বয়স যতই হোক না কেন হৃদরোগের ঝুঁকি এখন সবার জন্যই প্রাসঙ্গিক। সাধারণত আমরা কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ বা ধমনি ব্লকেজের মতো বিষয়গুলোকেই হার্টের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখি। কিন্তু এর বাইরেও আছে আরেক বিপজ্জনক উপাদান যেমন, উচ্চ পটাসিয়াম বা হাইপারক্যালেমিয়া। যা নীরবে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পটাসিয়াম শরীরের জন্য অপরিহার্য একটি খনিজ। এটি হৃদযন্ত্রের ইলেকট্রিক্যাল ছন্দ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তবে শরীরে এর মাত্রা সামান্য বেড়ে গেলেও সমস্যা হতে পারে। পটাসিয়ামের ভারসাম্যহীনতা থেকে অ্যারিথমিয়া (হৃদস্পন্দনের অনিয়ম) এমনকি হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট পর্যন্ত হতে পারে।
হার্টকে সুস্থ ও শক্তিশালী রাখতে পটাসিয়াম (Potassium) খুবই জরুরি একটি খনিজ। আমাদের শরীরের কোষ, স্নায়ু এবং পেশি সব কিছুর স্বাভাবিক কাজের জন্যই এটি অপরিহার্য। বিশেষ করে হৃদ্পিণ্ড (Heart) সুস্থ রাখতে পটাসিয়ামের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
কেন পটাসিয়াম হার্টের জন্য জরুরি?
হৃদ্পেশির সংকোচন নিয়ন্ত্রণ করে। হার্ট একধরনের পেশি। এর নিয়মিত সংকোচন ও প্রসারণের জন্য পটাসিয়াম প্রয়োজন। পটাসিয়াম না থাকলে হার্টের ছন্দ (heartbeat) অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পটাসিয়াম শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম (লবণ) বের করতে সাহায্য করে। এতে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে, ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে। পটাশিয়াম শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইলেক্ট্রোলাইট। এটি কোষের মধ্যে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং বৈদ্যুতিক সংকেত পরিবহনে সহায়তা করে। হার্টের পেশিগুলোর স্বাভাবিক সংকোচনের জন্য এই বৈদ্যুতিক সংকেত অত্যন্ত জরুরি। পটাশিয়ামের ঘাটতি হলে হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হতে পারে, যা “অ্যারিদমিয়া” নামে পরিচিত। এটি একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা হৃদরোগের কারণ হতে পারে।শরীরে সোডিয়াম-পটাসিয়ামের ভারসাম্য ঠিক থাকলে স্নায়ু ও পেশি ঠিকমতো কাজ করে। ভারসাম্য নষ্ট হলে হৃদ্স্পন্দন (arrhythmia) সমস্যা হতে পারে। স্ট্রোক প্রতিরোধে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে পর্যাপ্ত পটাসিয়াম গ্রহণ করলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়।
পটাসিয়াম ঘাটতির লক্ষণ
- অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন
- পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া
- উচ্চ রক্তচাপ
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
হঠাৎ পটাসিয়াম বেড়ে যায় কেন?
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকেই নিয়মিত কলা ও আলু খান, যা পটাসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার। এই ফল ও সবজি খাওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। তবে যাদের কিডনি সমস্যা, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের জন্য এটি হতে পারে বিপদের কারণ। কারণ শরীর থেকে অতিরিক্ত পটাসিয়াম বের করে দেওয়ার দায়িত্ব কিডনির, আর যদি কিডনি ভালোভাবে কাজ না করে, তাহলে পটাসিয়াম জমে যেতে পারে শরীরে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা, বিশেষ করে ডায়াবেটিসজনিত কিডনি সমস্যায় ভোগা রোগীরা, উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা, রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা কিছু অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণকারী ব্যক্তিরা। তবে যাদের কিডনির সমস্যা আছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত পটাসিয়াম ক্ষতিকর হতে পারে। তাই প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাওয়া উচিত।
কোন খাবারে থাকে বেশি পটাসিয়াম?
পটাসিয়ামের ভালো উৎস যেমন; কলা, আপেল, কমলালেবু, অ্যাভোকাডো, শাকসবজি, টমেটো, যেমন- পালং শাক, কুমড়া, বেগুন, শসা, আলু, মিষ্টি আলু, গাজর, ডাল-শিম-শুঁটিজাতীয় খাবার, এপ্রিকট, ডাবের পানি, টুনা, স্যামন মাছ, এবং অন্যান্য শুকনো ফল।
করণীয় কী?
নিজে থেকে কখনো পটাসিয়াম সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। যদি আগে থেকেই কিডনি বা হৃদরোগ থাকে, তবে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ডায়েট থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বাদ দেবেন না, কিন্তু সচেতন থাকা ভালো।
পটাসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার কিভাবে ও কতটুকু খাবেন, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করুন। হাইপারক্যালেমিয়া এখনো অনেকের কাছেই অপরিচিত একটি শব্দ, কিন্তু এর প্রভাব হতে পারে ভয়ানক। হার্টের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে চাইলে শুধু কোলেস্টেরল নয়, পটাসিয়ামের দিকেও নজর রাখা জরুরি। কারণ, এই নীরব ঘাতক যে কখন ছোবল মারবে, তা বোঝার সুযোগ না-ও থাকতে পারে। মনে রাখা জরুরি, শুধু স্বাস্থ্যকর খাবার খেলেই হবে না, এর সাথে নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও হার্টকে ভালো রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















