বর্ষা মানেই মেঘ-সূর্যের লুকোচুরি খেলা। বর্ষা মানেই টিনের চালে জলনূপুরের ছন্দ। বর্ষা মানেই গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে শুকনো মৃত্তিকা স্তর ফাটা হাওর-বাওড়, পুকুর-খালবিল। নদীনালা কানায় কানায় ভরা যৌবনের উচ্ছ্বলিত আবেগ। ওষ্ঠাগত প্রাণ নিয়ে কাদার ভেতর বেঁচে থাকা জলজ প্রাণের স্পন্দন ফিরে পাওয়ার অনাবিল আনন্দ। বর্ষা মানেই তৃষ্ণার্ত চাতকের পরিতৃপ্তি। র্ব্ষা মানেই গাঢ় সবুজের পাতা গড়িয়ে টাপুর টাপুর কাব্যিক ছন্দের গাঁথুনিমালা। বর্ষা মানেই প্রকৃতির পুণ্যস্নান। নতুর উদ্যমতা নিয়ে জেগে উঠার গল্প। বর্ষা মানেই কদম, কেয়া, কামিনী টগর জুঁই, পদ্ম, মালতী, রজনীগন্ধাসহ নানা সাদা ও রঙিন ফুলেদের সৌরভমাখা মাদকতায় মাতাল মনের পরম তৃপ্তি। যুগ যুগ ধরে কবি-সাহিত্যিক মুগ্ধ হয়েছেন নব বর্ষার নব রূপবৈচিত্র্য-
‘‘মেঘ-যামিনী অতি ঘন আন্ধিয়ার
ঐছে সময়ে ধনি করু অভিসার
কিংবা, ‘‘দেখ ময়নামতী প্রথম আষাঢ়
চৌদিকে অম্বর সাজে গম্ভীর।
শ্যামল অম্বর শ্যামল খেত- খেতি।
শ্যামল লখি দশ দিশ দিবসক যুতি।’’…
বৈষ্ণব পদাবলী থেকে মধ্যযুগের কবিদের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে বর্ষার প্রকৃতি। মহাকবি কালিদাসের বর্ষা ঋতু নিয়ে অনবদ্য সৃষ্টি ‘মেঘদূত’। এ মহাকাব্যে আষাঢ়্স্য প্রথম দিবসে বিরহ কাতর যহ্ম মেঘ’কে দূত করে কৈলাশে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। বাঙালির চিত্তে, অনাদিকাল ধরে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল বর্ষাসাহিত্য ভাণ্ডারকে করেছেন আরো সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। জীবনানন্দ দাশ বর্ষাকে এঁকেছেন নতুন ছন্দে। সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকরাও বর্ষার মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে কম আঁকেননি তার ছবি।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বর্ষা আসে অবিরল বারিধারার বারতা নিয়ে, নতুন ফসল বোনার স্বপ্ন নিয়ে, সবুজ পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে। এমন কোনো বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে না যার হৃদয়ে পড়েনি বর্ষার কোনো জলছাপ। হতে পারে সেটা বেদনাবিধূর কিংবা মিলনের পরম তৃপ্তি। আমার বয়স তখন দশ কি বারো। চলমান সময়ের মতো তখনো বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিয়ে বর্ষায় ঈদ এসেছে। কিন্তু ঈদের আনন্দ শুরু হয়েছে পবিত্র মাহে রমজানের রোজা শুরুর সাথে সাথে। আমাদের তখন যৌথ পরিবার ছিল। পরিবারের সবাই রোজা রাখতেন। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তেমন একটা ধরাবাধা নিয়ম ছিল না। তবুও আমরা রাতে বড়দের ঘুম ভাঙার সাথে সাথে জেগে উঠতাম। খুব মজা করে পরিবারের অন্যদের সাথে সেহরি খেতাম। বাকি রাত আর ঘুম হতো না। বাবা বিছানায় গড়াগড়ি দিতেন। মায়ের দিনের কাজ শুরু খুব ভোর থেকে। আস্তে আস্তে দিনের আলো ফুটতো ফুল ফোটার মতো। যত সময় গড়াতো আমরা বাচ্চারা ততই দুর্বল হয়ে পড়তাম। এক সময় মা জোর করে আমাদের রোজা ভাঙাতেন।
