পৌষের হিমে কাঁপছে দেশ, কাঁপছে রাজধানী। তবে এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বদলাতে থাকা বাংলার ষড়ঋতু যখন বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে তখন এমন শীত অনুভব করতে পারাটা ইতিবাচকভাবে নেয়াই ভালো। প্রকৃতি রক্ষিত হলে ঋতুর রূপ এমনই হওয়ার কথা। বন উজাড়, দখল-দূষণের দেশে এখনো যতটুকু সবুজ প্রকৃতি টিকে আছে তা আসলে স্রষ্টার কৃপা, হাতে গোণা কয়েক গণমাধ্যমের অনবরত নির্লোভ-প্রচারণা এবং কিছু প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের অব্যাহত প্রচেষ্টার ফল। প্রকৃতি সংরক্ষণে নিবেদিত প্রাণ এমন মানুষদের প্রতিবছর সম্মাননা জানিয়ে আসছে প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবুর প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং লাল-সবুজের চ্যানেল আই।

প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবার পৌষের হিমেল সন্ধ্যায় জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে চ্যানেল আই প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক ২০২৫’ প্রদান অনুষ্ঠান। উদ্ভাবনী-পরিবেশবান্ধব এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, প্রান্তিক মানুষের পাশে থাকা এবং সবুজায়নে কাজ করে যাওয়া সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান ফ্রেন্ডশিপ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খানের হাতে ‘প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন-চ্যানেল আই প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক ২০২৫’ তুলে দেওয়া হয়।
এর মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক মানুষের জন্য টেকসই উন্নয়নে কাজ করা ফ্রেন্ডশিপের রুনা খানের পরম আন্তরিকতাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জানানো হলো। চরাঞ্চলের জীবনমান উন্নত করতে আন্তরিক মানুষটির হাতে পদক তুলে দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য এই বাৎসরিক আয়োজন উপলক্ষ্যে আজ সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁও শহীদ তাজউদ্দিন স্মরণীতে চ্যানেল আইয়ের “চেতনা চত্বর” সেজেছিল সবুজ গাছগাছালি এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণে তৈরি বাংলাদেশের মানচিত্রশোভিত মঞ্চে। লাল-সবুজ আলোর নাচন, সঙ্গীত-নৃত্যের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায় এই জমকালো অনুষ্ঠান পরিণত হয়েছিল প্রকৃতিপ্রেমী এবং পরিবেশকর্মীদের মিলনমেলায়।

পৌষের কনকনে শীতের সন্ধ্যায় প্রতিশ্রুত সময়ে চ্যানেল আইয়ের চেতনা চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানস্থলে আসেন আয়োজনের মধ্যমণি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। স্বাগত জানান প্রকৃতিবন্ধু মুকিত মজুমদার বাবু এবং প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন টিম। এরপরেই শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা।

অনুষ্ঠানের শুরু হয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে, আগতরা গলা মেলান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানে।

বাংলার প্রাণ-প্রকৃতির মায়াভরা এই গান শেষে মনোজ্ঞ নৃত্য পরিবেশন করেন শিশু ও নবীনদের সম্মিলিত একটি দল।

এরপরই প্রদর্শিত হয় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের কর্মযজ্ঞ নিয়ে একটি তথ্যচিত্র।
মঞ্চে স্বাগত বক্তব্য জানাতে আসেন এই আয়োজনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং ইমপ্রেস গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু।
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা শুরুতেই সবাইকে বিজয় মাসের শুভেচ্ছা এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতির ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। দেশের প্রতি, দেশের প্রকৃতি-পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেন।
প্রকৃতিবন্ধু বলেন,’বাংলাদেশের বয়স বেড়ে যাচ্ছে কিন্তু দু:খজনক যে পরিবেশের অবস্থাও দিন দিন শোচনীয় হচ্ছে। এখনি সচেতন না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি দুর্বিষহ অবস্থার সম্মুখীন হবে। এজন্য দেশকে ভালো রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।’

এই পদক প্রদান অনুষ্ঠানের দর্শনগত জায়গাটি স্পষ্ট করে তিনি বলেন,’এটি শুধুমাত্র একটি পদক প্রদানের অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের প্রকৃতি, প্রাকৃতিক ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রতি আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতার একটি প্রতীকী উপলক্ষ্য। যে ব্যক্তিরা সাহসী নেতৃত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃতি সংরক্ষণ করছেন তাদেরকে আমরা এই পদকের মাধ্যমে সম্মান জানাতে চাই।’
এরপর মুকিত মজুমদার বাবু এবারের প্রকৃতি সংরক্ষণ পদকের জন্য রুনা খানের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
এবারের পদক প্রদান অনুষ্ঠানের বাড়তি আকর্ষণ ছিল প্রকৃতি ও জীবন মিউজিক ক্লাবের ‘বৃক্ষ মায়া’ মিউজিক ভিডিওর প্রিমিয়ার প্রদর্শনী। মিউজিক ভিডিওটি প্রধান অতিথিসহ আগতরা উপভোগ করেন।

অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খানের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদশর্ন করা হয়।
এরপর অনুষ্ঠানের সভাপতি মুকিত মজুমদার বাবু, প্রধান অতিথি এবং অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বিশেষ অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ এবং সম্মানিত অতিথি প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসেন চৌধুরী মঞ্চে রুনা খানের হাতে প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক,ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা সম্মানির প্রতীকী চেক এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটালের পক্ষ থেকে আজীবন চিকিৎসা সনদ তুলে দেন।

পদক প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় দেশ-বিদেশে সুপরিচিত ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান স্বভাব সুলভ হাস্যোজ্জ্বল মুখে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং চ্যানেল আইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপের কর্মকাণ্ডে পাশে থাকায় উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

তীব্র ঠান্ডা উপেক্ষা করেও ধৈর্য্য নিয়ে অনুষ্ঠানের পরিপূর্ণতা বজায় রাখেন উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই পদককে গুরুত্ববহ করে রিজওয়ানা হাসান বলেন,’দেশের মাটিতে পাওয়া সম্মান,.. দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দেয় এবং নতুন প্রজন্মের জন্য পথ দেখায়।’

তিনি রুনা খানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ফ্রেন্ডশিপের কাজ প্রমাণ করে—স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও জীবিকার সমন্বিত উদ্যোগই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি।’

পদক প্রদানের অনুষ্ঠানে বড় আরেক আনুষ্ঠানিকতা ছিল প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের ১৭ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে বিশাল এক কেক কাটা।

এদিকে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত বাড়ে, ওদিকে হিম শীত আর হাল্কা বৃষ্টির মতো কুয়াশা। তবুও দর্শকদের ধৈর্যচুত্যি নেই! আবারও দেশের গানে নাচে মাতেন দর্শকরা। নৈশভোজের মাধ্যমে শেষ হয় প্রকৃতি সংরক্ষণ পদকের এবারের আসর।
নাসিমুল শুভ 




















