ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, ছিলেন নার্স, রাতে বাতি হাতে ঘুরে ঘুরে যুদ্ধাহতদের দেখভাল করে যিনি ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প নামে। বাংলাদেশেও পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষদের জীবনে নেমে আসা অচল-অন্ধকারে আলোকবর্তিকা হাতে সত্তরের দশকে এসেছিলেন একজন ব্রিটিশ নারী, ভ্যালেরি। সেই যে এলেন, বাংলার প্রকৃতি ও জীবনের প্রেমে পড়ে তিনি থেকে গেলেন সবুজের দেশে, সরল মানুষের কাছে। পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্র সিআরপিকে জন্ম দিয়ে সেটিকে তিলে তিলে বড় করা, মায়ের মতো সেবা দিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের মুখে হাসি ফোটানো সেবামাতা ভ্যালেরির বয়স এখন ৮২।
ভ্যালেরির পুরো নাম ভ্যালেরি অ্যান টেইলর। তাঁর জন্ম যুক্তরাজ্যের কেন্ট শহরে। সেখানেই কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। ১৯৪৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি উইলিয়াম টেইলর ও মেরি টেইলরের ঘর আলো করে আসেন ভ্যালেরি টেইলর।
ভ্যালেরির জন্মোৎসবে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মহীয়সী সেবামাতা ভ্যালেরি ৮২ বছর পূর্ণ করলেন, সবাইকে নিয়ে জন্মদিন উদযাপন করলেন তাঁর সঙ্গে বেড়ে ওঠা সিআরপি প্রাঙ্গনে।
বাংলাদেশের প্রকৃতিপ্রেমী এবং মানুষের জীবনে আশার আলো নিয়ে আসা ভ্যালেরি অ্যান টেইলরের জন্মদিনে সাভারের সিআরপির রেডওয়ে হলে বর্ণাঢ্য এক উৎসব আয়োজন করে মুকিত মজুমদার বাবুর প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন। সেবামাতা ভ্যালেরির অনন্য অবদান স্মরণে মানপত্র পাঠ, বিশাল কেক কেটে উদযাপিত হয়েছে এই মহীয়সীর জন্মদিন।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সেবায় ভ্যালেরির অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর মানবসেবায় বিশেষ অবদান রাখাদের জন্য ‘সেবামাতা ভ্যালেরি অ্যান টেইলর পদক’ দেয়া শুরু করেছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন।
ভীষণ বিনয়ী ভ্যালেরি নিজের এই বিশেষ দিনেও সিআরপির প্রাত্যহিক কাজ সেরে অনুষ্ঠানস্থলে আসতে ৩০ মিনিট দেরী করেন। এজন্য বক্তব্যের শুরুতেই তিনি এর ব্যাখ্যা দিয়ে দেরীতে আসায় সবার কাছে ক্ষমা চান।

ভ্যালেরি নিজের জন্মদিনের এই উৎসব আয়োজন করায় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং এই আনন্দ সিআরপি পরিবারের সবার বলে জানান।
বাংলাদেশে ভ্যালেরি ও সিআরপির পথচলা
১৯৬৭ সাল, লন্ডনের সেন্ট টমাস হাসপাতাল থেকে ফিজিওথেরাপির উপর পড়াশোনা শেষ করে ভ্যালেরি চাইছিলেন দক্ষিণ এশিয়া মানবসেবার কাজ করতে। ১৯৬৯ সালের মাঝামাঝি সুযোগ এসে যায়, চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনার খ্রিস্টান হাসপাতালের ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন ভ্যালেরি।
তিনি ভেবেছিলেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে তাঁর বেশিদিন ভাল লাগবে না, তাই মাত্র ১৫ মাসের চুক্তিতে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশে এসেই এদেশের প্রকৃতির প্রেমে পড়ে যান ভ্যালেরি।
বাংলাদেশের প্রেমে পড়ার স্মৃতিচারণ করে এই তিনি একাধিক সাক্ষাতকারে বলেছেন, “বিমান থেকে নেমেই আমি চন্দ্রঘোনার দারুণ সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে যাই। একদিন নদীতে ঘন কুয়াশা ছিলো। আশেপাশে আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ একটি সাম্পান আমার চোখে পড়ে, মাঝি দাঁড় বাইছে, আর মনে হচ্ছে সাম্পানটি পানির দুই তিন ফুট উপরে ভেসে চলছে। কারণ চারপাশে কুয়াশার মধ্যে শুধু সাম্পানটি দেখা যাচ্ছিলো। সে দৃশ্য এখনো পরিস্কারভাবে আমার মনে ভাসে।”
শুধু প্রকৃতিপ্রেম নয়, এরপর মানবসেবা করতে গিয়ে ভ্যালেরি আটকে যান মায়ার বাঁধনে। চন্দ্রঘোনার সৌন্দর্য অবাক করলেও মিজ টেইলর কষ্ট পেতে থাকেন, যখন দেখেন ওই হাসপাতালে একটি হুইলচেয়ারও নেই। অথচ তাকে পঙ্গুদেরই চিকিৎসা করতে হয়। ভ্যালেরি বড় হয়েছেন ইংল্যান্ডের আলসবেরিতে, যেখানে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনজুরি সেন্টারটি অবস্থিত।

