ঢাকার লেকগুলো মরণাপন্ন অথচ বাঁচানো গেলে আসতে পারে সমৃদ্ধি  

ঢাকার লেকগুলো মরণাপন্ন অথচ বাঁচানো গেলে আসতে পারে সমৃদ্ধি  

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা রাজধানী ঢাকার আসল প্রাণশক্তি ছিল এর লেক-জলাশয় বা পুকুর-দিঘি। এখন ময়লা আর বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে জলাশয়গুলো। অব্যবস্থাপনা আর দূষণে লেকগুলো হারিয়ে গেলেও এগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে ঢাকার পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে, এমন কথা লেখা হয়েছে দৈনিক বণিকবার্তা অনলাইনের সম্পাদকীয়তে।

এই সম্পাদকীয়তে দেয়া তথ্যাবলীর ভিত্তিতে ঢাকার লেক, সেগুলোর মরণদশা এবং রক্ষা করতে পারলে নগরের উপকার নিয়ে সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:

 

মরণাপন্ন লেক: ভয়াবহ দূষণের চিত্র

সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে পিলে চমকানো তথ্য। ধানমন্ডি লেকের প্রতি কেজি পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৩০ হাজার, যেখানে চীনের সবচেয়ে দূষিত সাংহাই নদীর তলদেশে এই পরিমাণ মাত্র ৮০২টি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জরিপ অনুযায়ী, গুলশান লেকের আশপাশের প্রায় ৮৫ শতাংশ বাড়ির স্যুয়ারেজ লাইন সরাসরি লেকে গিয়ে মিশছে। অন্যদিকে, হাতিরঝিলের পানিতেও পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর জীবাণু, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকি।

 

শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে জলাশয়ের ভূমিকা

জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহে যখন জনজীবন ওষ্ঠাগত, তখন লেকগুলো প্রাকৃতিক এসি হিসেবে কাজ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বড় জলাশয় সংলগ্ন এলাকার তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী ঘিঞ্জি এলাকার তুলনায় ১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম থাকে। ঢাকার তাপমাত্রা যখন গ্রামীণ এলাকার চেয়ে ৭ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি হয়, তখন এই শীতলকারী ভূমিকা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

 

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বৈশ্বিক উদাহরণ

লেক পুনরুদ্ধার কেবল সৌন্দর্যবর্ধন নয়, এটি একটি লাভজনক অর্থনৈতিক সুযোগও। ভারতের হায়দ্রাবাদের হোসেন সাগর লেক পুনরুদ্ধারের পর বছরে ১০ লাখেরও বেশি পর্যটক সেখানে সমাগম হচ্ছে, যার বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। একইভাবে ইন্দোনেশিয়ার লেক তোবা অঞ্চলে পর্যটন উন্নয়নে ৮৭ কোটি ডলার বিনিয়োগ এসেছে এবং ৯ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার লেকগুলো সুস্থ থাকলে ওয়াটার ট্যাক্সি ও নৌকার মাধ্যমে বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতো। এতে যানজট কমত এবং মধ্যবিত্তের বিনোদনের সুলভ সুযোগ সৃষ্টি হতো। এমনকি লেক তীরের ফ্ল্যাটের দামও ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেত, যা বর্তমানে দূষণের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে।

 

সমাধানের পথে বাধা ও করণীয়

ঢাকার লেকগুলোর এই করুণ অবস্থার পেছনে বড় কারণ প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা। গুলশান লেক রাজউকের অধীনে, ধানমন্ডি সিটি করপোরেশনের হাতে, আর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ওয়াসার। এই বিভক্ত দায়িত্ব কাঠামো সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ‘পলিউটার পেজ’ বা ‘দূষণকারীই দায়ের মূল্য দেবে’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। যে ভবন বা প্রতিষ্ঠান লেকে বর্জ্য ফেলবে, তাদের ওপর ভারী জরিমানা আরোপ করে সেই অর্থ লেক উন্নয়ন তহবিলে ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সবুজ অর্থায়ন (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা বিশ্বব্যাংক) কাজে লাগিয়ে লেকগুলোকে পুনরায় প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব।

ঢাকার প্রাণ বাঁচাতে এবং একটি বাসযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ নগরী গড়তে লেক পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

