ভেড়ার মতো দেখতে হলেও পুরোপুরি ভেড়ার মতো নয়, কারণ প্রাণীটির পৃষ্ঠদেশে বা নিতম্বে অতিরিক্ত চর্বির ঝোলা ভাব থাকে। এই চর্বিযুক্ত ঝোলা নিতম্বের কারণেই এই ভেড়ার মতো দেখতে প্রাণীটির নাম দুম্বা। দুম্বার নিতম্বে অত্যাধিক পরিমাণে চর্বি জমে একটি ঝুলন্ত থলের মতো অংশের সৃষ্টি করে, যা সাধারণ লেজের মতো দেখায়। বিজ্ঞান ও প্রচলিত ভাষায় এটিকে ‘ফ্যাট-টেইলড’ (Fat-tailed) বলা হয়, মরুভূমির বিরূপ পরিবেশে বেঁচে থাকার প্রাণীটির এখান এটি শক্তির পুষ্টি ও পানি হিসেবে কাজ করে।
দুম্বা মূলত সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার শুষ্ক ও মরুভূমি অঞ্চলের প্রাণী। এটি মূলত বিশেষ এক প্রজাতির ভেড়া, যা তীব্র গরম এবং শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে।
‘দুম্বা’ শব্দটির উৎপত্তি মূলত ফারসি ও উর্দু শব্দ ‘দুম্বাহ্’ থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো “মোটা লেজবিশিষ্ট ভেড়া”। ফারসি ভাষায় ‘দুম্ব’ বা ‘দুম’ শব্দের অর্থ হলো ‘লেজ’। এই প্রজাতির ভেড়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের নিতম্ব বা লেজের দিকে প্রচুর চর্বি জমা থাকে এবং অংশটি দেখতে বেশ মোটা ও ভারী হয়। এদের এই বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্যের (মোটা লেজ) কারণেই ফারসি ভাষার অনুসরণে প্রাণীটিকে ‘দুম্বা’ বা ‘ডুম্বা’ নামে ডাকা হয়।
মরুভূমির প্রাণী হলেও দুম্বা সাধারণ ছাগল বা ভেড়ার মতোই ঘাস, খড়, কলাপাতা, গাছের পাতা এবং সাধারণ দানাদার ভুসি খেয়ে জীবনধারণ করতে পারে।

এরা সাধারণ ভেড়ার চেয়ে আকারে বেশ বড় এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ও তেজি প্রকৃতির হয়ে থাকে। একটি পূর্ণাঙ্গ দুম্বা থেকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত মাংস পাওয়া সম্ভব।
একটি স্ত্রী দুম্বা সাধারণত প্রতি ৬ মাস পর পর বাচ্চা প্রসব করে। পুরুষ দুম্বা আকারে বড় এবং মাথায় বাঁকানো শিং থাকে।
কোরবানির সাথে দুম্বার কী সম্পর্ক?
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুম্বার এক আলাদা পরিচিতি আছে। বিভিন্ন ইসলামিক ইতিহাস ও তাফসিরের কিতাব যেমন—’আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ও ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’-এ দুম্বার বিষয়টি উল্লেখ আছে।
এসব বইতে থাকা ইসলামিক ইতিহাস মতে, আল্লাহ হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে স্বপ্নে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানি করার নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করার জন্য যখনই গলায় ছুরি চালাতে যান, ঠিক তখনই আল্লাহ তাঁর আনুগত্য ও ত্যাগের পরীক্ষায় সন্তুষ্ট হন।
আল্লাহ জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে জান্নাত থেকে একটি হৃষ্টপুষ্ট দুম্বা পাঠিয়ে ইসমাইল (আ.)-এর স্থলে প্রতিস্থাপন করে দেন এবং সেটি কুরবানি হয়ে যায়। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করেই প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ উদযাপন করে থাকেন।
হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে জান্নাত থেকে পাঠানো একটি শিংওয়ালা সাদা রঙের ভেড়া বা পুরুষ দুম্বা (Ram) কুরবানি দিয়েছিলেন। ইসলামিক তাফসিরের কিতাব যেমন—’আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ও ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’-এ উল্লেখ রয়েছে যে, জান্নাতি এই দুম্বাটির নাম ছিল ‘জারির’ এবং এটি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে জান্নাতে চরে বেড়িয়েছিল।
বাংলাদেশে দুম্বা
একসময় বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব থেকে ত্রাণ ও উপহার হিসেবে দুম্বার মাংস আসতো। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের আগে সৌদি আরব থেকে দুস্থ ও এতিমদের জন্য দুম্বার মাংসের চালান আসতো। মসজিদ কমিটি এই মাংস বিতরণ করতো।

কিন্তু বাংলাদেশ এখন আর আগের অবস্থায় নেই। এখন স্বাবলম্বী বাংলাদেশে এখন দুম্বা পালন-দুম্বার খামারও আছে। নাটোর, গাজীপুরে দুম্বার খামার দেশের গবাদিপশুখাতে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