অবশ্য মনে মনে আমরাও সেটাই চাইতাম। এভাবে আগত ঈদের আনন্দ নিয়ে রোজার অধিকাংশ দিন কেটে যেতো। ঈদের কয়েক দিন আগে বাবা আমাদের পাঁচ ভাইবোন ও মাকে সাথে নিয়ে যেতেন ঈদের কেনাকাটা করতে। নিজের জন্য কিনতেন পাজামা-পাঞ্জাবি, লুঙ্গি- গেঞ্জি। আমাদেরকেও কিনে দিতেন জামা-কাপড়ের সাথে পাজামা-পাঞ্জাবি। পরিবার ও অন্যদের জন্যও থাকতো নতুন জামা-কাপড়, জুতা স্যান্ডেল। বাবার দেওয়া আমাদের পচ্ছন্দের সেই জামা-কাপড় পেয়ে খুশিতে ডগমগ করে উঠতো চোখ। ঈদে জামা-কাপড় পাওয়ার খুশি অন্য সময়ের চেয়ে থাকতো আলাদা। এভাবেই দিন গড়িয়ে আসতো চাঁদরাত। অপেক্ষমাণ চাঁদরাত পেরিয়ে কখন ভোর হবে, কখন গায়ে দেব ঈদের নতুন জামা সেই চিন্তাই ঘোরাফেরা করতো মাথার ভেতর। রাত যেন কিছুতেই ভোর হতো না। ঘুমের ভান করে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম ঈদের দিনের কথা। কি যে ভালো লাগায় মন ভরে উঠতো তা বোঝাবার নয়। তারপর সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়তাম। কাক ডাকা ভোরে মা ডেকে তুলতেন আমাদের। দুই ভাইকে গোসল করিয়ে নতুন পাঞ্জাবি-পাজামা পড়িয়ে বাবার সাথে নামাজ পড়তে পাঠাতেন। সেই সকাল থেকেই মা ঈদের রান্না-বান্নার কাজে লেগে পড়তেন। মাঝে মধ্যে বোনরা মাকে এটা সেটা দিয়ে সাহায্য করতেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সে ঈদটাও ছিল বর্ষা ঋতুতে। আকাশ কালো করে গুরুগম্ভীর মেঘমালা কান্না হয়ে ঝরে পড়তে শুধু বাকি। বাবার সাথে নামাজ পড়া শেষে তাড়াহুড়া করে যাই পাড়ার বন্ধুদের বাসায় তাদের বাবা-মাকে সালাম করে ঈদের সালামী পাবার আশায়। সালামীর পাশাপাশি সেমাই, ফিরনি, জর্দ্দাসহ বিভিন্ন খাবার খেয়ে ফিরে আসি বাসায়। তারপর আবার বেরোনোর পালা। কিন্তু বাইরে ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে নেমেছে ঝুম বৃষ্টি। কচি সবুজ মন দুরন্তপনা ভুলে ঈদের নতুন জামা-কাপড় পরে বন্দি থেকেছি ঘরের চার দেয়ালের মাঝে। জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম থেকে জেগে উঠেছি মায়ের ডাকে। বৃষ্টি থেমে গিয়ে চারপাশটা তখন ভরে উঠেছে চকচকে রোদ্দুরে। আবার অপেক্ষা করছেন আমাদের সাথে করে বাইরে যাবেন বলে। ভরা বর্ষায় চকচকে রোদ্দুরের মতো আমাদের চোখগুলোও তখন চকচকে করে উঠতো বাবার সাথে ঘুরতে যাওয়ার আনন্দে। এইতো সেদিনের কথা। অথচ অনেক দিন, মাস, বছর, যুগ পেরিয়ে গেছে।