আপলোডকারীর তথ্য

Shuvo

জনপ্রিয় সংবাদ

সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত

ঢাকার লেকগুলো মরণাপন্ন অথচ বাঁচানো গেলে আসতে পারে সমৃদ্ধি  

আপডেট সময় ০১:৩১:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা রাজধানী ঢাকার আসল প্রাণশক্তি ছিল এর লেক-জলাশয় বা পুকুর-দিঘি। এখন ময়লা আর বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে জলাশয়গুলো। অব্যবস্থাপনা আর দূষণে লেকগুলো হারিয়ে গেলেও এগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে ঢাকার পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে, এমন কথা লেখা হয়েছে দৈনিক বণিকবার্তা অনলাইনের সম্পাদকীয়তে।

এই সম্পাদকীয়তে দেয়া তথ্যাবলীর ভিত্তিতে ঢাকার লেক, সেগুলোর মরণদশা এবং রক্ষা করতে পারলে নগরের উপকার নিয়ে সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:

 

মরণাপন্ন লেক: ভয়াবহ দূষণের চিত্র

সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে পিলে চমকানো তথ্য। ধানমন্ডি লেকের প্রতি কেজি পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৩০ হাজার, যেখানে চীনের সবচেয়ে দূষিত সাংহাই নদীর তলদেশে এই পরিমাণ মাত্র ৮০২টি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জরিপ অনুযায়ী, গুলশান লেকের আশপাশের প্রায় ৮৫ শতাংশ বাড়ির স্যুয়ারেজ লাইন সরাসরি লেকে গিয়ে মিশছে। অন্যদিকে, হাতিরঝিলের পানিতেও পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর জীবাণু, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকি।

 

শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে জলাশয়ের ভূমিকা

জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহে যখন জনজীবন ওষ্ঠাগত, তখন লেকগুলো প্রাকৃতিক এসি হিসেবে কাজ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বড় জলাশয় সংলগ্ন এলাকার তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী ঘিঞ্জি এলাকার তুলনায় ১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম থাকে। ঢাকার তাপমাত্রা যখন গ্রামীণ এলাকার চেয়ে ৭ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি হয়, তখন এই শীতলকারী ভূমিকা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

 

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বৈশ্বিক উদাহরণ

লেক পুনরুদ্ধার কেবল সৌন্দর্যবর্ধন নয়, এটি একটি লাভজনক অর্থনৈতিক সুযোগও। ভারতের হায়দ্রাবাদের হোসেন সাগর লেক পুনরুদ্ধারের পর বছরে ১০ লাখেরও বেশি পর্যটক সেখানে সমাগম হচ্ছে, যার বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। একইভাবে ইন্দোনেশিয়ার লেক তোবা অঞ্চলে পর্যটন উন্নয়নে ৮৭ কোটি ডলার বিনিয়োগ এসেছে এবং ৯ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার লেকগুলো সুস্থ থাকলে ওয়াটার ট্যাক্সি ও নৌকার মাধ্যমে বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতো। এতে যানজট কমত এবং মধ্যবিত্তের বিনোদনের সুলভ সুযোগ সৃষ্টি হতো। এমনকি লেক তীরের ফ্ল্যাটের দামও ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেত, যা বর্তমানে দূষণের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে।

 

সমাধানের পথে বাধা ও করণীয়

ঢাকার লেকগুলোর এই করুণ অবস্থার পেছনে বড় কারণ প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা। গুলশান লেক রাজউকের অধীনে, ধানমন্ডি সিটি করপোরেশনের হাতে, আর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ওয়াসার। এই বিভক্ত দায়িত্ব কাঠামো সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ‘পলিউটার পেজ’ বা ‘দূষণকারীই দায়ের মূল্য দেবে’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। যে ভবন বা প্রতিষ্ঠান লেকে বর্জ্য ফেলবে, তাদের ওপর ভারী জরিমানা আরোপ করে সেই অর্থ লেক উন্নয়ন তহবিলে ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সবুজ অর্থায়ন (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা বিশ্বব্যাংক) কাজে লাগিয়ে লেকগুলোকে পুনরায় প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব।

ঢাকার প্রাণ বাঁচাতে এবং একটি বাসযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ নগরী গড়তে লেক পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।