সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে হাম-এর প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৮ মার্চ, ২০২৬, বুধবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে জানা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ১৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ২১ জন শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত মোট শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৫৯৯। আর হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৫৭৭। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়া পাওয়া রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ২৪১। এমতাবস্থায়, অভিভাবকসহ সর্বমহলে হাম নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার পুনরায় সারাদেশে জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। কিন্তু যেসকল শিশু ইতোমধ্যে হাম-রুবেলা টিকা’র দুই ডোজই গ্রহণ করেছে; তাদের পুনরায় টিকাকরণের আওতায় আনতে হবে কিনা এনিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে বিভ্রান্তিমূলক বিভিন্ন মতামত, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। এরকমই একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাঈদ শিমুল তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেইজে হাম সংক্রান্ত টিকাকরণ নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
বিষয়টি নিয়ে যথাযথ জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ডা. আবু সাঈদ শিমুল-এর বিশেষজ্ঞ মতামত প্রকৃতিবার্তায় হুবহু তুলে ধরা হলো-
বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুদের সুরক্ষার জন্য দেশব্যাপী হাম-রুবেলা (MR) টিকাদান কর্মসূচি চালু হয়েছে। অনেক অভিভাবকের মনে প্রশ্ন – যদি শিশু ইতোমধ্যে দুই ডোজ টিকা নিয়ে থাকে, তাহলে আবার কেন অতিরিক্ত ডোজ দরকার? এর উত্তর লুকিয়ে আছে হার্ড ইমিউনিটি (Herd Immunity) এবং হাম রোগের অত্যন্ত সংক্রামক স্বভাবের মধ্যে।
হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে (World Health Organization [WHO], 2023)। একে বলে বেসিক রিপ্রডাকশন নাম্বার (Ro). করোনার ক্ষেত্রে এটি ছিলো ২ থেকে ৪.৬। হামের জীবাণু বাতাসে ২ ঘন্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। এই উচ্চ সংক্রমণ ক্ষমতার কারণে হাম প্রতিরোধে হার্ড ইমিউনিটি ৯৫% এর বেশি হওয়া জরুরি (WHO, 2017)। হার্ড ইমিউনিটি বলতে বোঝায় – যখন একটি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ কোন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়, তখন রোগের বিস্তার কমে যায় এবং পুরো সমাজ সুরক্ষিত থাকে।
সব সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে এত বেশি হার্ড ইমিউনিটি প্রয়োজন হয় না। যেমন-
- ইনফ্লুয়েঞ্জা: প্রায় ৫০-৭০%
- কোভিড-১৯ (প্রাথমিক ধারণা): প্রায় ৬০-৭০%
- হাম: সর্বোচ্চ, প্রায় ৯২-৯৫% বা তারও বেশি (WHO, 2017)
যদিও হাম টিকার দুই ডোজ প্রায় ৯৭% সুরক্ষা দেয়, তবুও কিছু শিশু সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয় না (WHO, 2017)। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই সামান্য ফাঁকও বড় আকারের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করতে পারে।
এই কারণেই গণটিকাদান কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মত অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দ্রুত জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা এবং পূর্বের টিকাদানের ঘাটতি পূরণ করা (WHO, 2023)। একইভাবে UNICEF এই কর্মসূচিগুলোকে হাম নির্মূলে কার্যকর বলে উল্লেখ করেছে (UNICEF, 2022)। Indian Academy of Pediatrics-ও অতিরিক্ত ডোজকে নিরাপদ ও প্রয়োজনীয় হিসেবে সমর্থন করে (IAP, 2020)।
মূল কথা
অতিরিক্ত হাম- রুবেলার টিকা:
> ব্যক্তিগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়
> তবে প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
