জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) হয়ে গেল প্রজাপতি মেলা। ‘উড়লে আকাশে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি’ স্লোগানে শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) এ মেলা হয়েছে। প্রজাপতি সম্পর্কে গণসচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর এই মেলার আয়োজন করা হয়। এবার ছিল মেলার ১৫ তম আসর। জাবি’র প্রাণিবিদ্যা বিভাগের কীটতত্ত্ব শাখা মেলার আয়োজন করে থাকে। বরাবরের মতোই এই আয়োজনে সক্রিয় ছিল প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, মিডিয়া হিসেবে পাশে ছিল চ্যানেল আই।
শুক্রবার (৫ আগস্ট) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে জহির রায়হান মিলনায়তনের সামনে মেলার উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপাচার্য বলেন, ‘প্রজাপতিসহ সব প্রাণীর প্রতি আমাদের মানবিক ও যথাযথ আচরণ করতে হবে। মানুষ হিসেবে আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে এবং এসব প্রাণী আমাদের ওপর নির্ভরশীল।’
তিনি প্রাণী সংরক্ষণে নৈতিক দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি কীটনাশকের বিকল্প টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবার ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় ও বিভাজনের কারণে সমাজে যে অবনতি হচ্ছে, সেটি দূর করতেও এগিয়ে আসার কথা বলেন উপাচার্য।
প্রজাপতি মেলা আয়োজনের শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সাল থেকে।মেলার আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রজাপতি মেলা জাবির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। আগামী প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম জাগিয়ে তুলতে এ আয়োজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। প্রজাপতি থাকলে পরাগায়ন হবে এবং আমরা পরিবেশকে ভালো রাখতে পারব।’

বরাবরের মতোই প্রকৃতির স্বাস্থ্য নির্দেশক প্রজাপতি রক্ষার এই মেলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শামীম আহমেদ বলেন, ‘প্রজাপতির কাছ থেকে আমি শিখেছি। আমি জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির জিওলজি ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট ছিলাম। প্রজাপতির জীবনকাল আসলে কত? ২ সপ্তাহ থেকে ৪ সপ্তাহ। বেশিরভাগ প্রজাপতির ২ সপ্তাহ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে জীবনকাল শেষ হয়ে যায়। এটা খুবই ছোট। তেমনি আমরা মানুষ, মানুষের জীবনকাল ৮০ বছর। কিন্তু মহাকালের হিসাবে মানুষের জীবনকাল আসলে কতটুকু? খুবই ছোট।’

প্রজাপতির কাছ থেকে শেখার দর্শন ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন , ‘এই ছোট্ট জীবনে প্রজাপতি তার সৌন্দর্য দিয়েই হোক অথবা তার যে পরাগায়ন এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমে যে ভূমিকা পালন করে, তার মাধ্যমেই আমাদের প্রকৃতি টিকে আছে, আমরা টিকে আছি, সবাই টিকে আছে। তো সেই জায়গা থেকে প্রজাপতির জীবনকে আমার কাছে অনেক সার্থক মনে হয় মানুষের জীবনের চাইতে। তো মানুষের জীবন প্রজাপতির থেকে শিক্ষা নিক, মানুষের জীবন প্রজাপতির মতোই সার্থক হয়ে উঠুক।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সোহেল আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রব, জীববিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মাফরুহি সাত্তার, মৌসুমি ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক কাজী রাজিউদ্দিন আহমেদ চপল, সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাসুম উদ্দিন খান, বন বিভাগের প্রধান বনসংরক্ষক আমীর হোসেন চৌধুরী, আইইউসিএন বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ও বন বিভাগের সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইশতিয়াক আহমেদ, জেইউসিইউর সহসভাপতি আব্দুর রশিদ জিতু এবং সাধারণ সম্পাদক মাযহারুল ইসলাম।

এ বছর পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের জন্য খ্যাতিমান বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলি রেজা খানকে বাটারফ্লাই অ্যাওয়ার্ড- ২০২৫ প্রদান করা হয়। প্রজাপতি গবেষণা ও আগ্রহের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নূরে আফসারি ও শাহরিয়ার রাব্বি তন্ময়কে বাটারফ্লাই ইয়াং এনথুসিয়াস্ট অ্যাওয়ার্ড- ২০২৫ দেওয়া হয়। আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছেন সিয়েদ আব্বাস, মাহমুদুল বারী এবং প্রিন্স পল জয়।

অনুষ্ঠানে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত বাটারফ্লাইস অফ বাংলাদেশ- টু (বইয়ের বর্ধিত সংস্করণ) এর মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা।

দিনব্যাপী এই মেলায় র্যালি, পাপেট শো, শিশুদের চিত্রাঙ্কন ও কুইজ প্রতিযোগিতা, প্রজাপতি আলোকচিত্র প্রদর্শনী, ঘুড়ি উড়ানো, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী এবং প্রজাপতি সনাক্তকরণ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
বাটারফ্লাই পার্ক ও রিসার্চ সেন্টারে প্রজাপতি-বান্ধব গাছপালা, জীবন্ত প্রজাপতি ও প্রজনন স্থল নিয়ে সাজানো উন্মুক্ত উদ্যান সারাদিন দর্শনার্থীদের জন্য খোলা ছিল।
এ বছর মেলার টাইটেল স্পনসর ছিল ‘কিউট’। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন), আরণ্যক ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ বন বিভাগ। গণমাধ্যম সহযোগী হিসেবে ছিল চ্যানেল আই এবং রেডিও ভূমি।
নাসিমুল শুভ 




