ঝিলমিল ঝিলমিল ঝিলের জলে ঢেউ খেলিয়া যায়
ঝির ঝির হাওয়ায় ঢেউ খেলিয়া যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল রোদ ঝিলমিল
ঝিলমিল ঝিলমিল পাখির বিল।

আমাদের বাসার পেছনের দিয়ে তাকালেই চোখে পড়তো গলাভরা বিশাল ঝিল। ঝিলপাড়ে গোসলের সুবিধার জন্য তৈরি করা হয়েছিল ঘাট। সেখারে অবাধে সাঁতার কাটতো ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁস। ডাহুকের দল ছিল। পানকৌড়ি চোখে পড়তো খুব। ছোট ছোট কয়েকটা নৌকা ও কলাগাছের ভেলা ছিল পানিতে চলাফেরা করার জন্য। ঝিলপাড়ে ছিল আম, জাম, কাঁঠাল, জামরুল, নারকেল, খেজুর গাছসহ নানা প্রজাতির গাছ। শীতকালসহ প্রায় সব শৌসুমেই ঝিলে মিলতো পরিযায়ী পাখির মেলা। বাসা বাঁধত পাশেই থাকা মস্তবড় বাঁশঝাড়সহ আশপাশের গাছে। অদ্ভূত ছিল তাদের চলন-বলন। গায়ের রঙেও ছিল বৈচিত্র্যতা। বাঁশঝাড় মুখরিত থাকতো নানা প্রজাতির পাখি মেলায়। ঝিলপাড়টা আমার খুব প্রিয় ছিল। সময় কাটাতে আমি প্রায়ই ওখানে গিয়ে বসতাম। বলতে গেলে ঝিলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। বাতাসে ঝিলের পানির কাঁপন, পানিতে সূর্য ডোবার মোহনীয় সেই দৃশ্য, নাম না জানা লতাগুল্মের ঠাসাঠাসি ধাপ, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির আসা-যাওয়া এক অন্য রকম ভালো লাগার পরিবেশ তৈরি করতো ঝিলপাড়ে। কাকচক্ষু ঝিলের পানিতে জন্ম নিয়েছিল নানা প্রজাতির উদ্ভিদ। পানির ওপর তারা বাতাসে দোল খেতো। মাছরাঙা ঝুপ করে পানিতে ডুব দিয়ে কিছুক্ষণ পরে আবার উঠতো মাছ মুখে করে। দেখে খুব ভালো লাগতো। মনে মনে আমি ভাবতাম আমি যদি ওদের মতো পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মাছ ধরতে পারতাম! ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি কাটিয়ে দিতাম একা একা ঝিল পাড়ে।
ঝিলে বরশিতে মাছ ধরার জন্য আমার আর ভাইয়ের একটা নির্দিষ্ট স্থান ছিল। স্কুল ছুটির দিনে কিংবা বিকেল বেলা খেলা রেখে প্রায়ই মাছ ধরতাম। শোল, টেংরা, খলিশা, মেনিমাছ, কই, টাকি, মাগুর, পুঁটিসহ নানা প্রজাতির মাছ উঠতো বরশিতে। শুধু আমি না, বিকেল নামলেই ঝিলপাড়ে অনেক বাড়ির ছেলেমেয়েরা বরশি নিয়ে মাছ ধরতে আসতো। এখন বিদেশি মাছের দাপটে দেশি মাছ দেখাই যায় না। তখন কালেভদ্রেও আমরা কোনোদিন বিদেশি মাছ দেখিনি। দেশি মাছই ছিল আমিষের জোগানদাতা। স্বাদেও ছিল মজাদার। মায়ের হাতের ছোট মাছের ঝোলের স্বাদ যেন আজো মুখে লেগে আছে।

