পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রতি বছরই লাখ লাখ গবাদি পশু কেনাবেচা ও কোরবানি করা হয়। ধর্মীয় বিধানে পশুর প্রতি সর্বোচ্চ দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শনের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও, সচেতনতার অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে পশুর হাট থেকে শুরু করে জবাইয়ের চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে পশুর ওপর নানা রকম নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার চিত্র দেখা যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নিষ্ঠুরতা কেবল আইনি অপরাধই নয়, বরং কোরবানির মূল স্পিরিট ও ধর্মীয় বিধানেরই পরিপন্থী।
প্রতিবছরই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, কোরবানির পশুর ওপর মূলত পাঁচটি ধাপে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়ে থাকে:
১. পরিবহনকালীন নিষ্ঠুরতা: দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ট্রাকে করে গাদাগাদি করে পশু নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘ যাত্রায় পশুকে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি দেওয়া হয় না। ট্রাকে ওঠানো-নামানোর সময় লাঠি দিয়ে পিটিয়ে পশুদের জখম করার ঘটনা নিয়মিত চিত্র।
২. হাটের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ: পশুর হাটগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পশু রাখা হয়। কাদা, ময়লা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পশুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচার মতো পর্যাপ্ত শেড বা বিশ্রামের ব্যবস্থা অধিকাংশ হাটে থাকে না।

৩. কৃত্রিম উপায়ে ক্ষিপ্রতা বা ওজন বৃদ্ধি: কিছু অসাধু ব্যবসায়ী হাটে তোলার আগে পশুর পেট মোটা দেখানোর জন্য জোর করে অতিরিক্ত লবণ-পানি খাওয়ান। এছাড়া পশুকে শান্ত রাখতে বা শান্ত পশুকে কৃত্রিমভাবে তেজস্বী দেখাতে ক্ষতিকর ইনজেকশন বা অতিরিক্ত স্টেরয়েড দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
৪. ক্রয়-পরবর্তী যাতায়াত: হাট থেকে কেনার পর অনেকে পশুকে যান্ত্রিক গাড়িতে না নিয়ে মাইলের পর মাইল পিচঢালা তপ্ত রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যান। ক্লান্ত পশু দাঁড়িয়ে পড়লে লেজ মোচড়ানো বা লাঠি দিয়ে পেটানো হয়।
৫. অদক্ষ কসাই ও ত্রুটিপূর্ণ জবাই: জবাই করার সময় পশুকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে মাটিতে আছড়ে ফেলা হয়। যথেষ্ট ধারালো নয় বা ভোঁতা ছুরি ব্যবহার করায় পশু দীর্ঘক্ষণ যন্ত্রণায় ছটফট করে। এছাড়া একটি পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা কিংবা পুরোপুরি প্রাণ যাওয়ার আগেই চামড়া ছাড়ানো বা পা কাটার মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটে।
সংকট উত্তরণে করণীয়
বিশেষজ্ঞ, সমাজকর্মী ও আলেমদের মতে, কোরবানির পশুর প্রতি এই অমানবিক আচরণ বন্ধ করতে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং সরকারি পর্যায়ে সমন্বিত ও কঠোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে প্রধান করণীয় হতে পারে:
১. প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯-এর কঠোর প্রয়োগ ও মোবাইল কোর্ট
২. পরিবহনে পশুর সংখ্যা নির্ধারণ ও হাটে আধুনিক শেডের ব্যবস্থা
৩. জুমার খুতবা ও গণমাধ্যমে ধর্মীয় সঠিক নির্দেশনার প্রচার
৪. অদক্ষ কসাইয়ের পরিবর্তে প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিতকরণ

- আইনি প্রয়োগ ও নজরদারি: বাংলাদেশে বিদ্যমান ‘প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯’ এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোরবানির হাটে এবং মহাসড়কগুলোতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা করে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি।
- মানবিক পরিবহন ও আধুনিক হাট: ট্রাকে পশু বহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যা বেঁধে দিতে হবে, যেন তারা স্বাচ্ছন্দ্যে দাঁড়াতে বা বসতে পারে। আদর্শ পশুর হাটে পশুর জন্য পর্যাপ্ত শেড, পরিষ্কার পানি ও প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক করা দরকার।
- ধর্মীয় অনুশাসনের সঠিক প্রচার: ইসলামে পশুকে কষ্ট না দিয়ে অত্যন্ত দয়ার সাথে জবাই করার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ছুরি ভালোভাবে ধারালো করা, পশুর চোখের সামনে ছুরি না উঁচানো এবং একটির সামনে অন্যটি জবাই না করার বিধানগুলো জুমার খুতবা এবং গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা উচিত।
- নির্ধারিত স্থানে কোরবানি: যত্রতত্র কোরবানি না দিয়ে সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের নির্ধারিত আধুনিক ও পরিষ্কার স্থানে কোরবানি দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করা দরকার। এতে পশুর কষ্ট যেমন কমে, তেমনি পরিবেশ দূষণও রোধ করা সম্ভব।
কোরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আত্মত্যাগ ও সহমর্মিতার ইবাদত। যে পশুকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হচ্ছে, তার প্রতি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মানবিক ও দয়াশীল আচরণ বজায় রাখা প্রত্যেকের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতাই পারে এই নির্মমতা বন্ধ করতে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















