পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে তাপপ্রবাহের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিকাজ। কমছে শস্য উৎপাদন। বিশ্বে শস্য উৎপাদনে অন্যতম শীর্ষ দেশ ইউক্রেন। শীতপ্রধান যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটিতে গত জুলাই মাসে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। পূর্ব ইউরোপের আরেক দেশ রোমানিয়ার অবস্থাও তাই। খরায় ভুগছে দেশটির বেশ কিছু অঞ্চল। এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে ফসল উৎপাদনে জরুরি পরাগায়ন প্রক্রিয়া। সব মিলিয়ে পূর্ব ইউরোপের কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে। প্রত্যাশিত খাদ্যশস্য উৎপাদনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ইউক্রেনের আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তা তাতিয়ানা আদেমেংকো মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন; ‘জুলাই মাসের একটানা ১০ দিন তাপমাত্রা ছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে ২০ থেকে ৩০ ভাগ কমে গেছে।’ এদিকে রোমানিয়ার কৃষিমন্ত্রী ফ্লোরিয়ান বারবো কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আর্থিক সহযোগিতা কামনা করছেন।
২০২৩ সালে তীব্র দাবদাহে পুড়েছে ইউরোপ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস জলবায়ু পর্যবেক্ষণ পরিষেবা এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা-ডব্লিউএমও গত বছরের আবহাওয়া তথ্য তুলে ধরেছে। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, গত বছরের জুলাই মাসে দক্ষিণ ইউরোপের ৪১ শতাংশ এলাকা চরম তাপপ্রবাহের আওতায় ছিল। ক্রমবর্ধমানভাবে আরও তীব্র তাপের মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপ। যে তাপমাত্রা মানবদেহের সহ্য ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে। এতে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শ্রমজীবী, বয়স্ক, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা। ২০২৩ সালে প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি এবং গ্রিসের কিছু অংশের মানুষ ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার সম্মুখীন হয়েছিল। ইউরোপে সেবার তাপমাত্রার সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছিল।
যা বলছেন বিশ্লেষকরা
ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে তাপপ্রবাহের মাত্রা বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু সদস্য দেশ এই পরিস্থিতিতে ক্ষতির মুখে পড়ছে, জানালেন জার্মানির ক্লোপেনবার্গের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান কাক টের্মিনহান্ডেলের স্টেফান বাখ। এই বিশ্লেষক বলেন, ইউরোপের দেশ স্পেন এই পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটি কৃষ্ণ সাগর দিয়ে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করে থাকে। যুদ্ধ পরিস্থিতি সামলাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অন্যান্য উৎস থেকে অধিক পণ্য আমদানি করতে হবে বলেও তিনি মনে করেন।
ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থা স্ট্র্যাটেজিস গ্রেইনস এর ধারণা, ২০২৪-২৫ মৌসুমে রোমানিয়াতে খাদ্যশস্য উৎপাদন এক-চতুর্থাংশ কমে আসতে পারে। তবে সংস্থাটি তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে যে তথ্য প্রকাশ করেছে, সেখানে খাদ্যপণ্যের পরিমাণ খুব সামান্যই কমতে দেখা গেছে। কিন্তু পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে কৃষকদের খরার সমস্যা ও উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে বড় প্রভাব ফেলছে ইউক্রেন-রাশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। সব মিলিয়ে কৃষ্ণ সাগর দিয়ে শস্য রপ্তানি অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজার বিশ্লেষক স্টেফান বাখ বলেন, জাতিসংঘের কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে সমুদ্রপথে শস্য পরিবহন চালু হয়েছে, যা অনেকটাই নিরপাদ। এক বছর কোনো বড় সমস্যা ছাড়াই জাহাজ চলাচল সম্ভব হচ্ছে। তবে এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য বেশি উদ্বেগের কারণ হলো যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবহন ও ইনস্যুরেন্স খরচ বৃদ্ধি।
জলবায়ু পরিবর্তনে পানামা খালে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বড় বড় জাহাজের চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। সেইসঙ্গে গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধ চলার সময়ে সুয়েজ খালকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের খাদ্যপণ্য পরিবহনে নেতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
সূত্র: ডয়চে ভেলে
নিজস্ব সংবাদ : 




















