ভৌগলিক অবস্থানতো বটেই, সেই সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের শিকার হচ্ছে প্রতি মৌসুমে। ঝড় চলে গেলেও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত রয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ উপকূলে। নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততার অভিশাপে ভুগছে উপকূলের মানুষ, বিশেষ করে নারীরা। পরিবর্তনে দুর্দশাগ্রস্ত বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের, লবণাক্ত পানির বিপদে থাকা নারীদের কণ্ঠ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে হাজির হয়েছেন পটুয়াখালীর মোসাম্মৎ দুলালী। আজারবাইজানের বাকুতে চলমান জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন কপ ২৯ এ আলাদাভাবে নজর কেড়েছেন উপকূলীয় জেলার কলাপাড়ার এই নারী। তারা মুখেই বিশ্ব শুনছে বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীদের জলবায়ু অভিঘাতের বাস্তব গল্প।
সিডর, আইলার ধ্বংসযজ্ঞ এবং মহাসেন, দীর্ঘস্থায়ী রিমালের ধাক্কা সামলানো দুলালী সুদূর আজারবাইজানের কপ ২৯ সম্মেলনে প্রথম দিন থেকেই নিজ দেশ এবং এলাকার মানুষের দুর্দশার কথা বলে যাচ্ছেন। তিনি বলেন,“ঝড় চলে গেলেও আমাদের জীবন দীর্ঘদিনের জন্য তছনছ করে দিয়ে যায়। অনেকে ঘর-বাড়ি হারিয়ে, সহায়-সম্বল সব হারিয়ে শহরে গিয়ে কাজ খোঁজে। বাঁধ ভেঙে জমিতে লবণপানি ঢুকে যাওয়ায় ফসল ফলে না, মাছ ভেসে যায়।”
দুলালী নিজেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তার জীবনযাত্রার নানা সমস্যা মোকাবিলা করেছেন, সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় বাংলাদেশের উপকূলের লাখো নারীর ভোগান্তিময় জীবন, স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলো তুলে ধরেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার মানুষদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে যাওয়ার মর্মস্পর্শী বর্ণনা তার কণ্ঠে যেন শুনল বিশ্ব। পানিতে লবণের আধিক্য বেড়ে যাওয়ায় কিভাবে উপকূলীয় নারীরা প্রজনন ঝুঁকি, অকাল প্রসব,গর্ভপাত এবং চর্মরোগে ভুগছেন সেসব বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কপ ২৯ সম্মেলনে তুলে ধরছেন কলাপাড়া উপজেলার মধ্য টিয়াখালী গ্রামের নারী দুলালী।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিশ্ব আসর কপ ২৯- এ দুলালী শুধু বাংলাদেশের দুর্দশাই বলে যাচ্ছেন তা নয়, দুর্যোগে দুর্দম্য বাংলাদেশীদের একজন হয়ে বার্তা দিচ্ছেন ঘুরে দাঁড়ানোর। নিজের এলাকার দুর্যোগ আক্রান্ত মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি লড়ছেন। বিশেষ করে দুর্যোগে বাস্তুহারা মানুষের জন্য কাজ করছেন দুলালী। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে স্থানীয়দের সচেতন করছেন, জনপ্রতিনিধি, সমাজের গণ্যমান্যদের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের মতো ভুক্তভোগী দেশগুলোর উপকূলের মানুষ, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার নারীদের হয়ে উন্নত দেশগুলোর সামনে বাস্তবতা তুলে ধরছেন দুলালী। জলবায়ু ন্যায্যতা – ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অধিকার আদায়ে বাংলাদেশের কণ্ঠ তিনি।
গত সোমবার কপ ২৯ এর ভেন্যুতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমরা যদি এখনই পদক্ষেপ না নেই, তবে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণকে আরও অনেক দুর্ভোগের শিকার হতে হবে।”
দুলালীর মতো জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণে ঋণ নয় অর্থায়নের দাবিতে স্বল্পন্নোত-উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিরা সরব এবারের জলবায়ু সম্মেলনে।
এখন দেখার বিষয় দুলালীদের এই জলবায়ু ন্যায্যতার দাবিতে কতটা সাড়া দেয় শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী উন্নত দেশগুলো।
(বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনে ধুঁকতে থাকা বিশ্বকে আশার বার্তা দিতে শুরু হয়েছে এবছরের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন কপ ২৯। আজারবাইজানের বাকুতে ১১ থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই সম্মেলন। জলবায়ু পরিবর্তন রোধের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার এই সম্মেলনে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও চ্যানেল আইয়ের পরিচালক মুকিত মজুমদার বাবুর নেতৃত্বে অংশ নিচ্ছেন ফাউন্ডেশনের এনভায়রনমেন্ট মিডিয়া কনটেন্ট স্পেশালিস্ট শাফরিনা খাতুন , সিনিয়র ক্যামেরাপার্সন বিল্লাল হাওলাদার, চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি আলীম আল রাজি।
কপ ২৯ সম্মেলনস্থল বাকু,আজারবাইজান থেকে প্রতিদিনের সংবাদ পাঠাচ্ছেন তারা। প্রতিবেদনগুলো নিয়মিত প্রকাশ করছে প্রকৃতিবার্তা অনলাইন।)
প্রকৃতি ও জীবন 










