ঢাকার লেকগুলোর মাছে উচ্চ মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক, ঝুঁকিতে নগরবাসী   

ঢাকার লেকগুলোর মাছে উচ্চ মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক, ঝুঁকিতে নগরবাসী   

রাজধানী ঢাকাকে শীতল রাখার অন্যতম উৎস এর কয়েকটি জলাধার। কিন্তু ঢাকার নামকরা গুলশান, ধানমণ্ডি ও হাতিরঝিল লেকের পানি এখন মানবদেহের জন্য নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘হেলিয়ন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, এসব লেকের পানি, তলানির কাদা তো বটেই, এমনকি সেখানে থাকা মাছের শরীরেও মিশে গেছে উচ্চমাত্রার ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, ঢাকার এসব লেক থেকে ধরা ৯৩ শতাংশ মাছের শরীরেই রয়েছে এই মারাত্মক প্লাস্টিক কণা, যা মাছের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে ক্যানসারসহ নানা জটিল ও মরণব্যাধির ঝুঁকি তৈরি করছে।

গবেষক ফারিহা তাহসিন মার্সি, অধ্যাপক এ.কে.এম রাশিদুল আলম এবং মো. আহিদুল আকবরের যৌথ পরিচালনায় ‘অ্যাবানডেন্স অ্যান্ড ক্যারেক্টারিস্টিকস অব মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন মেজর আরবান লেকস অব ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণাটি ঢাকার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের এক চরম বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছে।

সবচেয়ে বড় আতঙ্ক: লেকের মাছে বিষাক্ত প্লাস্টিক

গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও গুরুতর দিকটি হলো ঢাকার লেকের মাছের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব। তেলাপিয়া, কাতলা ও শোলসহ সাতটি প্রজাতির মোট ৯০টি মাছের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, গড়ে প্রায় ৯৩% মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়েছে।

  • মাছ দূষণে শীর্ষে ধানমণ্ডি লেক: পানিতে দূষণের মাত্রা গুলশানের চেয়ে কম হলেও, মাছের শরীরে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে ধানমণ্ডি লেক।
  • একটি মাছে ১৭টি কণা: ধানমণ্ডি লেকের একটিমাত্র তেলাপিয়া মাছের ভেতরে সর্বোচ্চ ১৭টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এই লেকের প্রতিটি মাছে গড়ে ৮.২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে।

বিশেষজ্ঞের কড়া হুঁশিয়ারি: ‘বিনামূল্যে দিলেও এই মাছ খাবেন না’ দেশের প্রখ্যাত পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত এ বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, মানুষের উচিত ঢাকার এই দূষিত লেক ও নদীর মাছ খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা। কেউ যদি আপনাকে ধানমণ্ডি, গুলশান বা বুড়িগঙ্গার মাছ বিনামূল্যেও দেয়, দয়া করে তা খাবেন না। এসব জলাশয় চরম দূষিত ও বিষাক্ত। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ইতিমধ্যে একটি বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।”

গুলশান ও হাতিরঝিল এখন প্লাস্টিকের ‘খনি

গবেষকদের মতে, ঢাকার গুলশান ও হাতিরঝিল লেক বর্তমানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ‘সিঙ্ক’ বা স্থায়ী আধারে পরিণত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ নগর-বর্জ্য এখানে এসে জমা হলেও পানি বের হওয়ার কোনো পর্যাপ্ত পথ নেই।

  • গুলশান লেকের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়: মাত্রাতিরিক্ত শিল্পবর্জ্য এবং পয়োনিষ্কাশন লাইনের সরাসরি সংযোগের কারণে গুলশান লেক প্লাস্টিক বর্জ্য দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এর উপরিভাগের পানিতে প্রতি লিটারে ৩৬টি এবং তলানির কাদার প্রতি কেজিতে ৬৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
  • গুলশান লেকের পানির গুণমান এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, তা এখন জলজ প্রাণীর বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রাও গ্রহণযোগ্য সীমার নিচে।
  • অন্যদিকে, আবাসিক এলাকায় অবস্থানের কারণে ধানমণ্ডি লেকের পানিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম।

মানবদেহে প্রবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

উন্নত রাসায়নিক বিশ্লেষণ (এফটিআইআর) পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষকরা মাছ ও পানিতে উচ্চ ঘনত্বের পলিথিন (এইচডিপিই), পিভিসি, পলিকার্বোনেট এবং পলিপ্রোপিলিনের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। এগুলো সাধারণত দৈনন্দিন ব্যবহৃত দুধের প্যাকেট, ডিটারজেন্টের বোতল ও গৃহস্থালি প্লাস্টিক পণ্য থেকে আসে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, এই মাইক্রোপ্লাস্টিক যখন মাছের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের পাকস্থলীতে ও রক্তে প্রবেশ করে, তখন তা: ১. কোষের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। ২. শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। ৩. দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, লিভারের রোগ ও অন্যান্য জটিল রোগ সৃষ্টি করে।

প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা

এই গবেষণাটি দেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দৈন্যদশার এক নগ্ন রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করলেও আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় এর অপব্যবহার থামেনি। বর্তমানে শুধু ঢাকা শহরের পরিবেশেই প্রতি মাসে প্রায় ৮ হাজার বিলিয়ন মাইক্রো-বিডস (ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা) নির্গত হচ্ছে।

পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার এই ফুসফুসগুলোকে বাঁচাতে এবং নাগরিক জীবনকে ক্যানসারের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে এবং লেকগুলোতে বর্জ্যের সরাসরি সংযোগ অবিলম্বে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। অন্যথায় এই নীরব ঘাতক ঢাকার জনস্বাস্থ্যকে এক অপূরণীয় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

