পশুর হাটে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শৌখিন খামারিদের মাঝে বেশ আলোচিত ‘ভুট্টি’ বা ‘ভুটানি’ গরু। ছোট ও নান্দনিক দৈহিক গঠনের কারণে চড়া দামে বিক্রি হয় এই ধরনের গরু। তবে প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে ‘ভুট্টি’ নামে যে গরুগুলো বিক্রি হচ্ছে, তার বড় অংশই আসলে কোনো নির্দিষ্ট জাত নয়; বরং জিনগত ত্রুটির কারণে খর্বাকৃতির হয়ে যাওয়া সাধারণ ‘বামন’ গরু। অসচেতনতা এবং বাণিজ্যিক প্রচারণার কারণে ‘ভুট্টি’ ও ‘বামন’ গরুর এই পার্থক্য সাধারণ ক্রেতাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
ভুট্টি নামের নেপথ্য ইতিহাস
অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘ভুট্টি’ বা ‘ভুটানি’ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত একক জাতের নাম নয়। এটি মূলত একটি ভৌগোলিক অঞ্চলভিত্তিক প্রচলিত নাম। ভুটান এবং ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্গম পরিবেশ, তীব্র শীত এবং চারণভূমির সংকটের কারণে সেখানকার স্থানীয় কিছু গরু প্রাকৃতিকভাবেই আকারে বেশ ছোট এবং কম ওজনের হয়ে থাকে। অতীতে হিমালয় অঞ্চলের এই ছোট আকৃতির গরুগুলো যখন সমতলে আসত, তখন সাধারণ মানুষ এগুলোকে ‘ভুটানি গরু’ বা সংক্ষেপে ‘ভুট্টি’ নামে ডাকতে শুরু করে। এই গরুগুলোর মাংস আঁশহীন ও চর্বিমুক্ত হওয়ায় বাজারে এর আলাদা চাহিদা তৈরি হয়।
‘ভুট্টি’র আড়ালে বামনত্বের বাণিজ্যিকীকরণ
ক্যাটেল ফার্মিং বা আধুনিক খামার ব্যবসার প্রসারের সাথে সাথে ‘ভুট্টি’ শব্দটি এখন একটি বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী যেকোনো ছোট আকৃতির গরুকে ‘প্রিমিয়াম ভুট্টি জাত’ বলে দাবি করছেন।
প্রাণী চিকিৎসকদের মতে, যেকোনো সাধারণ জাতের গরুর প্রজনন প্রক্রিয়ায় জিনগত ত্রুটি বা ইনব্রিডিংয়ের (একই বংশের গরুর মধ্যে বারবার প্রজনন) কারণে অনেক সময় বাছুরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডোয়ারফিজম’ বা বামনত্ব। এই বামন গরুগুলোর পা ও উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হয়।
কয়েক বছর আগে সাভারের আলোচিত খুদে গরু ‘রানি’-র ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। এমনকি এটির নাম গিনেস বুকে নাম তুলতে চাওয়ার কথাও উঠেছিল। রানিকে প্রাথমিকভাবে ‘ভুট্টি জাতের’ গরু হিসেবে প্রচার করা হলেও, পরবর্তীতে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে রানি মূলত একটি জিনগত ত্রুটিযুক্ত বামন গরু ছিল।
গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন সাভার অঞ্চলের প্রধান পশু চিকিৎসক (উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা) ড. মো. সাজেদুল ইসলাম বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেছিলেন:
“জেনেটিক ইনব্রিডিংয়ের (নিকটাত্মীয় বা একই বংশের প্রাণীর মধ্যে প্রজনন) মাধ্যমে এই ধরনের খর্বাকৃতির গরুর জন্ম হয়। এদের শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক নিয়মে হয় না এবং একপর্যায়ে আকৃতি আর বাড়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না।”
রানিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান তখন জানিয়েছিলেন:
“পশু চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে দেখেছি, এগুলো মূলত জন্মগত বা জিনগত ক্রটির কারণে বামন হয়ে থাকে।”
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত ছোট গরুর জাত
ভুট্টি বা ভুটানি নামে আন্তর্জাতিক কোনো স্বীকৃতি না থাকলেও, পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবেই ছোট আকারের কিছু আদিম গরুর জাত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ভারতের কেরালার বিখ্যাত ‘ভেচুর’ (Vechur), অন্ধ্রপ্রদেশের ‘পুঙ্গানুর’ (Punganur) এবং দক্ষিণ এশীয় কুঁজবিশিষ্ট গরুর ছোট সংস্করণ ‘মিনিয়েচার জেবু’ (Miniature Zebu)।
অন্যদিকে, ভুটানের নিজস্ব আদিম জাতের নাম ‘নুবলাং’ (Nublang), যা আকারে বেশ বড়, শক্তিশালী এবং কুঁজবিশিষ্ট; মোটেও বামন বা খাটো নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি প্রকৃত পাহাড়ি ছোট গরু (যাকে প্রচলিত ভাষায় ভুট্টি বলা হয়) এবং একটি জিনগত ত্রুটিযুক্ত বামন গরুর মধ্যে শারীরিক সক্ষমতার বড় পার্থক্য থাকে। বামন গরুগুলো অভ্যন্তরীণ শারীরিক জটিলতার কারণে সাধারণত দীর্ঘজীবী হয় না এবং এদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। তাই পশুর হাট বা খামার থেকে কেবল আকৃতি দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে, প্রাণীর সুস্থতা ও বংশের ইতিহাস জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাসিমুল শুভ 



















