পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে। বাকী অংশ ভারতে। সুন্দরবনের প্রধান উদ্ভিদ বৈচিত্রের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে সুন্দরী, গেওয়া, গরান এবং কেওড়া। সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে খুব সম্ভবত এর প্রধান বিশেষ গাছ সুন্দরীর নাম থেকেই। তবে এখন সুন্দরবনের এই বৈচিত্র্যময় গাছগাছালি পড়ছে অস্তিত্ব সংকটে। অতিমাত্রায় বালি উঠে আসছে বঙ্গোপসাগর থেকে, ঢেকে দিচ্ছে সুন্দরবনের কাদাভরা উপরিতল, এতে চাপা পড়ছে ম্যানগ্রোভ বনের অনন্য বৈশিষ্টের উদ্ভিদগুলোর শ্বাসমূল। বন বিভাগ বলছে, শ্বাসমূলে বালু জমে যাওয়া ও প্রবল ঢেউয়ে গোড়ার মাটি-বালু সরে যাওয়া প্রধানত এই বনের লাখ লাখ গাছকে অস্তিত্বের ঝুঁকিতে ফেলছে।

অন্যদিকে উপকূলীয় এই বনের পানিতেও বাড়ছে লবণাক্ততার মাত্রা। এই দুই কারণে সংকটে সুন্দরী ও গেওয়া । বাড়ছে লবণসহিষ্ণু গড়ান ও কাঁকরা গাছ। ফলে সুন্দরবনের প্রতিবেশগত পরিবর্তন ঘটছে।
শুধু সুন্দরবন নয়, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনভূমির প্রায় সব অংশেই হুমকি এখন বালু এবং অতি লবণ পানি। কুয়াকাটার গঙ্গামতির এলাকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কেওড়া প্রজাতির গাছ মারা যাচ্ছে। ঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলের মানুষের জানমাল রক্ষায় করা এ বনের গাছ মরে যাওয়ার কারণে দুর্যোগ ঝুঁকি বাড়ছে। বন বিভাগের দাবি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে স্ফীত জোয়ারের সাথে সৈকতে বালু জমার কারণে এসব গাছ মারা যাচ্ছে। জোয়ারের সাথে প্রচুর বালু সৈকতে জমছে আর এ বালুতে গাছের গোড়া বা শ্বাসমূল ঢেকে যাচ্ছে। এভাবে শ্বাসমূল ঢেকে যাওয়ায় গাছগুলো মারা যাচ্ছে।

বরগুনার তালতলীর টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনের আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা টেংরাগিরি একসময় সুন্দরবনের অংশ ছিল।
টেংরাগিরি বনের দক্ষিণ দিকের শেষ সীমানায় সোনাকাটা সৈকতের বালিয়াড়িতে অসংখ্য মৃত রেইনট্রি, কেওড়া ও ছৈলা গাছ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। বঙ্গোপসাগরের প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে আরও অসংখ্য গাছের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে শিকড়-বাকড় বের হয়ে গেছে। এখানেও বালুতে গাছের শ্বাসমূল ঢাকা পড়েছে। গাছগুলোর পাতা ও কাণ্ড হলদেটে হয়ে গেছে। ঢেউ ও জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে প্লাবন ভূমির আওতা বেড়ে যাওয়ায় বনের মধ্যে জোয়ার ঢুকে ভূমির ক্ষয় ত্বরান্বিত করছে।

স্থানীয় বয়স্ক বাসিন্দারা উপকূলীয় বনে এমন পরিবর্তন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশি দেখছেন বলে জানিয়েছেন। প্রকৃতি সচেতন ও সুন্দরবনপ্রেমিরা বনের এই বদলে যাওয়া মাটির জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। অনেকেই বলেছেন, অতিমাত্রায় শিল্পায়ন-কার্বন নিঃসরণের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়াচ্ছে। সমুদ্রে লবণাক্ততা বাড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে, ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে নিয়মিত। সিডর, আইলা, আম্পান, রিমালের মতো ঝড় প্রতি মৌসুমে হানা দিচ্ছে উপকূলীয় বনে। সাগর থেকে উঠে আসছে মাত্রাতিরিক্ত বালি। ফলে শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদের অস্তিত্ব হুমকি বাড়ছে।
নিজস্ব সংবাদ : 




















