শনিবার ভোর, ছুটির দিন হলেও রাজধানীর হাতিরঝিলে হাজার মানুষের ভীড়, সবার পরনে বাঘের ডোরাকাটা টিশার্ট, সময়মতো সবাই হাজির বাঘ বাঁচানোর ম্যারাথন ‘প্যানটোনিক্স টাইগার রান ২০২৫’- এ অংশ নিতে। পূর্ণবয়সী থেকে শিশু সবার মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। ভোর ৫ টা ৪৩, হাতিরঝিলের অ্যাম্ফিথিয়েটার থেকে শুরু হলো প্রায় হাজার মানুষের ম্যারাথন।

শুরুতেই পূর্ণ বয়স্কদের দৌড়। হাতিরঝিলের ৭.৫ কিলোমিটার মাত্র ২৫ দশমিক ২১ সেকেন্ডে পরিভ্রমণ করে পুরুষ ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন মোহাম্মদ সাব্বির ( বিব নম্বর ১৬০৮), প্রথম রানার আপ হন আশরাফুল আলম (বিব নম্বর ১০৯৫) এবং দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছেন মো.আলামিন হোসেন।

নারী ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন লিপিয়া খাতুন, হাতিরঝিলের ৭.৫ কিলোমিটার সম্পন্ন করতে তার লেগেছে ৩৩ দশমিক ৫৯ মিনিট। প্রথম রানার আপ হয়েছেন সাদিয়া এস. সিগমা এবং দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছেন হামিদা এ জেবা।

বড়দের দৌড় শেষ হওয়ার পর শুরু হয় শিশুদের ওয়াকাথন। স্বল্প দূরত্বে দুই ক্যাটাগরিতে এই দৌড় প্রতিযোগিতা চলে। ৬-১০ বছর বয়সী শিশু ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মো. হাসিবুর রহমান, প্রথম রানার আপ হয়েছে মো. ফারহান গাজী এবং দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছে রুবাইয়া ইসলাম।

১১-১৪ বছর বয়সী শিশুদের ক্যাটাগরিতে ওয়াকাথনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মো. সাকিব আল হাসান, প্রথম রানার আপ হয়েছে জারিফ টি চৌধুরী এবং দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছে মো. অভি ইসলাম।
বাঘ রক্ষায় এই দৌড় শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে স্টার্টিং পয়েন্টে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, ‘আমাদের শৌর্য্য-বীর্যের প্রতীক বাংলার বাঘকে রক্ষার জন্য আজকের এই টাইগার রান। আমাদের বেঙ্গল টাইগারদের রক্ষা করতে হবে, তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ করতে হবে, বংশ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে, আর এজন্য চাই সচেতনতা। সেই সচেতনতা বৃদ্ধি করতেই আজকের এই আয়োজন।’

প্রকৃতিবন্ধু নিজেও অংশ নেন এই ম্যারাথনে।
পূর্ণ বয়স্ক এবং শিশুদের ম্যারাথন শেষ হওয়ার পর অংশগ্রহণকারীরা জড়ো হন অ্যাম্ফিথিয়েটারে। এসময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের সকালের নাস্তা, মেডেল এবং সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে দেখা যায়। ছুটির দিনে ভোরে উঠে এত পথ দৌড়ে আসার পরও এই পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের ধৈর্যচ্যুতি দেখা যায়নি।

এই পর্ব শেষে আসে পুরস্কার বিতরণের পালা। অ্যাম্ফিথিয়েটারে সবুজ গাছপালা এবং দুই বাঘের অবয়ব দিয়ে সাজানো মঞ্চে আসেন পুরস্কার বিতরণ পর্বের অতিথিরা। পুরস্কার বিতরণের আগে পরিবেশিত হয় টাইগার রানের থিম সং। গানটি তৈরি করেছে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের মিউজিক ক্লাব এবং সহায়তায় ছিল টাইগার রানের অন্যান্য সহযোগীরা। গানের কথাগুলোতেই আছে বাঘের প্রয়োজন ও তাদের সংরক্ষণের বার্তা: “বাঘ বাঁচলে বন থাকবে, বন থাকলে মানুষ বাঁচবে…”

গানের এই কথার প্রতিধ্বনি করলেন প্যানটোনিক্স টাইগার রান-২০২৫ এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময় যখন বাংলাদেশ আইলা, সিডরের মতো দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে তখনি বাংলাদেশের মানুষদের বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ম্যানগ্রোভ বন বুক পেতে দিয়েছে, রক্ষা করেছে। এই বনের অস্তিত্বের সঙ্গে বাঘের সম্পর্ক আছে। কারণ বাঘ থাকায় লোকালয় থেকে মানুষ যথেচ্ছভাবে বনে প্রবেশ করে না। ফলে বনটা টিকে থাকে। বন ও বাঘের এই আন্তঃসম্পর্ক আমাদের বুঝতে হবে। আমরা সব কিছুকেই শহর বানিয়ে ফেলতে চাই, এক সময় সুন্দরবন অনেক বিস্তৃত ছিল। তাই বাঘ ও বন রক্ষায় আমাদের সচেতন হতে হবে, বনভূমি উজাড় করে নগর-শহর গড়া যে আমাদের অস্তিত্বের জন্য বিপজ্জনক , সে বিষয়ে আমাদের সচেতনতা গড়তে হবে। আর সচেতনতা গড়তে টাইগার রানের মতো আয়োজন অবশ্যই কার্যকর।’
বাঘ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসস্থল সুন্দরবন। তবে অবৈধ শিকার, বনভূমি উজাড় ও মানুষ-বাঘের সংঘর্ষের কারণে বাঘের অস্তিত্ব বর্তমানে চরম হুমকির মুখে। বর্তমানে এরা মহাবিপন্ন অবস্থায় টিকে আছে।

টাইগার রানের পুরস্কার বিতরণী পর্বে বিশেষ অতিথি প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘বাঘ বাংলাদেশে গর্ব। আগে অনেক জেলায় বাঘ ছিল, এখন কেবল দেশের সুন্দরবনে টিকে আছে বেঙ্গল টাইগার। বাঘের আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে। বাঘ বাঁচাতে, সুন্দরবন রক্ষায় তাই সচেতনতা গড়া প্রয়োজন। আমাদের সচেতনতায় সংরক্ষণ পদক্ষেপে সাম্প্রতিক বছরগুলো বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে বাঘ গণনায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫ টি। অতএব আপনাদের সবার সচেতনতায় দেশে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে। এই সফলতা আমাদের ধরে রাখতে হবে।’
সচেতনতা বৃদ্ধি করতে টাইগার রান নাগরিক পর্যায়ে ভূমিকা রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় অংশগ্রহণপকারীদের দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর্বটি, অর্থাৎ র্যাফেল ড্র। এই পর্বে বিজয়ীরা পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন এয়ার টিকিট, রিসোর্ট প্যাকেজসহ নানা পুরস্কার। টাইগার রানের সফল পরিসমাপ্তিতে আয়োজকরা আশা করেন আগামী বছরগুলোতেও তারা এমন আয়োজনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারবেন, যা ছড়িয়ে যাবে দেশজুড়ে।
নাসিমুল শুভ 




