> ২ ডোজ নেওয়া থাকলেও নিরাপদ ও উপকারী
বিষয়টি এমন নয় যে, আগে দুই ডোজ দেয়া থাকলে এবারই প্রথম বাড়তি ডোজ দেয়া হচ্ছে। ২০২০ সালেও একইভাবে প্রায় ৩ কোটি বাচ্চাকে হামের বাড়তি টিকা দেয়া হয়। আগে দুই ডোজ দেয়া থাকলেও বাড়তি টিকা দেয়া হয় তখন। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাড়তি টিকা নেয়া বাচ্চাদের টিকা সম্পর্কিত কোন সমস্যা হতে শোনা যায় নি। হামের টিকা ১৯৮৯ সাল থেকে এককভাবে এরপর ২০১২ সাল থেকে হাম রুবেলা নামে শিশুদের দেয়া হচ্ছে কোন ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়াই।
অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেছেন: “যারা আগে টিকা দেয় নি তারা নিলেইতো টিকা দানের হার বাড়বে, হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে। যারা আগে নিয়েছে তাদের পুনরায় টিকা নেয়ার সাথে হার্ড ইমিউনিটির কী সম্পর্ক? “
১) মূল ধারণা: শুধু “টিকা দেওয়া” নয়, কার্যকর “রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা“ (ইমিউনিটি) দরকার
হার্ড ইমিউনিটি নির্ভর করে কতজন মানুষের শরীরে সত্যিকারের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে তার ওপর, শুধু টিকা নেওয়ার সংখ্যার ওপর নয়।
২) সব টিকা নেওয়া শিশুর শরীরে সমান “রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা“ (ইমিউনিটি) তৈরি হয় না
১-২ ডোজ নেওয়ার পরও কিছু শিশুর শরীরে যথেষ্ট ইমিউনিটি তৈরি হয় না (primary vaccine failure), ফলে তারা এখনও সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে।
৩) হার্ড ইমিউনিটি পরিমাপ করার সময় “কার্যকর রোগ প্রতিরোধী (ইমিউন)” মানুষ ধরা হয়। কতজন টিকা দিয়েছে তা ধরা হয় না ।
যদি ৯৫% শিশু টিকা নেয় কিন্তু বাস্তবে কিছু শিশু ইমিউন না হয়, তাহলে কার্যকর ইমিউনিটি ৯৫% এর নিচে থেকে যায় – যা হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়।
৪) অতিরিক্ত ডোজ এই “গ্যাপ” পূরণ করে
অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার মাধ্যমে যাদের আগে ইমিউনিটি হয়নি তারা সুরক্ষা পায় এবং যাদের কম ছিল তাদের ইমিউনিটি বৃদ্ধি পায়।
৫) কেন সবাইকে একসাথে দেওয়া হয়, আলাদাভাবে খুঁজে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় নি শুধু তাদের দেয়া হচ্ছে না (selectively নয় কেন)?
কোন বাচ্চার শরীরে ইমিউনিটি আছে আর কার শরীরে নেই—তা আলাদা ভাবে নির্ণয় করা মাঠ পর্যায়ে দুরূহ কাজ। এটি সাধারণ ল্যাব টেস্টে বোঝাও যায় না । তাই World Health Organization নির্দেশনা অনুযায়ী সবাইকে একসাথে টিকা দেওয়া হয়।
৬) আউটব্রেক কন্ট্রোল = দ্রুত, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি (ইউনিফর্ম ইমিউনিটি)
গণটিকাদান দ্রুত সবার মধ্যে সমানভাবে ইমিউনিটি বাড়ায়, ফলে সংক্রমণের চেইন ভেঙে যায়।
সহজভাবে বোঝার জন্য –
হার্ড ইমিউনিটি নির্ভর করে “কার্যকর ইমিউন মানুষের সংখ্যা”-র উপর, শুধু “কতজন টিকা নিয়েছে” তার উপর নয়।
আগে টিকা নেওয়া শিশুদের আবার টিকা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো:
- যাদের ইমিউনিটি হয়নি তাদের কভার করা
- যাদের ইমিউনিটি কম তাদের বুস্ট করা
এতে করে কার্যকর রোগ প্রতিরোধ effective immunity ≥95% হয়, যা হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যাবশ্যক।
তথ্যসূত্র:
১. ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও)। মিজলস ফ্যাক্ট শিট (২০২৩)।
২. ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও)। মিজলস ভ্যাকসিনস: ডব্লিউএইচও পজিশন পেপার (২০১৭)
৩. ইউনিসেফ। মিজলস অ্যান্ড রুবেলা ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন গাইডেন্স (২০২২)
৪. ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিকস (আইএপি)। অ্যাডভাইজরি অন এমআর ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন (২০২০)।
লেখক: ডা. আবু সাঈদ শিমুল
সহযোগী অধ্যাপক, মুগদা মেডিকেল কলেজ ও কনসালটেন্ট, ইনসাফ বারাকাহ হাসপাতাল।
ডা. আবু সাঈদ শিমুল 










