অমৃত স্বাদে, মন্ত্রমুগ্ধ ঘ্রাণে, রূপালি রূপে ইলিশ বাঙালি সংস্কৃতিতে ‘মাছের রাজা’ হিসেবে সমাদৃত। নদী সাগরের অন্যান্য মাছের পুষ্টিগুণের দিক থেকেও এগিয়ে ইলিশ। অতল সমুদ্র থেকে উঠে আসা আমাদের এই নদীর রাজা ইলিশ। যদিও ইলিশ মাছটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের ইলিশের স্বাদ অতুলনীয়। সেকারণে শুধু ভারত নয় সারা পৃথিবীতেই আমাদের ইলিশের ব্যাপক চাহিদা। ভাদ্র-আশ্বিনে এই মাছের মৌসুম চলে। এসময়ই ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে দূর্গাপূজা শুরু হয়। পূজা উপলক্ষ্যে সেদেশে ইলিশের ব্যাপক চাহিদা বেড়ে যায়। গত কয়েক বছর ধরে ভারতে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ অনেকটা ‘রাজনৈতিক উপঢৌকন’ হিসেবে পাঠানো হতো। কিন্তু এবার টন টন ইলিশ পাঠানো হচ্ছে না।
কারণ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ায় ইলিশ রপ্তানি বন্ধের জের ধরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কম দামে ইলিশ খাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরী হয়েছে।
এবার দুর্গাপূজার আগেই ইলিশ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শেখ হাসিনার আমলে শুরু হওয়া এই ‘ইলিশ কূটনীতি’ পড়েছে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘আমরা ইলিশ রপ্তানি করার অনুমতি দিতে পারি না, যখন আমাদের নিজেদের লোকজন এগুলো কিনতে পারে না। শেখ হাসিনার আমলে পূজার আগে পশ্চিমবঙ্গে টনকে টন পদ্মার ইলিশ গেলেও এবার আর যাচ্ছে না; তাই পূজার আগে ভারতের বাজারে ইলিশের ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং এর জেরে দাম বাড়ছে।’
এনডিটিভি বলছে, বাংলাদেশ থেকে আমদানি হওয়া ইলিশের বেশির ভাগই পেয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গ। এছাড়া দুর্গাপূজা ঘিরে সুস্বাদু এই মাছের চাহিদা আরো বেড়ে যায়। ইন্ডিয়া টুডের খবর অনুযায়ী, আগামী অক্টোবরে দুর্গাপূজা হবে। তার ঠিক আগ মুহূর্তে ভারতে এই মূল্যবান মাছ রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যদিও বিশেষ এই সময়ে খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশ খেতে পছন্দ করেন কলকাতার বাঙালি বাবুরা। বাংলাদেশের সরকার ইলিশ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলেও ভারতের মাছ বাজারে এখনো চড়া দামে পাওয়া যাচ্ছে পদ্মার ইলিশ।
দিল্লির সিআর পার্কের মার্কেটের একজন মাছ বিক্রেতা ইন্ডিয়া টুডেকে বলেন, ‘পাইকারি বাজারের মাছ ব্যবসায়ীরা বলেন, বাংলাদেশ থেকে ইলিশ এখনো মিয়ানমার হয়ে আসছে। এতে ইলিশের দাম বেড়েছে। আমরা এক কেজি ওজনের বাংলাদেশি একটি ইলিশ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। কয়েক মাস আগে এই মাছের দাম কিলোপ্রতি ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। এবারের দুর্গাপূজার সময়ও বাংলাদেশি কিছু ইলিশ পাওয়া যাবে। তবে সেগুলো আসবে বিভিন্ন পথে। কিন্তু সরবরাহজনিত ঘাটতির কারণে ক্রেতাদের টাকা বেশি গুনতে হবে।’
বাংলাদেশে ইলিশের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকায় ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মাছটি রপ্তানি বন্ধ রাখে সরকার। ভারতের জন্য ইলিশ কূটনীতে বরাবরই নমনীয় ছিলেন শেখ হাসিনা। তাই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে যেকোনো উৎসবের আগে ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে পদ্মার ইলিশের বড় বড় চালান পাঠিয়েছেন তিনি। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের নিদর্শন হিসেবে এই নিয়ম অনুসরণ করে আসছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। তবে ভারতে ইলিশ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তার এই নীতি থেকে সরে এসেছে ড. ইউনুসের নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
উল্লেখ্য; গত বছর ২১ সেপ্টেম্বর বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে পদ্মার ইলিশের প্রথম চালান বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে যায়। বরিশাল থেকে পাঁচ টন ইলিশ নিয়ে নয়টি পণ্যবাহী ট্রাক ভারতে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুর্গাপূজার সময় শুভেচ্ছা হিসেবে ৭৯জন মাছ রপ্তানিকারককে ৩,৯৫০ টন ইলিশ ভারতে পাঠানোর অনুমতি দিয়েছিল।
মাসুদুর রহমান 



















