মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এ বছর অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের একটি বাংলাদেশ। গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ৬ কোটি মানুষ দীর্ঘ সময় মারাত্মক গরমের মুখোমুখি হয়েছে। এই তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে।
এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে বিজ্ঞানী ও সাংবাদিকদের সমন্বয়ে জলবায়ু বিজ্ঞান ও এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রাল। সম্প্রতি বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের ক্ষতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর ক্লাইমেট সেন্ট্রালের প্রতিবেদনেও উঠে এলো দেশের ভয়াবহ দুর্ভোগের কথা।
বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী: ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রার মুখোমুখি মানুষের সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে ১০ম স্থানে রয়েছে। দেশে প্রায় ৫৭ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ) ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে এমন গরম সহ্য করেছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে ৩০ মিলিয়ন মানুষ বিশেষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ৩০ দিন এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, রাজধানী ঢাকা বিশ্বের মেগাসিটিগুলোর মধ্যে দশম স্থানে রয়েছে, যেখানে ৫২ দিন তাপমাত্রা মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্তত দ্বিগুণ বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে।
ক্লাইমেট সেন্ট্রাল বাংলাদেশের তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোর বিস্তারিত চিত্রও তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়েছে, রংপুরে গড়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা, ৩৭ দিন ঝুঁকিপূর্ণ গরম, অনুভূত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঢাকায় ৫২ দিন তাপমাত্রা দ্বিগুণ সম্ভাবনাময়, ২৩ দিন ঝুঁকিপূর্ণ গরম, যার ১৫ দিন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। চট্টগ্রামে দেশে সর্বোচ্চ ৫৯ দিন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখা গেছে। খুলনা, রাজশাহী ও গাজীপুরে প্রতি শহরেই দুই অঙ্কের সংখ্যায় ঝুঁকিপূর্ণ গরমের দিন বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে তাপপ্রবাহের বৈশ্বিক অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই মৌসুমে প্রতিদিন বিশ্বের প্রতি পাঁচজনের একজন বা অন্তত ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মানুষ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছে। প্রায় ৯৫৫ মিলিয়ন মানুষ অতিরিক্ত ৩০ দিনেরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ গরম সহ্য করেছে। মোট ১৮৩টি দেশের মানুষ অন্তত ৩০ দিন এমন তাপমাত্রার সম্মুখীন হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্তত দ্বিগুণ সম্ভাবনাময় ছিল। ইউরোপ ও এশিয়ায় সবচেয়ে অস্বাভাবিক গরম রেকর্ড করা হয়েছে।
ক্লাইমেট সেন্ট্রালের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. ক্রিস্টিনা ঢাল বলেন, এই বিশ্লেষণ নিশ্চিত করে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা। অস্বাভাবিক গরম ইতোমধ্যে মানুষের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কার্বন নিঃসারণ কমাতে দেরি মানে আরও বেশি মানুষ, অর্থনীতি ও প্রকৃতি ক্ষতির মুখে পড়বে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘায়িত গরম এরই মধ্যে চরম আবহাওয়া সৃষ্টি করেছে: ইউরোপে রেকর্ডভিত্তিক ভয়াবহ দাবানল, কানাডায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দাবানলের বছর এবং যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ বন্যা। এমনকি শীতল দেশ হিসেবে পরিচিত ফিনল্যান্ড ও নরওয়েতেও টানা কয়েক দিন রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রা দেখা গেছে। এই দীর্ঘায়িত গরম সারা বিশ্বে বিপর্যয়কর অগ্নিকাণ্ড ও বন্যার মতো দুর্যোগকে আরও তীব্র করেছে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 




