চারপাশ অন্ধকার করে ঝুম বৃষ্টি নামলে অনেকবার বসে থেকেছি ঝিলপাড়ে। সাদা সুতা বেয়ে নেমে আসা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দুহাত দুদিকে প্রসারিত করে বৃষ্টির অমৃতসুধা পান করেছি। কখনো মা-বাবার শাসন ডিঙিয়ে বন্ধুদের সাথে বৃষ্টির মধ্যে ভেলায় করে ঝিলের জলে ভিজেছি অনেকবার। শাপলা তুলেছি। শাপলা দিয়ে মালা গেঁথে গলায় পরেছি। আমার বোনদের দিয়েছি। বাসায় নিয়ে এসে মায়ের কাছে আবদার করেছি রান্না করে দেবার জন্য। গোসল করেছি। সর্দি লাগিয়ে অনেকবার জ্বর বাধিয়েছি। তারপরও ঝিলের মায়া ছাড়তে পারিনি। আজও শরীরে লেগে আছে ফেলে আসা সেই বৃষ্টিজলের গন্ধ। ঝিলে তখন নানা জাতের সাপ, জোঁক, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ নানা ধরনের পোকামাকড় ও হরেক রকমের মাছ ছিল। পানিতে কোনোদিন সাপ দেখলে সেদিনের মতো ঝিলে যাওয়া বন্ধ। সাপের ভয় ছিল বলেই মা বার বার আমাকে সাপের ভয় দেখিয়ে ঝিলপাড়ে যেতে নিষেধ করতেন। তখন আমার ভেতর একটা ধারণা ছিল যে, সাপে কাটলে বুঝি মানুষ বাঁচে না। অনেক অনেক দিন পর আমার এই ভুল ভাঙে। আসলে সব সাপই বিষধর নয়।
আজ আর সেই ঝিল নেই। নেই জোঁক-সাপ, পোকা-মাকড়ের ভয়। ঝিল হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ-প্রাণী। পঞ্চাশ বছর আগে ঢাকা আর আজকের ঢাকার ভেতর অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এসেছে। সেদিনের সেই না শহর না গ্রামটি আজ হয়ে উঠেছে ইট-পাথরের বস্তি। ঢাকাতে আমার সে প্রিয় ঝিল হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। ঝিলের জায়গা দখল করে নিয়েছে আকাশছোয়া অট্টালিকা। আজকের ঢাকার সাথে আমার ছেলেবেলার ঢাকাকে কোনোভাবেই মেলাতে পারি না। প্রকৃতির শীতল ছায়া আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না কোনো খানে। হারিয়ে গেছে খেলার মাঠ, চারপাশ ঘিরে থাকা সবুজ বৃক্ষ, পাখির কলরব, ব্যাঙের ডাক, ঝিঝির চি চি শব্দ, শিয়ালের হুক্কা হুয়া…। তারপরও মন থেকে মুছে যায়নি ঝিলের পাড়, পানি, বরশিতে মাছ ধরা, পরিযায়ী রঙ-বেরঙের পাখি, ঝুম বৃষ্টিতে ভেলায় ভেসে বেড়ানোর দিনগুলোর কথা। শুধু ঢাকাই নয়; পরিবর্তনের ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে পুরো দেশটাই। যন্ত্রের মতো মানুষ এ শহরে চলাফেরা করছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে গড়ে তুলছে সুখের প্রাসাদ। আসলে ওই প্রাসাদে সুখের চেয়ে অসুখই বেশি। বেসামাল জনসংখ্যায় দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে দেশ। সাথে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা। পঞ্চাশ বছর আগের ঢাকা আর আজকের ঢাকাকে আমরা কোনে ব্যবধানের সূচিতে অভিহিত করবো সেটা কি আজই আমাদের ভেবে দেখা উচিত নয়?
লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন
মুকিত মজুমদার বাবু 




















