প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ দিয়ে ধেয়ে আসছে উষ্ণ পানির এক বিশাল ও শক্তিশালী ঢেউ। বিজ্ঞানীরা এটিকে বলছেন ‘কেলভিন ওয়েভ’। প্রায় ৯ হাজার মাইল (১৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি) দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া উষ্ণ জলের এই বিশাল প্রবাহটি বর্তমানে মহাসাগরের গভীরে অত্যন্ত তীব্র গতিতে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে এগিয়ে চলেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই প্রলয়ঙ্কারী ঢেউটি বিশ্ব জলবায়ুর জন্য এক মারাত্মক বিপদের সংকেত দিচ্ছে, যা এ বছরের শেষ নাগাদ একটি ভয়াবহ ‘সুপার এল নিনো’র জন্ম দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে চলমান এই ঢেউটির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে রেকর্ড ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৩.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি পরিমাপ করা হয়েছে। যেহেতু মাটির চেয়ে সাগরের গভীরের পানি অনেক ধীরগতিতে গরম বা ঠান্ডা হয়, তাই গভীর সমুদ্রের এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পুরো পৃথিবীর আবহাওয়াকে ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কেলভিন ওয়েভ কী এবং এটি কীভাবে তৈরি হলো?
বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিনের নামানুসারে সমুদ্রের গভীরের এই বিশেষ ঢেউকে ‘কেলভিন ওয়েভ’ বলা হয়। এটি সমুদ্রসৈকতে আছড়ে পড়া সাধারণ ঢেউয়ের মতো নয়, বরং এটি সাগরের তলদেশ দিয়ে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে চলাচল করে এবং পুরো মহাসাগর পাড়ি দিতে এর প্রায় দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে।
ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব দিকে অবস্থিত ‘পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ অঞ্চল’ (West Pacific Warm Pool)—যা পৃথিবীর আবহাওয়ার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বা ‘হিট ইঞ্জিন’ হিসেবে পরিচিত, সেখান থেকেই মূলত এই বিশাল তাপের উৎপত্তি। গত কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং একাধিক ‘লা নিনা’র কারণে সমুদ্রের এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত রেকর্ড পরিমাণ উষ্ণ পানি জমা হয়েছিল।
সম্প্রতি (গত এপ্রিল মাসে) তিনটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাভাবিক পুবালি বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উল্টো দিক থেকে শক্তিশালী পশ্চিমা বাতাস (Westerly Wind Burst) বইতে শুরু করে। এই তীব্র বাতাসের ধাক্কাতেই সমুদ্রের গভীরে জমে থাকা সেই বিশাল উষ্ণ পানির স্তূপটি এক বিশাল তরঙ্গের রূপ নিয়ে পূর্ব দিকে অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
‘সুপার এল নিনো’ এবং অতীতের ভয়াবহতা
প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের উপরিভাগের পানি যখন স্বাভাবিকের চেয়ে মারাত্মক রকমের উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখন সেই পরিস্থিতিকে ‘এল নিনো’ বলা হয়। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, সাগরের নিচের এই রেকর্ড পরিমাণ উষ্ণ ঢেউটি যখন দক্ষিণ আমেরিকার (বিশেষ করে পেরু ও ইকুয়েডর) উপকূলে গিয়ে আঘাত করবে, তখন সমুদ্রের গভীর থেকে ঠান্ডা পানি ওপরে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে গিয়ে তৈরি হবে একটি ‘সুপার এল নিনো’।
১৮৫০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে মাত্র ৬ বার এমন ‘সুপার এল নিনো’র দেখা মিলেছে। এর মধ্যে ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি করেছিল। আর ১৮৭৭-৭৮ সালের এল নিনোটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী, যা বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমানের কেলভিন ওয়েভটির তীব্রতা ১৯৯৭ সালের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সাথে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া ও ২০২৭ সালে সম্ভাব্য বিপর্যয়
এই উষ্ণ ঢেউটির কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চিরচেনা বজ্রঝড় ও মেঘমালার অবস্থান বদলে যাবে। সাগর থেকে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ তাপ ও আর্দ্রতা ছড়িয়ে পড়বে। আবহাওয়াবিদদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের এই পরিবর্তনের ধাক্কা শুধু ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পুরো বিশ্বের বায়ুপ্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলবে।
এর ফলে ২০২৭ সাল জুড়ে বিশ্বব্যাপী চরম আবহাওয়া বিপর্যয় দেখা দিতে পারে: ১. তীব্র খরা ও দাবানল: এশিয়া (বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) এবং অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টিপাত মারাত্মক কমে গিয়ে তীব্র খরা, হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহ এবং বনাঞ্চলে দাবানল সৃষ্টি হতে পারে। ২. রেকর্ড বন্যা ও অতিবৃষ্টি: অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত এবং ভয়াবহ বন্যা দেখা দেবে। ৩. আর্দ্রতা ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি: গত কয়েক বছরের জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের সাথে এই সুপার এল নিনো যুক্ত হয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বে মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে চরম উষ্ণতা ও আর্দ্রতার নতুন এক রেকর্ড তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসৃষ্ট কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আজকের সমুদ্রগুলো অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত। আর সাগরের এই অতিরিক্ত তাপই ধেয়ে আসা এল নিনোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক করে তুলছে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