সাগরের গভীরে রেকর্ড উষ্ণ ঢেউ: ‘সুপার এল নিনো’-তে ২০২৭ হতে পারে বিপর্যয়ের   

ঢাকার লেকগুলোর মাছে উচ্চ মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক, ঝুঁকিতে নগরবাসী   

আপডেট সময় ০১:১৩:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

রাজধানী ঢাকাকে শীতল রাখার অন্যতম উৎস এর কয়েকটি জলাধার। কিন্তু ঢাকার নামকরা গুলশান, ধানমণ্ডি ও হাতিরঝিল লেকের পানি এখন মানবদেহের জন্য নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘হেলিয়ন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, এসব লেকের পানি, তলানির কাদা তো বটেই, এমনকি সেখানে থাকা মাছের শরীরেও মিশে গেছে উচ্চমাত্রার ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, ঢাকার এসব লেক থেকে ধরা ৯৩ শতাংশ মাছের শরীরেই রয়েছে এই মারাত্মক প্লাস্টিক কণা, যা মাছের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে ক্যানসারসহ নানা জটিল ও মরণব্যাধির ঝুঁকি তৈরি করছে।

গবেষক ফারিহা তাহসিন মার্সি, অধ্যাপক এ.কে.এম রাশিদুল আলম এবং মো. আহিদুল আকবরের যৌথ পরিচালনায় ‘অ্যাবানডেন্স অ্যান্ড ক্যারেক্টারিস্টিকস অব মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন মেজর আরবান লেকস অব ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণাটি ঢাকার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের এক চরম বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছে।

সবচেয়ে বড় আতঙ্ক: লেকের মাছে বিষাক্ত প্লাস্টিক

গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও গুরুতর দিকটি হলো ঢাকার লেকের মাছের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব। তেলাপিয়া, কাতলা ও শোলসহ সাতটি প্রজাতির মোট ৯০টি মাছের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, গড়ে প্রায় ৯৩% মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়েছে।

  • মাছ দূষণে শীর্ষে ধানমণ্ডি লেক: পানিতে দূষণের মাত্রা গুলশানের চেয়ে কম হলেও, মাছের শরীরে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে ধানমণ্ডি লেক।
  • একটি মাছে ১৭টি কণা: ধানমণ্ডি লেকের একটিমাত্র তেলাপিয়া মাছের ভেতরে সর্বোচ্চ ১৭টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এই লেকের প্রতিটি মাছে গড়ে ৮.২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে।

বিশেষজ্ঞের কড়া হুঁশিয়ারি: ‘বিনামূল্যে দিলেও এই মাছ খাবেন না’ দেশের প্রখ্যাত পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত এ বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, মানুষের উচিত ঢাকার এই দূষিত লেক ও নদীর মাছ খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা। কেউ যদি আপনাকে ধানমণ্ডি, গুলশান বা বুড়িগঙ্গার মাছ বিনামূল্যেও দেয়, দয়া করে তা খাবেন না। এসব জলাশয় চরম দূষিত ও বিষাক্ত। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ইতিমধ্যে একটি বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।”

গুলশান ও হাতিরঝিল এখন প্লাস্টিকের ‘খনি

গবেষকদের মতে, ঢাকার গুলশান ও হাতিরঝিল লেক বর্তমানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ‘সিঙ্ক’ বা স্থায়ী আধারে পরিণত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ নগর-বর্জ্য এখানে এসে জমা হলেও পানি বের হওয়ার কোনো পর্যাপ্ত পথ নেই।

  • গুলশান লেকের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়: মাত্রাতিরিক্ত শিল্পবর্জ্য এবং পয়োনিষ্কাশন লাইনের সরাসরি সংযোগের কারণে গুলশান লেক প্লাস্টিক বর্জ্য দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এর উপরিভাগের পানিতে প্রতি লিটারে ৩৬টি এবং তলানির কাদার প্রতি কেজিতে ৬৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
  • গুলশান লেকের পানির গুণমান এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, তা এখন জলজ প্রাণীর বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রাও গ্রহণযোগ্য সীমার নিচে।
  • অন্যদিকে, আবাসিক এলাকায় অবস্থানের কারণে ধানমণ্ডি লেকের পানিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম।

মানবদেহে প্রবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

উন্নত রাসায়নিক বিশ্লেষণ (এফটিআইআর) পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষকরা মাছ ও পানিতে উচ্চ ঘনত্বের পলিথিন (এইচডিপিই), পিভিসি, পলিকার্বোনেট এবং পলিপ্রোপিলিনের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। এগুলো সাধারণত দৈনন্দিন ব্যবহৃত দুধের প্যাকেট, ডিটারজেন্টের বোতল ও গৃহস্থালি প্লাস্টিক পণ্য থেকে আসে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, এই মাইক্রোপ্লাস্টিক যখন মাছের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের পাকস্থলীতে ও রক্তে প্রবেশ করে, তখন তা: ১. কোষের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। ২. শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। ৩. দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, লিভারের রোগ ও অন্যান্য জটিল রোগ সৃষ্টি করে।

প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা

এই গবেষণাটি দেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দৈন্যদশার এক নগ্ন রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করলেও আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় এর অপব্যবহার থামেনি। বর্তমানে শুধু ঢাকা শহরের পরিবেশেই প্রতি মাসে প্রায় ৮ হাজার বিলিয়ন মাইক্রো-বিডস (ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা) নির্গত হচ্ছে।

পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার এই ফুসফুসগুলোকে বাঁচাতে এবং নাগরিক জীবনকে ক্যানসারের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে এবং লেকগুলোতে বর্জ্যের সরাসরি সংযোগ অবিলম্বে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। অন্যথায় এই নীরব ঘাতক ঢাকার জনস্বাস্থ্যকে এক অপূরণীয় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।