কাজী নজরুল ইসলাম বললেই চোখে ভেসে ওঠে এক চির-বিদ্রোহী সত্তা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক বজ্রকণ্ঠ। তবে এই অগ্নিগিরির আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক চির-সবুজ, কোমল এবং সংবেদনশীল মন। নজরুলের কাব্য ও সঙ্গীতের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলার নদী, আকাশ, ফুল ও পাখির মুগ্ধকর বিবরণ।
তাঁর লেখনীতে প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়, বরং মানুষের আনন্দ-বেদনার এক পরম সঙ্গী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।নজরুলের প্রকৃতিপ্রেমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সজীবতা। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি চেতনায় আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়, নজরুলের লেখায় প্রকৃতি মাটিক ও মানুষের কাছাকাছি এবং প্রাণবন্ত।
ঋতু বৈচিত্র্যের মধ্যে বর্ষা ও বসন্ত কবিকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। ‘বাদল-রাতের পাখি’, ‘পুবালি হাওয়া’ কিংবা ‘শাওন রাতে যদি’র মতো অসংখ্য গানে তিনি বর্ষার বিরহ ও সৌন্দর্যকে রূপ দিয়েছেন। আবার বসন্তের আগমনে তাঁর গান গেয়ে ওঠে, ‘এলো বনান্তের পাগল বসন্ত’।
নজরুলের গানে ও কবিতায় পাখির উপস্থিতি এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। পাখির কলকাকলিকে তিনি তাঁর সুরের প্রেরণা হিসেবে দেখতেন। বিশেষ করে ‘বুলবুলি’ পাখি নজরুলের সৃষ্টিতে এক স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
তাঁর ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে’ কিংবা ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসনে আজি দোল’ গানগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেয়।
শুধু বুলবুলিই নয়—চাতক, কোকিল, ডাহুক, শ্যামা ও দোয়েলের মতো নানা পাখির ডাক ও স্বভাবকে তিনি মানুষের প্রেম, বিরহ ও অপেক্ষার রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
ফুলের ক্ষেত্রেও নজরুলের অনুরাগ ছিল সীমাহীন। জুঁই, চামেলী, কদম, কৃষ্ণচূড়া, নার্গিস আর বাবলা ফুল তাঁর গানে বারবার ফিরে এসেছে। তিনি ফুল ও পাখিকে প্রকৃতির এমন এক অবিনশ্বর উপাদান হিসেবে দেখেছেন, যা মানুষকে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি দেয় এবং মনে সুন্দরের বোধ জাগিয়ে তোলে।
নজরুলের প্রকৃতিপ্রেম কোনো কৃত্রিম শৌখিনতা ছিল না। এটি ছিল তাঁর অন্তরের এক সহজাত ও গভীর অনুভূতি। তিনি প্রকৃতির রূপ, রস, গন্ধ ও শব্দকে নিজের আত্মার সাথে মিশিয়ে নিয়েছিলেন। তাই তো উথাল-পাথাল করা বিদ্রোহের পাশাপাশি তাঁর কলম থেকে সমানে ঝরেছে প্রকৃতির শান্ত, স্নিগ্ধ ও মোহনীয় সুর—যা বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতকে চিরকাল সমৃদ্ধ করে রাখবে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















