পাকিস্তানের জাতীয় পশু ছাগল। এমনকি দেশটির গোয়েন্দাসংস্থা আইএসআইয়ের নামে গুগল সার্চ দিলে কয়েকটি লোগো দেখা যায় সেসবেও ছাগলের মুখে সাপ! যদিও সেটা অফিসিয়াল লোগো নয়। তবু ছাগলের মুখে সাপ নিয়ে এত মাতামাতি কেন?
আর ছাগল একটি দেশে এত গুরুত্বই বা কেন পেল! তবে এ ছাগল যে-সে ছাগল নয়। বিশেষ জাতের এই ছাগলের নাম মারখোর।
যদিও মারখোর নাম হওয়ার কারণে এই ছাগল নিয়ে বিতর্কও কম নয়। কারণ ফার্সি ভাষায় মারখোর মানে হলো সাপখেকো। প্রশ্ন জাগতে পারে, তবে কি সাপ খায় বলেই ছাগলের নাম মারখোর?
ছাগল সাপ খায় কিনা, সাপ খায় বলেই এর নাম মারখোর কিনা এসব প্রশ্নের উত্তর একটু পরে জানা যাক। আগে জানা যাক কেন পাকিস্তানের জাতীয় পশু এই ছাগল।
মারখোর হল ছাগল পরিবারের অন্যতম বৃহত প্রজাতি। এটির বৈজ্ঞানিক নাম ক্যাপরা ফ্যালকনেরি। এদের লোমের আবরণ হয় ধূসর, হালকা বাদামী থেকে কালো রঙের এবং গ্রীষ্মকালে তা ছোট ও মসৃণ থাকে যা শীতকালে লম্বা ও ঘন হয়ে যায়। পায়ের নিম্নাংশের পশম সাদা কালো। পুরুষদের চিবুকে, গলদেশে, বক্ষে ও জঙ্ঘায় লোম স্ত্রীদের তুলনায় লম্বা হয়ে থাকে। স্ত্রীরা গাত্রবর্ণে পুরুষদের থেকে বেশি লালচে, ছোট লোম ও খাটো কালো দাঁড়ি বিশিষ্ট এবং কেশরহীন হয়।

এই প্রজাতির ছাগল সাধারণত পাকিস্তান, আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ তাজিকিস্তান, দক্ষিণ উজবেকিস্তান, ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে পাওয়া যায়। মারখোর একটি বিপন্ন প্রজাতির বুনো ছাগল।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) মারখোরকে বিপন্নশ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। পৃথিবীতে এই প্রজাতির মাত্র ৩ হাজারের কম-বেশির মতো প্রাণী টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। গত দুই প্রজন্মে ২০শতাংশ সংখ্যা কমেছে এই প্রাণীর। বিরল এই প্রাণীটিই পাকিস্তানের জাতীয় পশু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
পাকিস্তানের ওয়াইল্ডলাইফ ইকোলজিস্ট ড. ওয়াসিম আহমাদ মারখোর ছাগল কেন পাকিস্তানের জাতীয় পশু সেটা নিজের মতো ব্যাখ্যা করেছেন।
তার মতে, পাহাড়ের খাড়া দেয়াল মারখোরের কাছে পছন্দের চারণভূমি! হ্যাঁ, তুষার চিতা,নেকড়ের মতো শিকারির হামলা থেকে বাঁচতে এরা এমন দুর্গম জায়গায় চরে বেড়ায়। রুক্ষ প্রান্তরে, বরফে ঢাকা ঘাস খেয়েও এরা দিব্যি বেঁচে থাকে। আর পাকিস্তানের প্রায় সব প্রদেশেই মারখোর ছাগল চরে বেড়ায়। বেশ চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতেও টিকে থাকে। সব মিলিয়ে এসব কারণেই এটি এদেশের জাতীয় পশু।
বিভ্রান্তি
কথিত আছে যে মারখোর সাপ মেরে খায়। জাবর কাটার পর এর মুখ থেকে একটি ফেনাজাতীয় পদার্থ বের হয় যা মাটিতে পড়ে শুঁকিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন এই জিনিসেরই খোঁজে থাকে কারণ বিশ্বাস করা হয় যে এর মধ্যে সাপের বিষ তোলার ক্ষমতা আছে।
এ কারণেই মারখোরের নাম এবং এই ছাগল সাপ খায় বলে বিভ্রান্তি চালু আছে বলে ধারণা করে প্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
ড. ওয়াসিম বলেন, ‘লোকজনের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে যে এই ছাগল সাপ খায়, এজন্যই একে মারখোর বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রকৃতিই এই প্রাণীটিকে তৃণভোজী প্রাণী হিসেবে সৃষ্টি করেছে, মাংস খাওয়ার জন্য এর পরিপাকতন্ত্র তৈরি হয়নি।
পাকিস্তানি এই প্রাণীবিদ বলেন, ‘নামের কারণেই মারখোর নিয়ে বিভ্রান্তি। এটা বেশ প্রচলিত আছে যে ফারসি শব্দ মার (সাপ) এবং খোর (খেকো) থেকে এই ছাগলের নাম মারখোর। অর্থাৎ অবশ্যই এই ছাগল আসলে সাপ খায়। কিন্তু আসলে এই ধারণা ভুল, বিভ্রান্তিকর।’

মূল ব্যাপারটি হলো এই ছাগলের শিং। সাপের মতো পেঁচানো শিং-এর কারণে মারখোরের আরেক নাম “সাপশিঙি”। মারখোর শব্দটি আসলে পশতু শব্দ থেকে আসা মূল শব্দের কিছুটা বিকৃতি। মারখোর নামটি ফারসি নয় পশতুন থেকে এসেছে দাবি করে ড. ওয়াসিম বলেন, ‘দু’টি ফারসি শব্দ নয় বরং দু’টি পশতু শব্দ থেকে এই ছাগলের নাম এসেছে। মার শব্দটির অর্থ পশতু এবং ফারসিতে একই, অর্থাৎ সাপ। কিন্তু পরের শব্দটিতেই বিপত্তি। পশতুতে এই ছাগলের শুদ্ধ নাম মার-আখর। পশতুনে আখর মানে হলো শিং। অর্থাৎ মারআখর অর্থ সাপ-শিঙি, যা কালক্রমে বিকৃত হতে হতে মারখোর হয়ে গেছে।’
নাসিমুল শুভ 




















