কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মুখে ‘রাজাকার’ স্লোগান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘নিজেদের রাজাকার’ বলে স্লোগান দেওয়া কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা একাত্তরের গণহত্যা, মা-বোনের ওপর পাশবিক নির্যাতন এবং তাতে সহায়তাকারী রাজাকারদের ভূমিকা সম্পর্কে জানে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে ওই স্লোগানে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, “রাস্তায় রাস্তায় লাশ পড়ে থাকতে এরা দেখেনি। তাই নিজেদের রাজাকার বলতে তাদের লজ্জা হয় না।”
কোটা ইস্যুতে ফের অশান্ত হয়ে উঠেছে দেশের প্রায় সবগুলো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস। ‘রাজাকার’ স্লোগান দিয়ে যারা বিক্ষোভ করছে তাদের রাজপথে প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। একদিকে আদালতে কোটা বিষয়ে আপিল করতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে সম্ভাব্য সহিংসতা মোকাবেলায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।
সব মিলিয়ে শিক্ষাঙ্গন ও রাজপথে সহিংসতা-দুর্ভোগের আশঙ্কা চরমে। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ-ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার খবর আসছে।
আদালতের আদেশ না মেনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, কোটা পদ্ধতি নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর এক মাসের স্থিতাবস্থা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। কোটা সংস্কার সম্পূর্ণ আদালতের বিষয়। সুতরাং আদালত যে আদেশ দেবেন সেই আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং মেনে নেওয়া প্রতিটি নাগরিকের একান্ত কর্তব্য।

তিনি বলেন, কেউ আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গজনিত কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালান যেই হোক তাদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করা হবে।
এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সূচনা হয় রবিবার মধ্যরাতে। প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরার রাস্তায় নেমে আসে, স্লোগান দিতে শুরু করে ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার, রাজাকার’।
এই বিক্ষোভের পর সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘অপমানজনক’ দাবি করে তা প্রত্যাহারের আলটিমেটাম ও এক দফা দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ঘোষিত
কর্মসূচি অনুযায়ী, সোমবার (১৫ জুলাই) দুপুর ১২টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করা না হলে ১২টার পর সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হবে।
এর বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অপমান করার প্রতিবাদে এদিন বিকেল ৩ টায় অবস্থান কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ছাত্রলীগ। একই ক্যাম্পাসে দুপক্ষের অবস্থানে সহিংসতার শঙ্কা জাগছে।

এদিকে কোটার পক্ষে-বিপক্ষের পোস্ট পাল্টা পোস্টে উত্তপ্ত ফেসবুক। গতকাল রাত থেকেই ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের স্লোগানমুখর ভিডিও। এর বিপক্ষে ছাত্রলীগের মিছিল-স্লোগান নিয়ে পাল্টা সমাবেশের ভিডিও দেখা যাচ্ছে ফেসবুকে। গত রাত থেকেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা একটি পোস্ট দিচ্ছেন ব্যাপকভাবে, সেখানে তারা লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি স্লোগান, ‘তুমি কে, আমি কে, বাঙালি-বাঙালি’।
কী বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী?
গত রোববার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোটা বিরোধী আন্দোলন নিয়ে কথা বলেন। সেসময় তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে এতো ক্ষোভ কেনো? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরাও পাবে না, তাহলে কী রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে? সেটা আমার প্রশ্ন দেশবাসীর কাছেও। রাজাকারের নাতিপুতিরা সব কিছু পাবে, মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা পাবে না। মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় এনে দিয়েছিলো বলেই না সবাই উচ্চ পদে আসীন’।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর নিজেদের ‘রাজাকার’ পরিচয় দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে আসেন কয়েকটি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা। মধ্যরাত পর্যন্ত বিক্ষোভ করে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের আলটিমেটাম দেয় আন্দোলনকারীরা।
তবে প্রধানমন্ত্রী আজ সোমবার তাদের এই দাবির জবাবে বরং নিজেদের যারা ‘রাজাকার’ পরিচয় দিচ্ছে তাদের নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
ডেস্ক রিপোর্ট 




