“ছোটবেলায় আমি আমি দেখেছি, লোকজন ওখানকার স্পোর্টস সেন্টারে খেলাধুলা করছে। হুইলচেয়ারে করে আশপাশের দোকানে লোকজন ঘুরছে। কিন্তু চন্দ্রঘোনায় আমি কোন হুইলচেয়ার দেখিনি। ওখানে কোন কারিগরি শিক্ষা ছিলো না। সেখানে কোন অকুপেশনাল থেরাপির ব্যবস্থা ছিলো না। সুতরাং আমি বুঝতে পেরেছি কী পরিমাণ পিছিয়ে আছে এখানে।”
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে বাধ্য হন। তবে সেবছরই সেপ্টেম্বর মাসে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তখনো যুদ্ধ শেষ হতে দুই মাস বাকি। এ সময় তাঁর কাজ আরো বেড়ে যায়। কারণ, যুদ্ধের কারণে পঙ্গুত্বের হার বেড়ে গিয়েছিল কয়েকগুণ। তিনি সফলভাবেই সেই কাজ করতে সমর্থ হন।
গুদামঘরে সিআরপি
বাংলাদেশে একটি সার্থক পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত অর্থ ও অন্যান্য সাহায্যের ব্যবস্থা করার উদ্দেশে ১৯৭৩ সালে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৯৭৫ সালে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এইসময় তিনি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন।

১৯৭৯ সালে এই হাসপাতালের দুটি পরিত্যক্ত গুদামঘরে ৩-৪জন রোগী নিয়ে শুরু করেন সিআরপি।
ক্ষুদ্র সিআরপি আজ মহীরুহ
১৯৯০ সালে ঢাকার কাছে সাভারে ৫ একর জায়গা কিনে সিআরপির স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলেন ভ্যালেরি টেইলর। তিলে তিলে ভ্যালেরি গড়ে তুলেছেন সিআরপি, এখন যেটি দাতব্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের উদাহরণ।
নিজের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য ভ্যালেরি সাভারে ১০০ শয্যার স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি সেবা চালু করেন। প্রয়োজনে তিনি শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে নিতে পারেন; যেমনটি করেছিলেন রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আতদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের সময়।

সিআরপি রানা প্লাজা ধসে আহত ৫০৯ জন রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং ৩৭০ জন ব্যক্তিকে পুনর্বাসিত করেছে। স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি চিকিৎসায় সিআরপি উপমহাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল। গত ৪০ বছরে এ হাসপাতালে (বহির্বিভাগসহ) প্রায় ৪০ লাখ রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছে।
শুধু ঢাকার সাভারে নয়, দেশের নানা জায়গায় এখন যে পক্ষাঘাতগ্রস্তরা চিকিৎসা পায়, তার পেছনেও একটা বড় অনুপ্রেরণার নাম ভ্যালেরি টেইলর। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সিআরপির সেবাকর্মকে সমগ্র বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সাভার সিআরপি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৩টি শাখা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ভ্যালেরি ও সিআরপির প্রাপ্তির ঝুলি
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে সরকার ভ্যালেরিকে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিত্ব প্রদান করে। এরপর ২০০৪ সালে তাকে স্বাধীনতা পদক দিয়ে সম্মানিত করা হয়। দুস্থ, দুর্গত মানুষের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ভ্যালেরিকে অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার পদকে ভূষিত করে।
১৯৯৬ সালে আর্থার আয়ার ব্রুক স্বর্ণপদক, ২০১১ সালে শেল্টেক্ পদক, জাতীয় সমাজসেবা পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার পেয়েছেন। পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা। ২০১৩ সালে রোটারি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে ‘দ্য ওয়ান’ পুরস্কার হিসেবে এক লাখ মার্কিন ডলার পুরস্কার পান। এই অর্থ ভ্যালেরি সিআরপিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি নতুন আবাসিক হোস্টেল তৈরিতে ব্যবহার করেন। এ ছাড়া মিরপুরে বিশাল ভবন নির্মাণ করেছেন। ভবনের ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় করা হয় চিকিৎসাসেবায়।

