হৃদরোগ শনাক্তকরণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। এই প্রযুক্তি চিকিৎসকদের কাজকে আরও সহজ এবং নির্ভুল করে তুলছে। যার ফলে রোগীরা দ্রুত এবং সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত আধুনিক স্টেথোস্কোপ মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই হৃদয়ের তিনটি গুরুতর সমস্যা শনাক্ত করতে পারে। হার্ট ফেলিওর, হার্টের ভালভের অসুখ ও অনিয়মিত হার্টবিট। ব্রিটেনের গবেষক এই আধুনিক স্টেথোস্কোপ নিয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছেন।
তারা বলছেন, এই যন্ত্রটি স্বাস্থ্যসেবায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। চিকিৎসকেরা যাতে দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে পারেন, সেজন্যই এই প্রযুক্তি। সাধারণ স্টেথোস্কোপ কেবল শব্দ শোনার জন্য ব্যবহৃত হয়। সেখানে নতুন এই যন্ত্রটি অনেক বেশি কাজ করতে সক্ষম। এটি দেখতে একটি কার্ডের মতো। একটি ছোট মাইক্রোফোন দিয়ে হার্টবিট ও রক্তপ্রবাহের সূক্ষ্ম তারতম্য শনাক্ত করা হয়। একই সঙ্গে ইসিজিও নেওয়া হয়। তারপর সেই সব তথ্য ক্লাউডে পাঠানো হয়। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তা বিশ্লেষণ করা হয়। এই ডিভাইসটি উন্নত করতে হাজার হাজার রোগীর ডেটা ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব রোগীকে এই স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল, তাদের হৃদরোগ শনাক্ত হওয়ার হার সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
ঐতিহ্যগতভাবে, হৃদরোগ নির্ণয়ের জন্য ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG), ইকোকার্ডিওগ্রাম, সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই-এর মতো পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষার ফলাফল একজন চিকিৎসককে হাতে-কলমে বিশ্লেষণ করতে হয়। কিন্তু এআই এই প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় এবং আরও কার্যকর করে তোলে। এআই মূলত মেশিন লার্নিং (Machine Learning) মডেল ব্যবহার করে। এটি বিশাল পরিমাণ ডেটা থেকে শিখতে পারে। যেমন; হাজার হাজার রোগীর ইসিজি রিপোর্ট, রক্ত পরীক্ষার ফলাফল এবং মেডিক্যাল ইমেজ। এআই-ভিত্তিক অ্যালগরিদম ইসিজি ডেটা বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক হার্টবিট বা ব্লকেজের সম্ভাবনা দ্রুত শনাক্ত করতে পারে। হৃদযন্ত্রের আল্ট্রাসাউন্ড বা এমআরআই ইমেজ এআই বিশ্লেষণ করে ব্লকেজ, ভালভের সমস্যা বা হার্টের আকারের পরিবর্তন নির্ধারণ করতে পারে। রোগীর জীবনধারা, বয়স, পূর্বের চিকিৎসা ইতিহাস এবং জিনগত তথ্য ব্যবহার করে এআই আগাম হৃদরোগের সম্ভাবনা পূর্বাভাস দিতে পারে। এই ডেটা বিশ্লেষণ করে এআই এমন কিছু প্যাটার্ন বা ধরন খুঁজে বের করে, যা মানুষের পক্ষে অনেক সময় ধরা কঠিন হয়।
আধুনিক স্টেথোস্কোপের সাহায্যে হার্ট ফেলিওর শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে ২.৩ গুণ। অনিয়মিত হার্টবিট শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে ৩.৫ গুণ। হার্টের ভালভের সমস্যা শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে ১.৯ গুণ। গবেষণাটি ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও ইমপেরিয়াল কলেজ হেলথকেয়ার ট্রাস্টের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। এতে ৯৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় ১২,০০০ রোগীকে এআই স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফল উপস্থাপন করা হয়েছে ইউরোপীয় কার্ডিওলজি সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলনে, যা বিশ্বের বৃহত্তম হার্ট কনফারেন্স।
গবেষক ও চিকিৎসকদের মতে, অনেক সময় এসব হৃদরোগ উপসর্গ ছাড়া থাকে। কেবল তখনই ধরা পড়ে, যখন রোগী সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে যান। আগেভাগেই শনাক্ত করা গেলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব, যা রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের আরো কিছু অঞ্চলে যেমন দক্ষিণ লন্ডন, সাসেক্স ও ওয়েলসেও এই ডিভাইসটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষকরা আশাবাদী, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এআই একটি সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে, যা চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তবে এআই কখনোই একজন চিকিৎসকের বিকল্প হতে পারে না। এটি শুধুমাত্র একটি সহায়ক প্রযুক্তি।
ভবিষ্যতে এআই আরও উন্নত হবে। স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়বে। তবে মনে রাখতে হবে, যেকোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও তত্ত্বাবধান একজন যোগ্য চিকিৎসকের হাতেই থাকা উচিত।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















