জয়পুরহাটের প্রধান অর্থকরী ফসল ‘ডায়মন্ড’! হীরা নয় আলুর একটি জাত। মূলত উত্তর এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের এই জেলায় ডায়মন্ড, গ্র্যানুলা জাতের আলুই বেশি চাষ হয়। তবে এখন জয়পুরহাটের জমিতে ‘ডায়মন্ড’ ফলানোর সঙ্গে চলছে রুবি বা চুনিরঙা লাল স্ট্রবেরির চাষ। চিরচেনা আলুর খেতে এপ্রিল পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে চুনিরঙা স্ট্রবেরির হাসি। কারণ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে চারা রোপণ করে এপ্রিল পর্যন্ত ফলন পাচ্ছেন স্ট্রবেরি চাষীরা।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসচেতনভাবেই স্ট্রবেরির চাষ করছেন সদর উপজেলার জামালপুর ও আশেপাশের গ্রামগুলোর স্ট্রবেরি চাষীরা। স্ট্রবেরি চাষী রিপন বলেন, ‘বাচ্চারা স্ট্রবেরি খুব পছন্দ করে। তাদের বা বয়স্কদের কারও ক্ষতি হবে এমন কোনো কিছু দিয়ে আমরা স্ট্রবেরি ফলাই না। স্ট্রবেরি গাছে ফুল আসার পর আর তেমন কীটনাশক দেয়ার দরকার পড়ে না।’

কিন্তু এই ফসলের সরবরাহ পথ সহজ নয়। খুচরা বাজারে স্ট্রবেরির দাম কেজি প্রতি ১,৫০০–২,৫০০ টাকা, অথচ উৎপাদক কৃষক এর অর্ধেকও পান না। পরিবহণ ঝুঁকি, আড়তদারের বিভিন্ন চাঁদা, সংরক্ষণ সংকট এবং দুর্বল বাজার সংযোগ- সব দায় চাষীর ঘাড়ে। ফল লোড হলো গাড়িতে, কিন্তু টাকা কখন হাতে আসবে তা জানা নেই। মৌসুম এলেই আড়ৎদারদের আঁতাত, বাজার ওঠা হলেও চাষীর ঘরে সুফল পৌঁছায় না। স্ট্রবেরি চাষীরা যেন নিঃসঙ্গ।
এই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে, গবেষণা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সংস্থা ‘ডাহুক’ উত্তরাঞ্চলের চাষীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ হিসেবে শুরু করেছে ‘এক্সপিডিশন নর্থ’- ‘একটি গ্রাম সংযুক্তিমূলক সমন্বিত ফল পরিবহণ ও বিপণন ব্যবস্থা।’

ডাহুকের মতো সংস্থাকে পাশে পেয়ে সরবরাহ চ্যালেঞ্জ সহজ হওয়ায় আরেক স্ট্রবেরি চাষী জুয়েল বলেন, ‘আমরা ধান, আলুর পাশাপাশি স্ট্রবেরি চাষ করছি। সমস্যা ছিল স্ট্রবেরির দাম পাওয়া নিয়ে, এছাড়া দেরী হলে পচনের ঝুঁকিও ছিল। কিন্তু এখন প্রথাগত ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে নতুন এই ব্যবস্থায় স্ট্রবেরি বিক্রি করে আমরা আগের চেয়ে ভাল দাম পাচ্ছি। এখন আর আড়ৎদার-মজুদদারদের ইচ্ছানুযায়ী আমাদের জিম্মি হতে হচ্ছে না।’
ডাহুকের প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক মাগফি রেজা সিদ্দিক বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের চাষীরা নিজেদের সম্মিলিত শক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে এখন দেশের যেকোন প্রান্তে ফল পৌঁছে দিতে সক্ষম। ঢাকায় মাত্র ৫ ঘণ্টায়, চট্টগ্রামে ১০ ঘণ্টায়, সারা দেশে সহনীয় খরচে। চাষীরা সরাসরি খেত থেকে ফল বিক্রি করছেন বাজার মূল্যের প্রায় অর্ধেকে, যা তাদের জন্য ন্যায্যতা ও মর্যাদার প্রতীক।’

তিনি ডাহুক ও এক্সপিডিশন নর্থ উদ্যোগ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘দেশব্যাপী সামাজিক ব্যবসা নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করছে ‘ডাহুক’। দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে এক ছাতার নিচে এনে গুছিয়ে উপস্থাপন করতে ‘এক্সপিডিশন নর্থ’ বা উত্তরাভিযান নামের এক বিশেষ আমব্রেলা প্রকল্প নিয়ে এগুচ্ছে সংস্থাটি।’
আরও জানান, ইতোমধ্যে ডাহুকের সহায়তায় চর ও হাওর অঞ্চলে ইতিমধ্যেই আটটি নিবন্ধিত সমবায় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের দুই জেলায় সমবায় ভিত্তিক একই প্রক্রিয়া চলছে। এই উদ্যোগ শুধু ফসল বা অর্থ নয়, বরং কৃষকের ঘাম, সাহস ও উদ্ভাবনের ওপর ভিত্তি করে নতুন আশা, মর্যাদাপূর্ণ জীবিকা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের শক্ত ভিত্তি স্থাপন করছে।

এই সংগঠক এবং নতুন ধারার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা এই তরুণ বলেন , ‘আমরা বিশ্বাস করি, কৃষকের সম্মিলিত একতা, যৌক্তিক অংশগ্রহণ এবং কার্যকর লজিস্টিক শক্তি এই প্রাচীন নিঃসঙ্গতা ভাঙতে পারবে। এই যাত্রায় যে কেউ- বন্ধু, প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অংশ নিতে পারেন। চাষীর অতি যত্নে চাষ করা এই আকর্ষণীয় ফল দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আনন্দ এবং ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা আমাদের জন্য সত্যিই অনন্য অভিজ্ঞতা। এই উদ্যোগে সমর্থন ও অংশগ্রহণকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। আমাদের এই উদ্যোগ সম্পর্কে আরও জানতে এবং চাষীর কাছ থেকে স্ট্রবেরি নিতে চাইলে +880 1400-068489 অথবা +8801718747243 এই নম্বরে কল দিতে পারেন।’

সরকারি সহায়তা বা প্রচলিত কৃষি কাঠামো না থাকলেও, চাষীরা নিজের ঘাম, শ্রম ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে স্ট্রবেরিকে অর্থকরী করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই উদ্যোগ উত্তরের মানুষদের সাহস, দৃঢ়তা, প্রথা ভেঙে নতুন কিছু করার চেষ্টা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর দারুণ এক দৃষ্টান্ত হবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
নাসিমুল শুভ 



















