কেলোনাইডিস নাইজার-নাইজার হলো ইকুয়েডরের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের একটি বিশেষ প্রজাতির কচ্ছপ, যা ফ্লোরিয়ানা দ্বীপের জায়ান্ট টর্টোয়েজ (Floreana giant tortoise) নামেও পরিচিত। ১৮০০ সালের দিকে অতিরিক্ত শিকারের ফলে এই প্রজাতির কচ্ছপ বন্য পরিবেশে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
প্রায় ২০০ বছর পরে, সম্প্রতি একই দ্বীপেই ফিরিয়ে আনা হলো সেই প্রজাতির ১৫৮টি কাছিমকে। এই আপাত অসম্ভব বিষয়টি সম্ভব হয়েছে জেনেটিক্স–এর সাহায্যে।
প্রাণিবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ‘ফ্লোরিয়ানা ইকোলজিকাল রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’–এর সূচনা হিসেবে বিশেষ এই উদ্যোগ। প্রকল্পটির পরিচালনা করছে গ্যালাপাগোজ় ন্যাশনাল পার্ক ডিরেক্টরেট, গ্যালাপাগোজ় বায়োসিকিউরিটি অ্যান্ড কোয়ারান্টিন এজেন্সি এবং চার্লস ডারউইন ফাউন্ডেশন–সহ কয়েকটি সংস্থা।
এই কচ্ছপগুলো আসলে ‘ফ্লোরিয়ানা দৈত্যাকার’ কচ্ছপে্র বংশধর। ফ্লোরিয়ানা দ্বীপ থেকে অন্যত্র চলে গেলেও তাদের বংশ বিলুপ্ত হয়নি। অন্য একটি দ্বীপে কচ্ছপের অন্য এক প্রজাতির মধ্যে তাদের জিনগত চিহ্ন টিকে ছিল। বহু বছরের ডিএনএ পরীক্ষা ও পরিকল্পিত প্রজননের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শেষ পর্যন্ত এমন কচ্ছপ তৈরি করতে পেরেছেন, যারা মূল প্রজাতির খুব কাছাকাছি। সেই ‘তৈরি করা’ কচ্ছপই ফেরানো হয়েছে ফ্লোরিয়ানায়। এই কচ্ছপরা আসলে প্রকৃতির মালির কাজ করে।
এরা ঘাস খেয়ে ও গাছপালা মাড়িয়ে পথ তৈরি করে এবং তাদের মলের মাধ্যমে দূরদূরান্তে বীজ ছড়িয়ে দিয়ে উদ্ভিদজগতকে নতুন ভাবে সাজায় বলেই তারা ‘প্রাকৃতিক মালি’। ফ্লোরিয়ানাতেও কচ্ছপরা বহু প্রজন্ম ধরে এই কাজ করেছিল।

কিন্তু পরিবেশবিজ্ঞানীরা জানান, ১৮-১৯ শতকে নাবিক, জলদস্যু ও বসতিস্থাপনকারীরা এই দ্বীপে নিয়মিত আসতে শুরু করেন। তারা ওই কচ্ছপদের খাওয়ার জন্য ব্যাপক ভাবে শিকার শুরু করে। এছাড়া ছাগল, ইঁদুর, বিড়ালের মতো বাইরের প্রাণী দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে দ্বীপের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রকে ভেঙে দিতে শুরু করে। অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে দ্বীপ ছাড়তে শুরু করে কচ্ছপরা।
সেই অতীত অধ্যায়কেই উল্টো পথে চালানো সম্ভব হয়েছে জিনবিদ্যার মাধ্যমে। ফ্লোরিয়ানা দ্বীপ থেকে বহু দূরে ইসাবেলা দ্বীপের উল্ফ ভলক্যানো নামে আগ্নেয়গিরি–সংলগ্ন এলাকায় এক ধরনের কচ্ছপের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। ২০০৮ সালে একদল বিজ্ঞানী ওই প্রজাতির কচ্ছপদের ডিএনএর সঙ্গে জাদুঘরে সংরক্ষিত ফ্লোরিয়ানার কচ্ছপদের নমুনা ডিএনএর মিল দেখে বিস্মিত হন।

মনে করা হচ্ছে, নাবিকরা জ্যান্ত কচ্ছপদের এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে নিয়ে যাওয়ার সময়ে মাঝপথে হয়তো কিছু প্রাণীকে ছেড়ে দিয়েছিল কিংবা নাবিকদের হাত ফসকে গিয়েছিল। পরে সম্ভবত সেখান থেকেই এমন কিছু সংকর কচ্ছপ তৈরি হয়েছিল, যাদের শরীরে পুরোনো ডিএনএর ছাপ থেকে যায়।
সেখান থেকেই ‘ব্যাকক্রসিং’ প্রক্রিয়ায় পরিকল্পিতভাবে প্রজনন ঘটিয়ে হারিয়ে যাওয়া প্রজাতির অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যই ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
এখন দেখা যাক ‘তৈরি করা’ এই ্কচ্ছপেরা আগের মতোই নিজেদের আদিভূমি ফ্লোরিয়ানাতে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে দ্বীপের মালি হিসেবে কাজ করে যেতে পারে কিনা।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 









