একসময় থাইল্যান্ডে ‘টাইটানদের’ আধিপত্য ছিল। গ্রিক পুরাণের টাইটান না হলেও দানবাকৃতির ডাইনোসরদের পদচারণা ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অংশগুলোতে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপ্লোরার সীতা মানিতকুনের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল একটি নতুন লম্বা-গলা ডাইনোসর আবিষ্কার করেছে, যা তাদের অনুমান অনুযায়ী ৮৮ ফুটেরও বেশি লম্বা এবং প্রায় ৩০ টন ওজনের ছিল।
“খননকৃত হাড়গুলোর প্রাথমিক পরিমাপ থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় ডাইনোসর হতে পারে,” বলেছেন থাইল্যান্ডের মাহাসারাকহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ মানিতকুন।
২০১৬ সালে উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডের চাইয়াফুম প্রদেশে থানম লুয়াংনান নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি এই গুরুত্বপূর্ণ হাড়গুলো আবিষ্কার করেন।
মানিতকুন বলেন,“তিনি একটি সরকারি পুকুরের তীরে অদ্ভুত আকৃতির কিছু পাথর দেখতে পান।”
লুয়াংনান এই বিষয়টি দেশের খনিজ সম্পদ বিভাগে জানান। পরে জানা যায়, অদ্ভুত পাথরগুলো ছিল ডাইনোসরের হাড় এবং মানিতকুন যখন সেগুলো দেখতে পান, তিনি বুঝতে পারেন যে প্রাণীটি নিশ্চয়ই বিশাল আকারের ছিল।
গবেষকরা নতুন প্রজাতিটির নামকরণ করেছেন নাগাটাইটান চাইয়াফুমেনসিস, যেখানে এটি পাওয়া গেছে সেই স্থানের নামানুসারে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় লোককথার বিশাল সর্পাকৃতির নাগের নামানুসারে। বৃহস্পতিবার সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে ঘোষিত এই আবিষ্কারটি, প্রাচীন জলবায়ু ও উদ্ভিদের পরিবর্তন কীভাবে বিশালাকার ডাইনোসরদের বিকাশের পথ খুলে দিয়েছিল, সে সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
নাগাটাইটানের ১১৩ মিলিয়ন বছর পুরোনো শিলার গভীরে চাপা পড়া কিছু কশেরুকা, পাঁজরের হাড়, নিতম্বের হাড় এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের হাড় রেখে গেছে। এর ডান সামনের পা প্যাটাগোটাইটান এবং ড্রেডনটাসের মতো সম্প্রতি আবিষ্কৃত অন্যান্য বিশাল সরোপডদের চেয়েও লম্বা, যদিও ডাইনোসরটি সম্ভবত ঐসব শক্তিশালী প্রাণীদের মতো অতটা বড় ছিল না, যাদের ওজন ছিল যথাক্রমে আনুমানিক ৬০ এবং ৫০ টন।
নাগাটাইটান সোমফোস্পন্ডাইলি নামক একটি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জীবাশ্মবিদ এবং এই গবেষণার সহ-লেখক পল আপচার্চ বলেন, অন্যান্য সরোপডদের তুলনায় এই ডাইনোসরগুলোর সামনের পা লম্বা এবং দেহভঙ্গিও চওড়া হয়ে থাকে। জীবিত প্রাণীর দেহে অন্যান্য পার্থক্যগুলো চিহ্নিত করা কঠিন হতো, কিন্তু এই সূক্ষ্ম ইঙ্গিতগুলোই নাগাটাইটানদেরকে বিশাল আকারের ডাইনোসরের একটি গোষ্ঠী হিসেবে শনাক্ত করে, যারা প্রায় ১১০ থেকে ১২০ মিলিয়ন বছর আগে প্রারম্ভিক ক্রিটেশিয়াস যুগে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
ক্রিটেশিয়াস যুগের থাইল্যান্ডের পরিবেশগত পরিস্থিতি হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারে কেন নাগাটাইটান এত বিশাল ছিল।
ডাইনোসরটি যখন জীবিত ছিল, তখন থাইল্যান্ড আজকের তুলনায় বিষুবরেখার বেশি কাছাকাছি ছিল। যে ভূতাত্ত্বিক স্তরে নাগাটাইটান সমাধিস্থ হয়েছিল, সেখান থেকে প্রাপ্ত সূত্র ইঙ্গিত দেয় যে অঞ্চলটি অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত ও সামান্য শুষ্ক গুল্মভূমি দ্বারা আবৃত ছিল। পৃথিবী তখন এক উষ্ণমণ্ডলীয় অবস্থায় ছিল এবং সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে বড় সরোপড ডাইনোসররা এই ধরনের পরিস্থিতিতে ভালোভাবে বেড়ে উঠত। বিশালকায় তৃণভোজী প্রাণীরা সহজেই ও দক্ষতার সাথে বনভূমির মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে পারত, গাছপালা চিবিয়ে এবং নিচুতে থাকা হর্সটেল ও ফার্নের মতো উদ্ভিদ খেয়ে জীবনধারণ করত। তাদের খাদ্যগ্রহণ এবং মাটি মাড়িয়ে দেওয়ার ফলে এই ধরনের বাসস্থানগুলো ঘন জঙ্গলের পরিবর্তে আরও উন্মুক্ত ও সাভানার মতো থাকত।
মানিতকুন বলেন,“এশিয়ায় নাগাটাইটান এবং তার বিশালকায় আত্মীয়দের আবিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে, এই ডাইনোসরগুলো প্রারম্ভিক ক্রিটেশিয়াস যুগ থেকেই এমন বিশাল আকারে বিবর্তিত হয়েছিল, যা ছিল টিকে থাকার একটি সফল কৌশল।”
জীবাশ্মের রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে, নাগাটাইটানের সময় থেকে গ্রহাণুর আঘাত পর্যন্ত, যখনই পরিস্থিতি অনুকূল ছিল, এই দানব ডাইনোসরগুলো বারবার বিবর্তিত হয়েছে এবং আকারে বড় হয়েছে।
প্রকৃতিবার্তা ডেস্ক 



















