ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অভাবনীয় এক ধাক্কায় তৈরি হলো নতুন এক ইতিহাস। ৩৪ বছরের বাম দূর্গের পতন ঘটিয়ে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বসেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। এর ১৫ বছর পর ভারতীয় জনতা পার্টির গেরুয়া ঢেউয়ের আঘাতে ‘দিদি’ হিসেবে পরিচিত মমতার দূর্গই ধসে পড়লো। আশা করা হয়েছিল গত দুইবারের বিধানসভা নির্বাচনের মতো এবারও মমতার দলের সঙ্গে বিজেপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু ভোটের ফলাফলে দেখা গেলো প্রবল প্রতাপশালী মমতা ও তাঁর দলের উল্টোচিত্র।
বিজেপি সুনামিতে কার্যত ভেসে গেছে তৃণমূল। নির্বাচনে ২৯৩ আসনের মধ্যে ২০৮টি আসন জিতে নিয়ে প্রথমবারের মতো রাজ্যে সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি।
কেন দিদির দূর্গ ধসে পড়লো, কিভাবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ তকমাধারী পশ্চিমবাংলায় বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদী দলের এমন বিশাল বিজয় আসলো তা নিয়ে নানান সংবাদমাধ্যমে নানান বিশ্লেষণ উঠে আসছে। সেসব বিশ্লেষণের সারাংশই তুলে ধরা হলো প্রকৃতিবার্তার এই প্রতিবেদনে:
মমতার পতনের নেপথ্যে
তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনরোষ: টানা দেড় দশকের শাসনে ভোটারদের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, যা পরিবর্তনকে অনিবার্য করে তোলে।
দুর্নীতি ও নিয়োগ কেলেঙ্কারি: নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তৃণমূল সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
ঐক্যের অভাব ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল: দলের ভেতরের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে দলের অন্দরে ও রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।
দলের অন্দরে নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের সাথে সাথে পুরনো ও অভিজ্ঞ নেতাদের গুরুত্ব কমানো দলের সাংগঠনিক কাঠামোতে ফাটল ধরায়। অনেকে মনে করছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ‘মিডল অর্ডার’ (মমতার সাথে যারা শুরু থেকে ছিলেন) তৈরি করেছিলেন, অভিষেককে গুরুত্ব দিতে গিয়ে সেখানে ধস নেমেছিল, যা এই পরাজয়ের পেছনে একটি বড় কারণ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিন্তু অনেকে মনে করেন দলের ভেতরেই অনেকের সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক তৎপরতা: বিজেপি রাজ্যজুড়ে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত করেছে এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছে।
হিন্দু ভোটব্যাংকে প্রভাব: মতুয়া সম্প্রদায়ের একাংশ এবং সাধারণ হিন্দু ভোটারদের মধ্যে বিজেপির ‘হিন্দুত্ব’ মতাদর্শ এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘তোষণের’ অভিযোগ কাজ করেছে, যা বিজেপির উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নেতৃত্বের পরিবর্তন ও ‘দিদি’র ভাবমূর্তি হ্রাস: দীর্ঘদিনের শাসনকালে ‘দিদি’ বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, তা কিছুটা হ্রাস পাওয়ায় ভোটাররা বিকল্প হিসেবে বিজেপিকে বেছে নিয়েছে।
যেভাবে গেরুয়া জোয়ার
সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের ফেলো রাহুল ভার্মা বিশ্লেষণ মতে, বিজেপি গত তিনটি নির্বাচনে প্রায় ৩৯ শতাংশ ভোট পাচ্ছিল। এবার তারা ৪৪ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ের রেখা অতিক্রম করেছে।
বিস্ময়কর বিষয় হল, তৃণমূলের মতো শক্তিশালী তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন না থাকার পরও বিজেপি এই বিপুল জনসমর্থন আদায় করেছে। দলটির এই উত্থানের কারণ কি? এর পেছনে কাজ করেছে ৫ ‘ম’।
১৫ বছর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মা, মাটি, মানুষ’- এই তিন ‘ম’-এর শক্তিতে পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন। সেই স্লোগানই পরবর্তীতে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের টানা তিনটি নির্বাচনী জয়ের ভিত্তি হয়ে উঠেছিল।
তবে এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতার সেই ভিত্তি কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। নতুন করে পাঁচটি ‘ম’- মুসলিম, মহিলা, অভিবাসী (মাইগ্র্যান্ট), মতুয়া সম্প্রদায় এবং ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনি যন্ত্র (মেশিনারি) মমতার জয়ের ধারাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
মুসলিম ভোট- পশ্চিমবঙ্গের ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটার ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার নির্ধারক। ২০২১ সালে যেখানে ৩৫ শতাংশের বেশি মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে এমন ৮৫টি আসনের মধ্যে ৭৫টি জিতেছিল তৃণমূল। কিন্তু ২০২৬ সালে মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোতে পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা গেছে। এলাকাগুলোতে উন্নয়ন, ভোটার তালিকা এবং সুশাসনের প্রশ্নে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে।
মহিলা- তৃণমূলের সাফল্যের প্রধান ভিত্তি ছিল নারী ভোট। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নগদ সহায়তা প্রকল্প এবং ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে মমতা এই ভোটব্যাংক ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালে নরেন্দ্র মোদী নারী-কেন্দ্রিক নানাবিধ সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই দুর্গে হানা দিয়েছেন। বিশেষ করে আরজি কর মেডিকেল কলেজে এক নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি নির্বাচনে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে তৃণমূলকে কোণঠাসা করে বিজেপি এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ওই নারীর মা-কে পানিহাটি আসন থেকে প্রার্থী করে।
মাইগ্র্যান্ট- ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আতঙ্ক এবং নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে নিজেদের বৈধতা প্রমাণের জন্য হাজার হাজার শ্রমিক বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। বিপুল সংখ্যক এই ভোটারের অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলকে আরও পরিবর্তনশীল করে তুলেছে।
মতুয়া- পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ মতুয়া সম্প্রদায়, যারা মূলত তফসিলি জাতিভুক্ত। এই বিশাল ভোটব্যাংকই বিজেপি-কে রাজ্যে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিল। এবারো মতুয়াদের নিরঙ্কুশ সমর্থন বিজেপির জয়ের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করেছে।
মেশিনারি- তৃণমূলকে টেক্কা দিতে বিজেপি এবার তাদের সাংগঠনিক যন্ত্র বা মেশিনারিকে ঢেলে সাজিয়েছিল। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের নিবিড় সমন্বয়, বুথ স্তরের ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল প্রচারণাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় তারা।
তাছাড়া, মাঠ পর্যায়ে সম্পৃক্ততাকেও বিজেপি’র নির্বাচনে ভাল ফল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে দেখা হচ্ছে।
উগ্রসাম্প্রদায়িক মেরুকরণ:
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভানু জোশীর মতে, “বিজেপির মূল কৌশল ছিল তৃণমূলের প্রতি মানুষের তৈরি হওয়া বিতৃষ্ণাকে হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের একটি তীক্ষ্ণ ভাষায় বদলে দেওয়া। ফলে এটি কেবল জনকল্যাণের ব্যর্থতা নয়; বরং এটি এমন এক বাস্তবতা যেখানে সরকারি সুবিধা বা দলীয় সাংগঠনিক জোর, কোনোটিই উগ্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের স্রোতকে রুখে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ছিল না।”
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 













