শকুনের কারণে মানুষের মৃত্যু! শুনেই চোখ কপালে উঠেছে? তাহলে কি শকুন আজকাল আস্ত মানুষ খেয়ে ফেলছে। না, ব্যাপারটি আসলে এরকম নয়। সহজ করে বললে, শকুনের বিলুপ্তি পরোক্ষভাবে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রবন্ধ আমেরিকান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, একসময় ভারতে এত শকুন ছিল যে, বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের উড্ডয়নের সময় ইঞ্জিনে শকুন ঢুকে পড়ায় পাইলটদের জন্য বিপদের কারণ হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বনাঞ্চল শকুনে সমৃদ্ধ ছিল। মৃত গবাদি পশু রাস্তাঘাটে পড়ে থাকলে শকুনের কারণে নিমিষেই সাবাড় হয়ে যেত। কিন্তু দুই দশকের বেশি আগে থেকে ভারতে শকুন মারা যেতে থাকে। এর কারণ ছিল অসুস্থ গরুর চিকিৎসায় একধরনের ওষুধের ব্যবহার।
১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি ভারতে শকুনের সংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি। তখন থেকেই আবার গবাদিপশুর চিকিৎসায় সস্তা নন–স্টেরয়েডাল ব্যথানাশক ‘ডাইক্লোফেনাক’ ইনজেকশনের ব্যবহার শুরু হয়। গবাদিপশুর দেহে এই ইনজেকশনের মারাত্মক প্রভাব পড়ে পশুর মরদেহ খাওয়া শকুনের ওপর। বিপুল সংখ্যক শকুন কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় দাঁড়ায়। ওই ওষুধে চিকিৎসা করা পশুর মৃতদেহ খেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর শকুনগুলো মারা যেতে থাকে। ডাইক্লোফেনাক একটি নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ। ইনজেকশনের মাধ্যমে এটি প্রয়োগ করা হয়।

ভারতে যেখানে একসময় ৫০ মিলিয়ন শকুন ছিল সেখানে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি এ সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে ভারতে তিন প্রজাতির শকুন অর্থাৎ সাদা মাথার শকুন ৯৮, লাল মাথার শকুন ৯১ ও ভারতীয় শকুনের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর কারণ হল, গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক নামে ব্যথানাশক একটি ওষুধ। সস্তা এ ওষুধটি শকুনের জন্য খুবই মারাত্মক ছিল। যেসব গবাদি পশুকে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, সেসব পশুর মৃতদেহ খেয়ে বহু শকুনের কিডনি নষ্ট হয়ে যায় এবং মারা যায়। স্টেট অব ইন্ডিয়া’স বার্ডস রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৬ সালে গবাদি পশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর থেকে কিছু এলাকায় শকুনের মৃত্যুও কমতে শুরু করে। তবে শকুনের তিনটি প্রজাতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের সংখ্যা ৯১ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
তবে এখানেই শেষ নয়। গবেষকরা বলছেন, শকুন কমে যাওয়ার ফলে মানুষের মৃত্যুর হারও বেড়েছে। মার্কিন ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রকৃতির ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মী’ এসব পাখি কমে যাওয়ায় খুব সহজেই মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটছে। এসব ব্যাকটেরিয়ার কারণে পাঁচ বছরে অতিরিক্ত ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গবেষণার সহ-লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর হ্যারিস স্কুল অব পাবলিক পলিসির সহকারী অধ্যাপক ইয়েল ফ্রাঙ্ক বলেন, ‘আমাদের পরিবেশ থেকে ব্যাকটেরিয়া ও রোগজীবাণুযুক্ত মৃত প্রাণীগুলো অপসারণে শকুন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’

এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘মানবস্বাস্থ্য রক্ষায় শকুনের ভূমিকা বন্যপ্রাণী রক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। শুধু আকর্ষণীয় ও আদুরে প্রাণীই যে রক্ষা করা প্রয়োজন, তা নয়; বরং সব বন্যপ্রাণীই রক্ষা করতে হবে। আমাদের প্রতিবেশ ব্যবস্থায় সব প্রাণীরই ভূমিকা রয়েছে, যা আমাদের জীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।’
ইয়েল ফ্রাঙ্ক ও গবেষণার অপর সহ-রচয়িতা অনন্ত সুদর্শন ভারতের একসময়ের শকুনসমৃদ্ধ বিভিন্ন জেলায় শকুন কমে যাওয়ার আগে ও পরে মানুষের মৃত্যুর হারের তুলনামূলক চিত্র দেখেছেন। জলাতঙ্কের টিকা বিক্রি, ক্ষ্যাপাটে কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সরবরাহ করা পানিতে প্যাথোজেনের উপস্থিতির মাত্রাও পরীক্ষা–নিরীক্ষা করেছেন।
এই গবেষকেরা দেখেন, গবাদিপশুর চিকিৎসায় প্রদাহবিরোধী বা ব্যথানাশক ওষুধের বিক্রি বেড়ে যাওয়ার পর শকুনের সংখ্যা কমে গেছে এবং একসময়ের শকুনসমৃদ্ধ জেলাগুলোয় মানুষের মৃত্যুর হার ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে।
গবেষণা বলছে, রোগবালাই ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবছর বাড়তি এত মানুষ মারা গেছেন। অথচ শকুন না কমলে এসব রোগের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হতো ও পরিবেশ থেকে ব্যাকটেরিয়া দূর করা যেত। উদাহরণ হিসেবে, শকুন কমে যাওয়ায় ক্ষ্যাপাটে কুকুরের সংখ্যা বেড়ে যায় ও মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক রোগ ছড়ায়। ওই সময় জলাতঙ্কের টিকা বিক্রি বেড়ে যায়; কিন্তু এর সরবরাহ যথেষ্ট ছিল না। মৃত পশুর দেহাবশেষ অপসারণে শকুন যতটা ভূমিকা রাখে, কুকুর ততটা রাখে না। এতে সুষ্ঠু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে সরবরাহ করা খাওয়ার পানিতে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাকটেরিয়া ও প্যাথজেন।

স্টেট অব ইন্ডিয়া’স বার্ডসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে যেসব শকুন রয়েছে, তারা মূলত গবাদিপশুর চেয়ে সংরক্ষিত এলাকার বন্যপ্রাণীর মৃতদেহ খেয়ে টিকে আছে। অব্যাহতভাব শকুন কমতে থাকার বিষয়টি এই পাখির বিরুদ্ধে হুমকি চলমান থাকাকে ইঙ্গিত করছে। একই সঙ্গে তা মানবস্বাস্থ্যের ওপর শকুন কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ এখনো শকুনের জন্য বড় হুমকি। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত গবাদি পশুর মৃতদেহ কমে যাওয়া, ক্ষ্যাপাটে কুকুরের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া ওই সমস্যাগুলো বাড়িয়ে তুলছে।
গবেষণার অপর সহ-রচয়িতা অনন্ত সুদর্শন বলেন, ‘মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপ, শকুনদের বাসস্থান হারানো, বন্যপ্রাণীর ব্যবসা, জলবায়ু পরিবর্তন এসবেরও অনেক প্রভাব রয়েছে পাখিগুলোর ওপর। এমনকি আমাদের নিজেদের ওপরেও।’ মানুষের জন্য উপকারী এ পাখিগুলো সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
মাসুদুর রহমান 




















