নোবেলজয়ী মার্কিন কৃষি বিজ্ঞানী নরম্যান বোরলগ একসময় রূপকার্থে বলেছিলেন, “গাছেরা ফিসফিস করে কথা বলে, সে কথা শুনতে হলে তাদের কাছে যেতে হবে।”
সম্প্রতি এক গবেষণায় গাছেদের এই ‘কথা বলা’ বিষয়টি যেন বাস্তবে প্রমাণিত হলো। শব্দের মাধ্যমে উদ্ভিদ ও পোকামাকড় যে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলছেন ইসরায়েলের তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।
তাদের এ গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃতিতে ধ্বনিগত যোগাযোগের এক নতুন দ্বার মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়েছে, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
গবেষণা বলছে, উদ্ভিদও কথা বলে তবে মানুষের মতো নয়, বরং একধরনের সংকেত বা শব্দের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ে সন্দেহ ছিল বিজ্ঞানীদের মধ্যে, তবে সম্প্রতি তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের এক চমকপ্রদ গবেষণায় উঠে এসেছে, গাছপালা যখন চাপে থাকে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তারা এমন শব্দ সৃষ্টি করে যা পতঙ্গ ও কিছু প্রাণী শনাক্ত করতে পারে। এমনকি এসব সংকেতের ভিত্তিতে পতঙ্গরা সিদ্ধান্তও নেয় কোথায় ডিম দেবে আর কোথায় নয়।
জার্নাল ই-লাইফে প্রকাশিত তাদের গবেষণা পত্রে দেওয়া ধারণা অনুযায়ী, স্ত্রী মথ শুকিয়ে যাওয়া টমেটো গাছ থেকে নির্গত আল্ট্রাসনিক (মানুষের শ্রবণসীমার ঊর্ধ্বে যে শব্দ) সঙ্কেত শনাক্ত করতে পারে এবং এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোথায় ডিম পাড়বে তা ঠিক করে। মথরা সাধারণত টমেটো গাছেই ডিম পাড়ে, যেন লার্ভা বেরিয়ে আসার পর সহজে খাবার পায়।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন রিয়া সেলজার ও গাই জের এশেল, তারা কাজ করেছেন তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইজ ফ্যাকাল্টি অব লাইফ সায়েন্সের দুই অধ্যাপক ইয়োসি ইয়োভেল ও লিলাখ হাদানির গবেষণাগারে।
“একটি উদ্ভিদ ও একটি পোকার মধ্যে প্রাকৃতিক ধ্বনিগত যোগাযোগের প্রথম প্রমাণ উদ্ঘাটন করেছি আমরা,” গত মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) দেওয়া বিবৃতিতে এমনটাই বলেছেন তারা।
দলটি তাদের পুরনো গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই নতুন এ ধ্বনি যোগাযোগের প্রমাণ পেয়েছে। এর আগে একই গবেষকরা বের করেছিলেন, চাপে থাকলে উদ্ভিদদের থেকে আল্ট্রাসনিক শব্দ নির্গত হয়।
তাদের এ আবিষ্কার কৃষি ও কীট নিয়ন্ত্রণে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে; শব্দের মাধ্যমে শস্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও পোকামাকড়ের আচরণ নিয়ে প্রভূত সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
উদ্ভিদ থেকে নির্গত হওয়া আল্ট্রাসনিক শব্দ মানুষ শুনতে না পেলেও অনেক পোকামাকড় এবং বাদুড়ের মতো অনেক স্তন্যপায়ীই তা শনাক্ত করতে পারে।
এই শব্দের প্রভাব বের করতে গবেষকরা স্ত্রী মথদের সামনে দুটি সুস্থ টমেটো গাছ রাখেন, যার একটির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া একটি স্পিকার, যা আগে থেকে রেকর্ড করে রাখা শুকনো গাছের আল্ট্রাসনিক শব্দ নির্গত করতে থাকে। অন্য টমেটো গাছটি ছিল একেবারেই শব্দহীন।

দেখা গেল, মথরা ওই শব্দহীন গাছকেই বেছে নিয়েছে। এ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ডিম পাড়ার উপযুক্ত স্থান বেছে নিতে তারা এ শব্দ সঙ্কেতকে কাজে লাগায়।
অধ্যাপক ইয়োভেল বলেন, “এটাই প্রথম কোনো প্রমাণ যে, প্রাণীরা উদ্ভিদের শব্দের প্রতি সাড়া দেয়। এখন অনুমান করা হচ্ছে, সম্ভবত সব ধরনের প্রাণীই উদ্ভিদের শব্দ শুনে সিদ্ধান্ত নেয় পরাগায়ন করবে কিনা, উদ্ভিদের কাছে যাবে নাকি দূরে থাকবে।”
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