ভ্যালেরির স্বপ্নের বিস্তৃতি
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা প্রদানের পাশাপাশি ভ্যালেরির স্বপ্ন ছিল সিআরপিতে একটি অ্যাকাডেমিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালে বিএসসি কোর্স (ফিজিওথেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপি) চালু করা হয়। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি কোর্স চালু হয়েছিল ২০০৪ সালে। মূলত স্পাইন কর্ড ইনজুরির রোগীদের পরিপূর্ণ পুনর্বাসনসেবা ত্বরান্বিত করার ব্রত নিয়ে তিনি বিএইচআইতে রিহ্যাব প্রফেশনালস কোর্স শুরু করেছিলেন। প্রতিবন্ধীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ১৩টি বিষয়ে অনার্স, ডিপ্লোমা ও অ্যাসিস্ট্যান্ট কোর্স করাচ্ছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মক্ষম করার উদ্দেশে সিআরপি সাভার ও আশুলিয়ার গণকবাড়ি কেন্দ্রে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখানে বিনা মূল্যে শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার ব্যক্তিদের তাদের নিজ নিজ শিক্ষা, দক্ষতা ও আগ্রহ অনুযায়ী সেলাই, ইলেকট্রনিকস মেরামত, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, দোকান ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারেও সহায়তা করা হয়।

জানা যায়, সাভারে সিআরপির প্রধান কার্যালয়ে প্রতি মাসে গড়ে পাঁচ হাজার রোগী ফিজিওথেরাপি এবং এক হাজার রোগী অকুপেশনাল থেরাপি চিকিৎসা নিয়ে থাকে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য রয়েছে একটি শিশু ইউনিট। সেখান থেকেও প্রতি মাসে শতাধিক শিশু চিকিৎসাসেবা নেয়।
পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের সেবা ও কল্যাণের কাজেই ভ্যালেরি জীবনের অধিকাংশ সময় পার করেছেন। সর্বদা অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেন। অপচয় একদম পছন্দ করেন না। বাংলাদেশে মাত্র চারজন রোগী নিয়ে যে প্রতিষ্ঠান পথচলা শুরু করেছিল, ভ্যালেরির নিরলস প্রচেষ্টায় ও পরিশ্রমে আজ সেটি বিশ্বের অন্যতম পুনর্বাসনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সিআরপিতে এক হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন। তাদের অনেকে এখানে চিকিৎসা নিতে এসে পুনর্বাসিত হয়েছেন।

নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে ভ্যালেরি টেইলর বলেন, ‘যত দিন বাঁচব, তত দিন বাংলাদেশের মানুষের জন্যই কাজ করে যাব। আশা করি, আমি না থাকলেও বাংলাদেশে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের সুচিকিৎসা সুবিধা বাড়বে।’ ভ্যালেরি টেইলর চান, সিআরপির সঙ্গে সম্পৃক্তরা এটিকে এগিয়ে নেবেন। এজন্য চালু করেছেন নতুন স্লোগান- ‘আমরাই সিআরপি’। তার বিশ্বাস, সিআরপি থেকে যারা চিকিৎসাসেবা নিয়েছে, যারা এখানে কর্মরত, তারাই এ প্রতিষ্ঠানের আলো সারা দেশে ছড়িয়ে দেবেন।
নাসিমুল শুভ 


















