সব উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল নিয়েই এ সৃষ্টিজগত। প্রকৃতিতে ও পৃথিবীর অস্তিত্বের প্রতি প্রতিটি প্রাণীর কোনো না কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করেই চলছে এ বসুন্ধরা। বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান ব্যতীত এ পৃথিবী টিকবে না। মানুষ ছাড়া বন্যপ্রাণীরা টিকে থাকতে পারবে কিন্তু বন্যপ্রাণীদের সহাবস্থান ছাড়া মানুষ টিকে থাকতে পারবে না। পৃথিবীতে নানা কারণে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমছে। বন্যপ্রাণী কমে যাওয়ার জন্য মানুষের অযাচিত কর্মকাণ্ডকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ থেকে বহু বন্যপ্রাণী হারিয়ে গেছে, আবার অনেক প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ (আইইউসিএন) বাংলাদেশ-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট ৯২০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬৬ প্রজাতির পাখি, ১৬৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৩৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও ৪৯ প্রজাতির উভচর। প্রকৃতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার আরেক তথ্যে বলা হয়েছে, গত ১০০ বছরে দেশে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী চিরতরে হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিয়ে রয়েছে আরো ৯০ প্রজাতির প্রাণী।
বিলুপ্ত প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে মন্থর ভালুক, কৃষ্ণসার, বাদা হরিণ, ভারতীয় গন্ডার, সুমাত্রা গন্ডার, জাভা গন্ডার, বনগরু, বনমহিষ, ধূসর নেকড়ে, নীলগাই, ডোরাকাটা হায়েনা, সবুজ ময়ূর, মিঠাপানির কুমির, গাছ আঁচড়া, লাল মাথা টিয়াঠুঁটি, দাগি বুক টিয়াঠুঁটি, ধলাপেট বক, রাজ শকুন, বাদি হাঁস, গোলাপি হাঁস, মদনটাক, বাদা তিতির, ধূসর মেটে তিতির, সারস, লালমুখ দাগিডানা ইত্যাদি।
তথ্যে বলা হয়েছে আরো ৩৯০টি বন্যপ্রাণী কোনো না কোনোভাবে বিপন্ন তালিকায় রয়েছে। এদের মধ্যে মহাবিপন্ন প্রাণী ৫৬টি, বিপন্ন ১৮১টি এবং ঝুঁকিতে রয়েছে ১৫৬টি প্রজাতি। বন্যপ্রাণী তহবিলের হিসেব মতে, ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা ছিলো প্রায় ১ লাখ। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের জরিপে বিশ্বের বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় চার হাজার।
সমতলের পর ঝুঁকিতে পাহাড়ের প্রাণীরা
বাংলাদেশে সমতলে বন্যপ্রাণী হত্যা একটি চলমান এবং উদ্বেগজনক সমস্যা। আইনত নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে বন্যপ্রাণী নিধন হচ্ছে। মূলত মানুষের বসতি বিস্তার, কৃষি জমির সম্প্রসারণ এবং সচেতনতার অভাবই এর মূল কারণ।
লোকালয়ে বন কমে যাওয়ায় প্রাণীরা খাবারের খোঁজে কৃষিজমিতে বা জনবসতিতে চলে আসে। এতে ফসল নষ্ট হওয়া বা গবাদিপশু আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে মানুষ এদের পিটিয়ে মেরে ফেলে।
অনেক সময় সাপ, মেছো বিড়াল বা গন্ধগোকুল দেখলে মানুষ অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এছাড়া কিছু প্রাণীকে (যেমন- হুতুম পেঁচা বা শিয়াল) অশুভ মনে করার কুসংস্কারও কাজ করে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের তিন পার্বত্য জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে বৃক্ষনিধন, জুম চাষ, ভিনদেশি কাসাভা, কচুসহ বিভিন্ন চাষাবাদের জন্য বনভূমি উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং বেপরোয়া শিকারের কারণে মূল্যবান বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সাম্বার হরিণ, মেঘচিতা, গয়াল, বনরুই, সজারু, ধনেশসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখি বিলুপ্তির পথে।
নব্বইয়ের দশকেও ২০-২৫টি বন্য হাতির পাল খাগড়াছড়ির রামগড় এলাকায় বিচরণ করত। কিন্তু এখন পুরো জেলায় তাদের অস্তিত্ব নেই। বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় খাদ্যের সন্ধানে হাতির পাল সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের ত্রিপুরায় চলে গেছে। রাঙামাটি ও বান্দরবানের বনে হাতি থাকলেও হত্যা ও দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণে সংখ্যা দিন দিন কমছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে ১১৪টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ৭টি, বিদ্যুতের ফাঁদে ২৬টি, দুর্ঘটনায় ১৮টি, অসুস্থতায় ৪০টি, বার্ধক্যে ১৫টি এবং অজ্ঞাত কারণে ১০টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। দাঁত ও হাড় সংগ্রহের পাশাপাশি মাংসের জন্যও হাতি শিকার করা হচ্ছে।
মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন সাঙ্গু-মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনে পরিচালিত এক গবেষণায় হাতির মাংস শিকারের প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই গবেষণার প্রতিবেদন ১৬ অক্টোবর কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা মনিরুল এইচ খানের তথ্যমতে, গত এক শতাব্দীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে গন্ডার, বর্মি ময়ূর, বানতেং (এক ধরনের বন্য মহিষ) ও শ্লথ বেয়ার সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গেছে।
এর মাঝেও আশার কথা শুনিয়ে তিনি জানান, সাম্প্রতিক কিছু অনুসন্ধানে প্যারা হরিণ ও গাউরের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গত বছর রাঙামাটির দুর্গম কাচালং বনে সূর্য ভালুক, কালো ভালুক, সাম্বার হরিণসহ বেশ কিছু বন্যপ্রাণীর দেখা পাওয়া গেছে। এছাড়া ওই বনে বেঙ্গল টাইগারের বিচরণেরও তথ্যপ্রমাণ মিলেছে।
তবে বন রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ না হলে অচিরেই এসব বিপন্নপ্রায় প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
বর্তমানে হরিণ, শূকর ও বনমোরগ শিকারিদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। দেশীয় তৈরি বন্দুক, জাল ও বিষটোপ ব্যবহার করে এসব শিকার করা হচ্ছে। জীবিত হরিণ, টিয়া, ময়না, গুইসাপ, তক্ষকসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পার্বত্য এলাকা থেকে সমতলে পাচার করা হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস। প্রতি বছর ৩ মার্চ বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস পালিত হয়।
২০১৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস ঘোষণা করে। বিপন্ন বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত কনভেনশন স্বাক্ষরের বার্ষিকীর দিনটিতে এই দিবস পালন করা হয়। এর লক্ষ্য বাণিজ্যের কারণে বন্যপ্রাণী প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকি রোধ করা। দিবসটির উদ্দেশ্য বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর গুরুত্ব এবং তাদের প্রতি আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ বাণিজ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বাড়তে থাকা হুমকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
এদিন শুধু বন্যপ্রাণী উদযাপন নয়, বরং পরিবেশে এদের প্রভাব এবং মানবজীবনের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক তুলে ধরা হয়।
বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হওয়া শুধু ওই বন বা মহাসাগরেই নয়, প্রভাব ফেলে মানুষের খাদ্যব্যবস্থা, চিকিৎসা, জলবায়ু স্থিতিশীলতা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 










