জুলিয়েট, মধু, পুটিয়া, হাড়বাড়িয়া এবং জোংড়ার খোঁজ মিলছে না, ওরা সুন্দরবনের লোনাপানির কুমির। এতদিন এক বিশেষ গবেষণার অংশ হয়ে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার নিয়ে সুন্দরবনের বিস্তৃত এলাকার জলাশয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে ওরা। কিন্তু লোনাপানির সংস্পর্শে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বিকল অথবা অন্য কোনো কারণে আর ওদের অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না।
দেখা গেছে, জুলিয়েটের স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার ৭১ দিন, মধুর ১২৭ দিন, পুটিয়ার ৮৩ দিন, হাড়বাড়িয়ার ৫২ দিন এবং জোংড়ার ট্রান্সমিটার ৬৪ দিন সচল ছিল। ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল পুটিয়ার সবশেষ উপস্থিতি জানা গেছে। এর আগে গতবছর জুলাই মাসে অন্য ৪টির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।
‘নিখোঁজ’ হওয়ার আগের প্রাপ্ত তথ্য বলছে, পিঠে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার নিয়ে প্রায় এক হাজার ৪৬ কিলোমিটার নৌপথ ঘুরেছে সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়া ৫টি কুমির। ধারণা করা হচ্ছে, লবণাক্ততার কারণে স্যাটেলাইট নষ্ট হওয়ায় বনবিভাগের সঙ্গে কুমিরগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে কুমিরগুলোর বর্তমান অবস্থান জানতে পারেনি বনবিভাগ।

তবে আশার কথা এতটুকু যে, ট্রান্সমিটার সচল থাকা অবস্থায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সুন্দরবনের কুমিরের অধিক্ষেত্র, বিচরণ সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি ধারণা পেয়েছেন গবেষকরা। এর মধ্য দিয়ে আগামীতে বিলুপ্তপ্রায় নোনা পানির কুমির রক্ষায় নানা পদক্ষেপ গ্রহণের আশা করছেন তারা। এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সমকাল পত্রিকার অনলাইন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: সুন্দরবনে কুমিরের জীবনাচরণ সম্পর্কে জানতে ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ প্রথমবারের দুটি কুমিরের শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার স্থাপন করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও তিনটি কুমিরের শরীরে স্যাটেলাইট স্থাপন করে সুন্দরবনের খালে ছাড়া হয়।
সর্বনিম্ন ৫২ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১২৭ দিন পর্যন্ত স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটারগুলো সচল ছিল। এই সময়ের মধ্যে কুমিরগুলো ১ হাজার ৪৬ কিলোমিটার নৌপথ ঘুরেছে। ৪টি কুমির সুন্দরবনের ভেতরে নির্ধারিত এলাকায় পৃথকভাবে ঘোরাফেরা করেছে। জোংড়া নামের একটি কুমির বাগেরহাট, বরিশাল, পিরোজপুর ঘুরে আবার সুন্দরবনে ফিরে এসেছে। শিকার ধরা, খাবার, ডিমপাড়ার জন্য কুমিরগুলো ২৪ ঘণ্টায় প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার এলাকায় ঘোরাঘুরি করে।

গবেষণা: বাংলাদেশে সুন্দরবন ছাড়া অন্য কোথাও লোনা পানির কুমির দেখা যায় না। বনবিভাগের ২০১৭ সালের জরিপে অনুযায়ী সুন্দরবনে লোনা পানির কুমির রয়েছে ১৫০-২১০টি। এই প্রজাতির কুমিরের বংশবিস্তার দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) লোনা পানির কুমিরকে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কুমিরের সংখ্যা বাড়াতে ২০০২ সুন্দরবনের করমজলে তৈরি করা হয় ‘কুমির প্রজনন কেন্দ্র’। বর্তমানে সেখানে ৯২টি কুমির রয়েছে। প্রজনন কেন্দ্রে জন্ম নেওয়া ২০৯টি কুমির বিভিন্ন সময় সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে অবমুক্ত করা হয়।
বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, ‘কুমিরের জীবনাচরণ কেমন, কতো জায়গা নিয়ে তারা ঘোরাফেরা করে, কতদূর পর্যন্ত বিচরণ করে, এক জায়গায় কত সময় থাকে, সুন্দরবনের বাইরে যায় কিনা-এসব নিয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই। মূলত এসব বিষয় জানতেই গবেষণার সিদ্ধান্ত হয়।’

গবেষণা কাজে নেতৃত্ব দিয়েছে আইইউসিএনের বাংলাদেশ টিম। তাদের সহযোগিতা করছে জার্মান ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকনোমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (জিআইজেড)। আইইউএসএনের ‘ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অব সুন্দরবন ম্যানগ্রোভস অ্যান্ড দ্যা মেরিন প্রোটেকটেড এরিয়া সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় এ গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















