে বন্ধুর মত মিশে, কথা শোনেন এবং তাকে বোঝেন তখন সেই সন্তান মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এজন্য প্রতিটি বাবার উচিত সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা। সন্তানের মানসিক বিকাশে বাবার সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা উচিত। বাবাদের উপস্থিতি ও সঙ্গ লাভে সন্তানের মানসিক উন্নতি সাধন হলে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি হবে। আসুন, আমরা সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেই। তারা বিপথগামী হবে না।
মাসুদুর রহমান 
























